বাংলাদেশে নারীর অধিকার ও স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। তবে এবার বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের এক বক্তব্যকে ঘিরে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের বাফেলো শহরে এক নাগরিক সংবর্ধনায় তিনি বলেন, ‘আমরা মায়েদের মা হিসেবে দেখি এবং নারীদের সম্মান ও নিরাপত্তা দিতে চাই।’
শফিকুর রহমানের এই বক্তব্য এসেছে এমন সময়ে, যখন বাংলাদেশে নারী অধিকার, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও রাজনৈতিক আদর্শের ভারসাম্য নিয়ে বিতর্ক তীব্র আকার নিয়েছে।
বক্তৃতায় জামায়াতের আমির এক আবেগঘন উদাহরণ টানেন। মেয়ে সন্তানকে ‘গোলাপফুল’–এর সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, ‘বাবা–মা যেমন কান্নাভেজা চোখে কন্যাকে অন্য ঘরে পাঠান, তেমনি সমাজেও নারীর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা থাকা উচিত।’
তার ভাষায়, আমরা মায়ের জাতিকে সেই সম্মানেই দেখতে চাই। তবে তার বক্তব্যের সঙ্গে যুক্ত ছিল একটি বার্তা। জামায়াত ক্ষমতায় গেলে নারীদের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হবে না; বরং তাদের “সম্মান ও নিরাপত্তা” নিশ্চিত করা হবে।
নারীর চাকরি প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, ‘যার মেধা আছে, প্রয়োজন আছে, সমাজে সব করবে। সভ্যতার চাকা ঘোরানোর জন্য তারা অংশ নেবে, তবে সেই সঙ্গে পাবে সম্মান ও নিরাপত্তা।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, জামায়াতের এই বার্তা দলটির দীর্ঘদিনের নারী ভূমিকা সংক্রান্ত বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক (অব.) রাশিদা রহমান বলেন, "জামায়াত অতীতে নারীর উপস্থিতিকে সীমিত করতে চেয়েছিল বলে যে ধারণা সমাজে ছিল, এখন তারা সেটা নরম ভাষায় পুনর্নির্মাণের চেষ্টা করছে। তবে বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতি রূপ নেবে কি না, সেটিই প্রশ্ন।"
নিউইয়র্কের অনুষ্ঠানে শফিকুর রহমান শুধু নারী প্রসঙ্গেই নয়, বরং দেশের দুর্নীতি, ন্যায়বিচার, প্রবাসী ভোটাধিকার, অর্থনীতি ও শিক্ষা সংস্কার নিয়েও বিস্তারিত বক্তব্য দেন।
তিনি দাবি করেন, "আমরা যদি অর্থনীতির কঙ্কালটাও পাই, ইনশাআল্লাহ, সেটাকে গোশত ও চামড়াসহ পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব। শুধু সদিচ্ছা ও সততা প্রয়োজন।"
এ বক্তব্যে জামায়াতের নতুন রাজনৈতিক অবস্থান বোঝা যায় একটি 'নৈতিক অর্থনীতি' গঠনের প্রতিশ্রুতি, যেখানে ইসলামি মূল্যবোধ ও প্রশাসনিক দক্ষতার সমন্বয় ঘটানো হবে।
তবে নারী অধিকারের প্রশ্নে সমালোচকেরা এখনো সন্দেহপ্রবণ।
মানবাধিকার কর্মী ফারিহা আনাম বলেন, "শফিকুর রহমানের বক্তব্যে মায়া–মমতা আছে, কিন্তু নীতিগত নিশ্চয়তা নেই। নারীকে মা বা গোলাপ হিসেবে দেখার বদলে নাগরিক হিসেবে মর্যাদা দেওয়ার কথাই এখন প্রয়োজন।"
অন্যদিকে জামায়াতের সমর্থকেরা বলছেন, দলের 'মডারেট ইসলামিক' দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, জামায়াত নারীকে পরিবার ও কর্মক্ষেত্র উভয় জায়গাতেই সক্রিয় দেখতে চায়, তবে ইসলামী নীতির সীমানার ভেতরে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা মনে করেন, ২০২৫ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জামায়াতের এই বক্তব্য মূলত 'ইমেজ রিব্র্যান্ডিং' প্রচেষ্টা। দীর্ঘদিন পর আন্তর্জাতিক পরিসরে আমিরের প্রকাশ্য বক্তৃতা দলের নরম ও মানবিক মুখ তুলে ধরার চেষ্টা।
তবে নারীবাদী ও নাগরিক সমাজ বলছে, কথার চেয়ে কার্যকর নীতিমালা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণে নারীর সমঅধিকার কতটা বাস্তবায়িত হবে, সেটিই ভবিষ্যতের পরীক্ষা।
শফিকুর রহমানের নিউইয়র্ক বক্তৃতা একদিকে আবেগঘন, অন্যদিকে রাজনৈতিকভাবে কৌশলপূর্ণ। নারী, অর্থনীতি, ন্যায়বিচার সব বিষয়ে আশার বার্তা দিলেও, বাস্তবে তার প্রমাণ এখনো অমীমাংসিত।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন নিয়ে যখন নানা আলোচনা, তখন এই বক্তব্য হয়তো দলের নরম ভাবমূর্তি গঠনের সূচনা তবে প্রশ্ন থেকে যায়, কথা থেকে কাজে পৌঁছানো কতটা সম্ভব।
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন