রাজধানীতে অনুষ্ঠিত সম্মিলিত ইমাম-খতিব জাতীয় সম্মেলনে দেশের ধর্মীয় মূল্যবোধ, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং প্রশাসনিক আচরণের বিভিন্ন দিক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ।
রোববার বিকেলে শেরেবাংলা নগরের চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত এই বৃহৎ সমাবেশে তিনি বলেন, বাংলাদেশে কোরআন ও সুন্নাহর বিপরীতে কোনো কার্যক্রম চলতে দেওয়া হবে না। রাষ্ট্র পরিচালনায় ইসলামি নীতি-আদর্শকে যথাযথ সম্মান করতে হবে।
সম্মেলনের শুরুতেই সালাহউদ্দিন আহমদ দেশের বর্তমান সামাজিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর নানা চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ইসলামি মূল্যবোধ এই জাতির ঐতিহ্য ও পরিচয়ের অংশ। তাই রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণে এবং আইন প্রয়োগে কোরআন ও সুন্নাহর ভিত্তি অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে। যারা নীতি-নৈতিকতার আলোকে দেশের নেতৃত্ব দেবেন, তাদের ওপর এই দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি।
তিনি উল্লেখ করেন, স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন সরকার ক্ষমতায় এসেছে, কিন্তু ইসলামের মূল চেতনাকে নীতিতে প্রতিফলিত করা হয়নি অনেক ক্ষেত্রে। এখন সময় এসেছে এই বিচ্যুতি কাটিয়ে ওঠার,মন্তব্য করেন বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ নেতা।
বক্তৃতার একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল রাষ্ট্রীয় বাহিনীর দায়িত্ব ও ক্ষমতার বিষয়ে আলোচনা। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণ ছাড়া রাষ্ট্রের কাউকেই গ্রেফতার করা যায় না ইমাম-খতিবরা তো তার চেয়েও বেশি মর্যাদার অধিকারী। সাম্প্রতিক অতীতে ধর্মীয় নেতাদের অকারণে হয়রানি ও গ্রেফতারের ঘটনা বাংলাদেশকে কলঙ্কিত করেছে।
তিনি অভিযোগ করেন, বিগত সরকার ইসলামবিদ্বেষী আচরণ করেছে এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন নীতি গ্রহণ করেছিল। তার ভাষায়, সে সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। ধর্মীয় নেতাদের ভয় দেখানো হয়েছিল।
তবে বর্তমান সময়কে তিনি রাষ্ট্রের 'নতুন যাত্রা' হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বলেন, এবার দেশের মানসিক আবহাওয়া বদলেছে। জনগণ নিজেদের মতো করে কথা বলছে, ভোট দিচ্ছে এবং রাষ্ট্র কাঠামোকে সঠিক পথে আনার দাবি তুলছে।
রাজনৈতিক বিভাজন দেশকে দুর্বল করে এমন মন্তব্য করে সালাহউদ্দিন বলেন, আমরা যদি জাতি হিসেবে সামনে এগোতে চাই, তাহলে দল-মত নির্বিশেষে বড় ঐক্য প্রয়োজন। দেশ ইতোমধ্যেই পুনর্গঠনের পথে যাত্রা শুরু করেছে। এই যাত্রাকে কেউ থামাতে পারবে না।
তিনি ইঙ্গিত দেন যে, রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে এখন আর সংঘাতের মধ্যে নয়, পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতার জায়গায় দাঁড়াতে হবে। দেশকে এগিয়ে নিতে চাইলে জনগণের পাশে থাকা ছাড়া বিকল্প নেই, তিনি বলেন।
ইমাম-খতিবদের নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তাও দেন বিএনপি নেতা। তার ব্যাখ্যা, মসজিদ হচ্ছে ইবাদতের স্থান। দুনিয়ার রাজনৈতিক বিতর্কের প্রতিধ্বনি যেন কখনো মসজিদের ভেতরে না ওঠে। রাজনীতি করার অসংখ্য ক্ষেত্র আছে—মাঠ আছে, প্ল্যাটফর্ম আছে। কিন্তু মসজিদকে রাজনৈতিক বাকযুদ্ধের ময়দান বানানো ইসলামী শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থার পরিপন্থী।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক মতভেদ থাকতেই পারে; কিন্তু ইমামদের এমন জায়গায় দাঁড় করানো উচিত নয়, যেখানে তারা অযথা বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। ইমামদের আমরা শ্রদ্ধার আসনে রাখবো। তারা জাতির নৈতিক পথপ্রদর্শক তাদের মর্যাদা রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব,মন্তব্য করেন তিনি।
চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত এই জাতীয় ইমাম-খতিব সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন এলাকার হাজারও আলেম-ওলামা, ইমাম ও খতিব অংশ নেন। মসজিদ পরিচালনা, ধর্মীয় শিক্ষার মানোন্নয়ন, সামাজিক মূল্যবোধ তৈরি ও সাম্প্রতিক ঘটনাবলি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়।
সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীরা দেশের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত রাখার দাবি জানান। ইমামদের ন্যায্য সম্মানী, প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি, নিরাপত্তা, এবং মসজিদের স্বচ্ছ পরিচালনার বিষয়েও বহু আলেম বক্তব্য রাখেন।
সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তৃতার শেষাংশে ছিল ভবিষ্যতের বাংলাদেশের রূপরেখা। তিনি বলেন, আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত ন্যায় ও নৈতিকতার ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হবে। কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা অনুসরণ করে একটি মানবিক, ন্যায়পরায়ণ ও শক্তিশালী রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা এটাই আমাদের লক্ষ্য।
তিনি ইমাম-খতিবদের উদ্দেশে বলেন, আপনারা মুসলিম সমাজের হৃদয়ে বাস করেন। আপনাদের কথায় মানুষ দিকনির্দেশনা খুঁজে পায়। তাই আপনাদের মর্যাদা রক্ষায় আমরা সর্বদা পাশে থাকবো।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন