মির্জা ফখরুল

খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর তারেক রহমানের দেশে ফেরা

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২, ২০২৫, ০৫:২৯ পিএম
খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর তারেক রহমানের দেশে ফেরা

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল থাকলে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান খুব শিগগিরই দেশে ফিরবেন মঙ্গলবার বিকেলে এমন মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দলের ভেতরে ও বাইরে নানামুখী আলোচনা-গুঞ্জনের মধ্যে এ বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

ফখরুল বলেন, ম্যাডাম জিয়ার স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। চিকিৎসকেরা যদি নিশ্চিত করেন যে তাঁর অবস্থার কোনো অবনতি নেই, তাহলে তারেক রহমান দেশে ফিরে আসার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে তাঁর দ্রুত দেশে ফেরার প্রক্রিয়া শুরু হবে।

এর আগে দুপুরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন জানান, তারেক রহমান দেশে ফিরে আসতে চাইলে সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দেবে। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত তিনি কোনো ট্রাভেল পাস চাননি। চাইলে আমরা তা ইস্যু করব। তাঁর দেশে ফিরতে কোনো প্রশাসনিক বাধা নেই।

খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসা নেয়ার প্রসঙ্গে তিনি জানান, এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান ইতিবাচক, তবে সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে পরিবার ও দলের ওপর নির্ভরশীল।

যদিও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব বলছে, সরকারের এমন ‘সহযোগিতা’ বক্তব্যকে স্বাভাবিক মনে করার সুযোগ নেই। কারণ অতীতে চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়ার বিদেশ যাওয়ার আবেদন বারবার নাকচ হয়েছে। ফখরুলের ভাষায়, আইন ও ন্যায়ের ভিত্তিতে নয়, রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে সিদ্ধান্ত হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি কতটা বাস্তবসম্মত সময়ই তা বলে দেবে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দুই মামলায় দণ্ডিত হয়ে দুইবছরেরও বেশি সময় কারাগারে ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। করোনাকালে মানবিক বিবেচনায় নির্বাহী আদেশে তাঁর সাজা স্থগিত করা হয় ২০২০ সালের ২৫ মার্চ। এরপর থেকে প্রতি ছয় মাস অন্তর মেয়াদ বাড়িয়ে ‘শর্তসাপেক্ষ’ মুক্ত রাখা হয় তাঁকে। তবে চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়ার অনুমতি কখনোই মিলেনি।

২০২৩ সালের গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি মুক্ত হন রাজনৈতিক সব বাঁধন থেকে। চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান তিনি এবং ১১৭ দিন পর দেশে ফেরেন। দেশে ফেরার পর থেকেই স্বাস্থ্যগত কারণে বারবার হাসপাতালে যেতে হচ্ছে তাঁকে।

গত ২৩ নভেম্বর গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় আবারও এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয় বিএনপি চেয়ারপারসনকে। দলের শীর্ষ নেতারা জানিয়েছেন, তিনি এখনো সংকটাপন্ন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। ডা. জাহিদ হোসেনের ভাষায়, ম্যাডাম জিয়ার শারীরিক জটিলতা দীর্ঘদিনের। বয়স, পূর্ববর্তী রোগব্যাধি ও চলমান অবস্থার কারণে চিকিৎসা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে।

দীর্ঘদিন লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমানকে বিএনপির তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত ‘প্রত্যাবর্তনের’ দাবি দীর্ঘদিনের। দলের অনেক নেতার মতে, চলমান রাজনৈতিক ডামাডোলে তাঁর দেশে ফেরা নেতৃত্বের সংকট কাটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, তারেকের দেশে ফেরা শুধু পারিবারিক প্রয়োজন নয় বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিএনপির সাংগঠনিক পুনর্গঠন, ভবিষ্যৎ আন্দোলনের রূপরেখা এবং আগামী জাতীয় রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় দলের অবস্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা রাখবে।

তবে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর অবস্থান, সম্ভাব্য আইনি প্রক্রিয়া ও নিরাপত্তা–সংক্রান্ত বিষয়গুলো এখনো অস্পষ্ট। এ কারণে তাঁর দেশে ফেরা যতটা রাজনৈতিক, ততটাই আইনি ও কূটনৈতিক প্রশ্নও তৈরি করেছে।

সরকার সম্প্রতি জানিয়েছে, বেগম জিয়া বিদেশে চিকিৎসা নিতে চাইলে তাঁকে ভিভিআইপি হিসেবে সব ধরনের সহায়তা দেয়া হবে। এ ঘোষণাকে বিএনপি সন্দেহভাজন চোখে দেখলেও অনেকেই মনে করছেন, এটি রাজনৈতিক মেরুকরণ কমানোর একটি কৌশল হতে পারে।

এদিকে পরিবারের সদস্যরা এখনো প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য না করলেও হাসপাতাল সূত্র জানাচ্ছে, বেগম জিয়ার চিকিৎসায় উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। বিদেশে নেয়ার সিদ্ধান্ত পুরোপুরি নির্ভর করছে বর্তমান চিকিৎসার ফলাফল ও চিকিৎসকদের চূড়ান্ত রিপোর্টের ওপর।

বিএনপি মহাসচিবের বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা যেমন অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তেমনই তারেক রহমানের দেশে ফেরার সময়ও নির্ভর করছে সেই অনিশ্চয়তার ওপর।

দলের ভেতরে আশাবাদ থাকলেও রাজনৈতিক পরিস্থিতি, মামলার জটিলতা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।

সবাই এখন অপেক্ষায় বেগম জিয়া সুস্থ হয়ে উঠবেন কি না, আর তাঁর স্বাস্থ্য অনুকূলে থাকলে তারেক রহমান সত্যিই কি শিগগিরই দেশে ফিরবেন।

জেএইচআর