ছাত্রদের নেতৃত্বে গঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আধিপত্য ভেঙে নতুন আশা জাগালেও ভোটের রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে এখন কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে।
গত বছরের ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার পতনের পর যারা পরিবর্তনের বার্তা নিয়ে উঠে এসেছিল, সেই তরুণরা এখন সংগঠন দুর্বলতা, অর্থসংকট, অভিজ্ঞতার অভাব ও প্রতিপক্ষের শক্তিশালী নেটওয়ার্কের সামনে সংগ্রাম করছে।
নতুন দল হিসেবে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করলেও সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে যে, ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে যাওয়া ৩০০ আসনেই অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া এনসিপি জনসমর্থনে পিছিয়ে আছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের (আইআরআই) ডিসেম্বর জরিপে বিএনপি ৩০ শতাংশ সমর্থন নিয়ে শীর্ষে আছে। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী (২৬ শতাংশ)। আর এনসিপি'র অবস্থান তৃতীয় মাত্র ৬ শতাংশ সমর্থন নিয়ে।
গত বছরের আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী প্রাপ্তি তপসী জানান, শুরুতে তিনি নতুন এই দলকে পরিবর্তনের শক্তি হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু পরে দলের অবস্থানগুলো অস্পষ্ট হয়ে ওঠায় তার হতাশা বাড়ে। সংখ্যালঘু অধিকার, নারী অধিকার বা গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে স্পষ্ট অবস্থান নিতে না পারাকে তিনি দায়ী করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনেও একটিও পদ না পাওয়ায় এনসিপি'র প্রতি তরুণদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
এনসিপির প্রধান নাহিদ ইসলাম বলেন, সময়স্বল্পতার কারণে দলটির সাংগঠনিক কাঠামো এখনো দুর্বল। বেশিরভাগ নেতা পূর্ণকালীন চাকরি করেন এবং সীমিত অর্থায়নের কারণে প্রচারণা জোরদার করা যাচ্ছে না। ব্যক্তিগত বেতন, ছোট অনুদান ও ক্রাউডফান্ডিং দিয়েই এখন পর্যন্ত সব কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে।
দলীয় প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, তিনি গ্রামে বাড়ি-বাড়ি গিয়ে সরাসরি ভোটারদের সঙ্গে কথা বলছেন।
ভোটারদের তিনি বলেন, আমার হাতে টাকা নেই। আপনারা অর্থ নয়, সঠিক উন্নয়ন দেখতে পাবেন এটাই আমার প্রতিশ্রুতি। তবে কিছু নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠে যাওয়ায় দলীয় ভাবমূর্তিও চাপে পড়েছে, যদিও এনসিপি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
সমর্থন কম হওয়ায় বিএনপি ও জামায়াতসহ কয়েকটি দলের সঙ্গে জোট গঠনের আলোচনা চলছে বলে দলের শীর্ষ নেতাদের একজন জানিয়েছেন। তার মতে, এককভাবে নির্বাচনে গেলে দলটিকে হয়তো কোনো আসনেই জয় পাওয়া কঠিন হবে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, জোটে গেলে দলটির ‘বিপ্লবী’ পরিচয় ম্লান হয়ে যাবে।
লেখক ও বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ বলেন, জোটে গেলে এনসিপিকে আর আলাদা পথচলার দল হিসেবে দেখা নাও হতে পারে। ছাত্র আন্দোলনে ঐক্য থাকলেও আন্দোলনের পর বেশিরভাগ শিক্ষার্থী তাদের নিজ নিজ দলেই ফিরে যায়। ফলে যারা বেরিয়ে এনসিপিতে যোগ দেন, তাদের সংখ্যা তুলনামূলক কম।
চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও তরুণদের একটি অংশ এখনো এনসিপি'র দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের মতে, ধনী-ক্ষমতাবান পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতির বিপরীতে দলটি সাধারণ মানুষের নেতৃত্বের সুযোগ তৈরি করছে। এটি প্রমাণের জন্য দলটি নভেম্বর মাসে সাধারণ নাগরিকদের নিয়ে দুইদিনব্যাপী উন্মুক্ত সাক্ষাৎকারের আয়োজন করে। সেখানে রিকশাচালক থেকে শুরু করে প্রতিবাদে আহত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সবাই আবেদন করে।
রিকশাচালক আবেদনকারী সুজন খান বলেন, আমাকে সুযোগ দিলে আমি দেখিয়ে দেব সংসদে গিয়ে একজন সাধারণ মানুষ কী করতে পারে। দলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন ডাক্তার তাসনিম জারা, যিনি যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ থেকে সফল ক্যারিয়ার ছেড়ে দেশে ফিরে এসেছেন। তিনি বলেন, আমরা রাজনীতিকে পরিবার ও ক্ষমতাধরদের সীমানা থেকে বের করে সাধারণ মানুষের হাতে ফেরাতে চাই।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও মনে করেন, ভবিষ্যতের রাজনীতিতে তরুণদের গুরুত্ব বাড়বে।
তার মতে, তরুণদের সংসদে আসতে দিলে রাজনীতিতে নতুন ধারা সৃষ্টি হবে। এনসিপি'র লক্ষ্যও দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও রাজনৈতিক কাঠামো বদলানো। দলের নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, জিতুক বা হারুক নির্বাচনে অংশ নেওয়া মানেই আমরা নতুন কিছু করছি। তরুণদের নেতৃত্বে রাজনীতির নতুন অধ্যায় শুরু হলেও, সংগঠন তৈরি, ভোটার আস্থা অর্জন ও প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই এই তিন বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারলেই এনসিপি ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে সত্যিকারের শক্তি হয়ে উঠতে পারে।
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন