তিন দলের সমন্বয়ে ‘গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট’ গঠন: নাহিদ ইসলাম

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৭, ২০২৫, ০৮:২০ পিএম
তিন দলের সমন্বয়ে ‘গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট’ গঠন: নাহিদ ইসলাম

রাজনীতিতে নয়া অধ্যায়ের সূচনা ঘটিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) এর আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম তিনটি দলের সমন্বয়ে ‘গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট’ নামক নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। 

রোববার বিকেলে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ)র মিলনায়তনে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ ঘোষণাটি দেন।

নাহিদ ইসলাম বলেন, এই জোট কেবল নির্বাচনী সহযোগিতার উদ্দেশ্যে নয়; বরং দেশের রাজনৈতিক মর্যাদা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও গণমানুষের অধিকার পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যকে সামনে রেখে এ জোট গঠিত হয়েছে। তার ভাষায়, "আমরা শুধু ভোটের মাঠে একসঙ্গে যাওয়ার জন্য এক হইনি; আমরা এক হয়েছি রাষ্ট্র পরিচালনার দিকনির্দেশনা বদলানোর দৃঢ় দায়িত্ব নিয়ে।"

দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, প্রশাসনিক অচলাবস্থা, অর্থনৈতিক চাপে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের সংকট সব মিলিয়ে একটি স্থায়ী বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে বলে নাহিদ ইসলামের মন্তব্য। তিনি বলেন, জনগণ দেখতে পাচ্ছে প্রচলিত দলগুলোর নীতি-দর্শনে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে; সেই শূন্যতাকে পূরণেই জোটটি আত্মপ্রকাশ করেছে।

জোটে কোন কোন দল রয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। দল তিনটি হলো এমসিপি, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) এবং রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন। সে বিষয়ে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করলেন, তিনটি দল ইতোমধ্যে সমন্বিত রূপরেখায় সম্মত হয়েছে। তাদের লক্ষ্য দায়বদ্ধতা, স্বচ্ছতা ও অর্থনৈতিক ন্যায়সংগতির ওপর ভিত্তি করে উন্নয়নমুখী রাজনীতি গড়ে তোলা।

সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ ইসলাম বলেন, জাতীয় মর্যাদা রক্ষা মানে শুধু রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব নয়; এটি নাগরিকের মর্যাদা, মানবিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতাও নিশ্চিত করা। বাংলাদেশ এমন জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে রাজনৈতিক সাহস, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া এগোনো সম্ভব নয়।

গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট তাই তিনটি মূল অঙ্গীকার সামনে এনেছে

রাষ্ট্রযন্ত্রের সংস্কার

প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর রাজনৈতিক প্রভাব কমানো, প্রশাসনে জবাবদিহিতা বাড়ানো এবং নাগরিক সেবাকে দ্রুত ও স্বচ্ছ করার ওপর জোর দেবে জোট।

অর্থনৈতিক মুক্তি

নাহিদ ইসলাম বলেন, বর্তমানে সাধারণ মানুষ তীব্র মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানহীনতা ও আয় কমে যাওয়ার বেদনাদায়ক বাস্তবতায় পড়েছে। জোট রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার পুনর্মূল্যায়ন করে কৃষি, শিল্প, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও যুব উদ্যোক্তা উন্নয়নে বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করবে।

গণমানুষের অধিকার ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা

স্বাস্থ্য, শিক্ষা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নিরাপদ নগর জীবন, পরিবেশ সুরক্ষা—এসবকে নাগরিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার দাবি জানায় জোট।

নাহিদ ইসলাম স্পষ্ট করে বলেন যে নতুন জোটকে কেবল আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের কৌশল হিসেবে দেখা ভুল হবে। 

তার বক্তব্য "আমরা নির্বাচনী সুবিধার জন্য তৈরি হইনি। আমরা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় পুনর্গঠনের নীতিগত সংগ্রাম চালাতে চাই। নির্বাচন আমাদের জন্য একটি সুযোগ, কিন্তু লক্ষ্য নয়।"

তিনি আরও বলেন, দেশের রাজনীতিতে ধারাবাহিকভাবে যে বিভাজন ও বিরোধের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, সেখানে দায়িত্বশীল ও পরিমিত রাজনৈতিক আচরণের চর্চা জরুরি। গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট সেই নতুন রাজনৈতিক আচরণের মডেল দাঁড় করাতে চায়।

সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নাহিদ ইসলাম জানান, জোটের পূর্ণাঙ্গ নীতিপত্র, কর্মসূচি ও নেতৃত্ব কাঠামো খুব শিগগিরই প্রকাশ করা হবে। জোটের লক্ষ্য হবে নাগরিকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ জোরদার করা এবং বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন, যুবসমাজ, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় নেতৃত্বের অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি বিস্তৃত রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা।

ডিআরইউর মিলনায়তনে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ ইসলাম এ ঘোষণা দেন। এ সময় এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ুম উপস্থিত ছিলেন। উপস্থিত রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নতুন এই জোট ঘোষণার মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি সতেজ আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে টিকে থাকা দুই প্রধান ধারার বাইরে একটি বিকল্প কাঠামো গড়ে ওঠার সম্ভাবনা—তা রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য উল্লেখযোগ্য।

নাহিদ ইসলাম জানিয়েছেন, জোট আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মতবিনিময় সভা, কর্মশালা ও নাগরিক সংলাপ আয়োজন করবে। এসব কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষের সমস্যাগুলো সংগ্রহ করে জোটের নীতি-প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

তার ভাষায়, "গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট জনগণের রাজনৈতিক অনুভূতি প্রকাশের নতুন পথ খুলে দেবে। আমরা চাই মানুষ রাজনীতিকে ভয় নয় আস্থা ও সম্ভাবনার জায়গা হিসেবে দেখুক।"

গণতান্ত্রিক সংস্কার জোটের ঘোষণা দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি নতুন কেন্দ্রবিন্দু সৃষ্টি করেছে। এটি কেবল একটি জোট নয়—বরং প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামো সংস্কারের আহ্বান। দলীয় পরিচয়ের বাইরে নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও মর্যাদার রাজনীতি নতুন এই প্ল্যাটফর্মকে জনস্বার্থনির্ভর আন্দোলনের দিকে নিয়ে যেতে পারে বলে বিশ্লেষকদের মত।