বাংলাদেশের রাজনীতিতে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জোট ও আসন সমঝোতার হিসাব-নিকাশ দিন দিন জটিল আকার ধারণ করছে। বিশেষ করে গণ-অভ্যুত্থান–পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন সমমনা জোটে নতুন নতুন দলের আগ্রহ বাড়ায় আসন বণ্টন নিয়ে অনিশ্চয়তা ও টানাপোড়েন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
জামায়াতের সঙ্গে ইতিমধ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টিসহ আটটি দল একত্রে ৩০০ আসনে একক প্রার্থী দেওয়ার লক্ষ্যে আলোচনা শুরু করেছিল। শুরুতে এই উদ্যোগ রাজনৈতিক অঙ্গনে বিকল্প একটি শক্তিশালী বলয় তৈরির সম্ভাবনা সৃষ্টি করলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আসন ভাগাভাগির প্রশ্নে মতপার্থক্য প্রকট হয়ে ওঠে।
রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, জোটভুক্ত প্রতিটি দলই নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি, মাঠপর্যায়ের প্রভাব ও অতীত আন্দোলনের ভূমিকার ভিত্তিতে বেশি সংখ্যক আসনে প্রার্থী দেওয়ার দাবি তুলছে। এতে করে ‘কে কোথায় ছাড় দেবে’—এই প্রশ্নটি জোটের সবচেয়ে বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। কোনো কোনো আসনে জামায়াত ও শরিক দলগুলোর প্রার্থীরা সমানভাবে শক্ত অবস্থানে থাকায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
এই জটিলতার মধ্যেই নতুন করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), জেএসডি ও বাংলাদেশ লেবার পার্টির সঙ্গে জামায়াতের আলোচনা শুরু হওয়ায় জোটের ভেতরে অস্বস্তি আরও বেড়েছে। বিশেষ করে এনসিপির সঙ্গে সম্ভাব্য আসন সমঝোতার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর আট দলের ভেতরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—জোটের পরিধি বাড়লে বিদ্যমান শরিকদের প্রাপ্তি কতটা সংকুচিত হবে।
জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের অবশ্য এই পরিস্থিতিকে বড় সংকট হিসেবে দেখছেন না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আলোচনার মাধ্যমেই সব সমস্যার সমাধান সম্ভব এবং কেউ জোট ভাঙতে আগ্রহী নয়। তবে বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, আলোচনা দীর্ঘায়িত হওয়ায় শরিক দলগুলোর মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ জমছে।
খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক মনে করেন, সংকটের মূল কারণ হলো প্রত্যাশার তুলনায় বেশি আসনে প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ। তাঁর মতে, ৩০০ আসনে একক প্রার্থী দেওয়ার চেষ্টা চললেও শেষ পর্যন্ত কিছু আসন উন্মুক্ত রাখার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে জোটের এক শীর্ষ নেতা স্বীকার করেছেন, জোট বড় হলে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা না থাকলে ঐক্য ধরে রাখা কঠিন হবে।
এদিকে বিএনপির সঙ্গে দীর্ঘদিন যুগপৎ আন্দোলনে থাকা কয়েকটি দল এলডিপি, জেএসডি ও লেবার পার্টি আসন সমঝোতা না হওয়ায় নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ খুঁজছে। বিএনপির সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়ায় তারা জামায়াতের সঙ্গে সম্ভাব্য বোঝাপড়ার পথ খোলা রাখলেও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি। জেএসডি ইতিমধ্যে এককভাবে নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দিলেও দলটির ভেতরে জামায়াতের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।
আরেক দিকে, এনসিপি ও এবি পার্টি একদিকে জামায়াতের সঙ্গে আলোচনা ও যোগাযোগ রাখছে। এতে করে সদ্য গঠিত ‘গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট’-এর ভেতরেও অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। এই জোটের নেতারা প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছেন জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতা হলে জোটের ঘোষিত রাজনৈতিক লক্ষ্য ও আকাঙ্ক্ষা কতটা বাস্তবায়িত হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে জামায়াতের সামনে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, বিদ্যমান শরিকদের আস্থা ধরে রাখা। দ্বিতীয়ত, নতুন আগ্রহী দলগুলোকে যুক্ত করতে গিয়ে জোটের ভেতরের ভারসাম্য নষ্ট না করা। সময়মতো সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত না এলে একক প্রার্থী দেওয়ার লক্ষ্য ব্যাহত হতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত জোটের সামগ্রিক রাজনৈতিক কৌশলকে দুর্বল করে দেবে।
সব মিলিয়ে, আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াত ও সমমনা দলগুলোর আসন সমঝোতার আলোচনা এখন একটি সংবেদনশীল পর্যায়ে রয়েছে। আলোচনা কতটা বাস্তবসম্মত ছাড় ও সমঝোতার দিকে এগোয়, তার ওপরই নির্ভর করবে এই জোট ভবিষ্যতে কতটা কার্যকর রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন