মির্জা ফখরুল

রাজনৈতিক ক্রান্তিকালে দেশ

ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২৮, ২০২৫, ০১:৫৩ পিএম
রাজনৈতিক ক্রান্তিকালে দেশ

বাংলাদেশ বর্তমানে এক সংবেদনশীল রাজনৈতিক সময় অতিক্রম করছে এমন মন্তব্য করে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, দেশকে অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যে একটি গোষ্ঠী নেপথ্যে সক্রিয় রয়েছে। 

তিনি মনে করেন, চলমান আন্দোলন, বিভ্রান্তিকর বক্তব্য ও নানা গুজব কেবল স্বতঃস্ফূর্ত নয়; বরং এর পেছনে সুপরিকল্পিত উদ্দেশ্য কাজ করছে। এই পরিস্থিতিতে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ ও সচেতন থাকার আহ্বান জানান তিনি।

ঠাকুরগাঁও শহরে স্থানীয় আলেম–ওলামাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, দেশের মানুষ যেন অতীতের অন্ধকার অধ্যায়ে ফিরে না যায়, সে বিষয়ে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। বিভেদ ও অনৈক্য সৃষ্টি হলে ষড়যন্ত্রকারীরা সুযোগ পাবে এমন সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেন তিনি। 

তার ভাষায়, রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়লে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্র ও সাধারণ মানুষ।

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে বিএনপির এই শীর্ষ নেতা বলেন, নির্বাচন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করার চেষ্টা দৃশ্যমান হচ্ছে। 

তিনি মনে করেন, জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে এবং গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে, যাতে কোনো শক্তি নির্বাচন বানচাল করতে না পারে। তাঁর মতে, আগামী পাঁচ বছর দেশের দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করবে এই নির্বাচন এ কারণেই এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আলেম–ওলামাদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে মির্জা ফখরুল স্পষ্টভাবে বলেন, বিএনপি কখনোই কোরআন ও সুন্নাহবিরোধী কোনো আইন সমর্থন করে না। বরং দলটি ইসলামের মূলনীতি ও নৈতিকতার সঙ্গেই রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশ্নে অঙ্গীকারবদ্ধ। 

তার দাবি, বিএনপি সম্পর্কে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, এই দেশে কোরআন ও সুন্নাহর বাইরে আইন প্রণয়নের অনুমতি দেওয়া হবে না এটাই দলের প্রতিশ্রুতি।

তিনি আরও বলেন, ইসলাম শান্তির ধর্ম এবং বিএনপি সেই শান্তির দর্শনেই বিশ্বাস করে। দলটি চায়, একটি গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে স্থিতিশীলতা ও শান্তি ফিরে আসুক। ধর্মীয় মূল্যবোধ, সামাজিক সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষায় বিএনপির ভূমিকা অতীতেও ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে এমন প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

মির্জা ফখরুল তার বক্তব্যে বিগত ১৫ বছরের শাসনামলের তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, এই সময়ে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করা হয়েছে, গণতান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে ফেলা হয়েছে এবং অর্থনীতিকে দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষায় ব্যাংকিং খাত লুটপাটের শিকার হয়েছে এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে, যার বোঝা বইতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে।

এ ছাড়া রাজনৈতিক ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার উদ্দেশ্যে বিরোধী দলগুলোর ওপর দমন–পীড়ন চালানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। বিশেষ করে আলেম–ওলামাদের গ্রেপ্তার, হয়রানি ও নির্যাতনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, সেই সময় ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছেন। তাঁর মতে, সমাজে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল, যেখানে যেকোনো সময় কাউকে উগ্রবাদী আখ্যা দিয়ে আটক করা হতো।

বিএনপির মহাসচিব বলেন, বর্তমানে দলের অবস্থান ও আদর্শ নিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চলছে। তবে তিনি বিশ্বাস করেন, দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ বাস্তবতা বুঝতে সক্ষম। তার ভাষায়, ধর্ম, সংস্কৃতি ও সামাজিক মূল্যবোধ রক্ষায় বিএনপি অতীতে যেমন ভূমিকা রেখেছে, বর্তমানেও তেমন দায়িত্বশীল অবস্থানেই আছে।

তিনি মনে করেন, এই সংকটময় সময়ে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো জাতীয় ঐক্য। পারস্পরিক সন্দেহ ও বিভাজন পরিহার করে যদি সবাই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পক্ষে দাঁড়ায়, তাহলে ষড়যন্ত্রকারীরা সফল হতে পারবে না। শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশই দেশকে সামনে এগিয়ে নিতে পারে এই বার্তাই তিনি তুলে ধরেন।

মতবিনিময় সভায় জেলা পর্যায়ের বিএনপি নেতৃবৃন্দ, স্থানীয় আলেম–ওলামা ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা উপস্থিত ছিলেন। আলোচনায় সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নির্বাচন, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নিয়ে মতামত বিনিময় হয়। সভাটি শান্তিপূর্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়।