নির্বাচনী দামামা বাজার সাথে সাথেই সরগরম হয়ে উঠেছে কুমিল্লার রাজনৈতিক অঙ্গন। বিশেষ করে কুমিল্লা-৪ (দেবিদ্বার) আসনে এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও শক্তিশালী প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহর সাম্প্রতিক একটি মন্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
শুক্রবার মনোনয়নপত্র যাচাই, বাছাই শেষে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছেন এই তরুণ নেতা।
তার স্পষ্ট অভিযোগ, স্থানীয় প্রশাসন বর্তমানে একটি নির্দিষ্ট দলের (বিএনপি) দিকে ঝুঁকে পড়েছে, যা একটি সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
কুমিল্লা জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে এদিন ছিল উৎসবমুখর কিন্তু টানটান উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ। যাচাই, বাছাইকালে কুমিল্লা-৪ (দেবিদ্বার) আসনের বিএনপি প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর হলফনামা নিয়ে আপত্তি তোলেন হাসনাত আবদুল্লাহ ও তার আইনজীবী।
তাদের দাবি, বিএনপি প্রার্থী হলফনামায় তথ্য গোপন করেছেন এবং তিনি একজন ঋণখেলাপি। এ নিয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার সামনেই দুই পক্ষের মধ্যে প্রায় আধঘণ্টা ধরে তীব্র বাগবিতণ্ডা চলে। যদিও শেষ পর্যন্ত উভয় প্রার্থীর মনোনয়নপত্রই বৈধ ঘোষণা করেন জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা মু. রেজা হাসান।
মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণার পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
তিনি অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে বলেন, প্রশাসনের আচরণে স্পষ্ট দ্বিচারিতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আমাদের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য, প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও কেন একজন ঋণখেলাপি প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ করা হলো, তা বোধগম্য নয়। নির্বাচনী বিধিমালা অনুযায়ী তথ্য গোপন করলে প্রার্থিতা বাতিলের বিধান থাকলেও এখানে তা মানা হয়নি। এই আচরণ দেখে মনে হচ্ছে প্রশাসন বিএনপির দিকে ঝুঁকে পড়েছে। এ সময় তার সাথে উপস্থিত আইনজীবীবৃন্দ হলেন, হাসনাত আবদুল্লাহর আইনি পরামর্শক দল।
হাসনাত আবদুল্লাহর অভিযোগ অনুযায়ী, মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করার তথ্য গোপন করেছেন এবং উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশের বিষয়টিতেও স্বচ্ছতা বজায় রাখেননি।
হাসনাত আবদুল্লাহ মনে করেন, এটি ব্যক্তিগত তথ্য গোপনের গুরুতর অপরাধ। তিনি প্রশ্ন তোলেন, প্রশাসনের কাছে দালিলিক প্রমাণ দেওয়ার পরও যদি ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে সাধারণ ভোটাররা সুষ্ঠু নির্বাচনের আশা কীভাবে করবে? তিনি এই বিষয়ে উচ্চতর আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়ার ইঙ্গিতও দিয়েছেন।
রাজনীতির মাঠ যখন অভিযোগে উত্তপ্ত, ঠিক তখনই এক বিরল সৌহার্দ্যের দৃশ্য দেখা যায় রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে। তীব্র বাদানুবাদ এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে অভিযোগ তুললেও মনোনয়নপত্র যাচাই, বাছাই শেষে হাসনাত আবদুল্লাহ ও মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী একে অপরের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। তিক্ত রাজনৈতিক লড়াইয়ের মাঝে এই ব্যক্তিগত শিষ্টাচার উপস্থিত সাংবাদিকদের নজর কেড়েছে।
হাসনাত আবদুল্লাহর এই অভিযোগ কুমিল্লার নির্বাচনী আমেজে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ভোটারদের মনে এখন বড় প্রশ্ন, আসলেই কি প্রশাসন প্রভাবমুক্ত থাকতে পারবে? একজন শক্তিশালী প্রার্থীর এমন সরাসরি অভিযোগ নির্বাচন কমিশনকে বাড়তি চাপে ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হাসনাত আবদুল্লাহর দাবি, যদি প্রশাসন এখন থেকেই নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে না পারে, তবে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের লক্ষ্য ব্যর্থ হতে পারে।
কুমিল্লা-৪ (দেবিদ্বার) আসনে হাসনাত আবদুল্লাহর চ্যালেঞ্জ এবং প্রশাসনের প্রতি অনাস্থা প্রকাশের বিষয়টি আগামী দিনগুলোতে নির্বাচনী প্রচারণায় বড় প্রভাব ফেলবে। একদিকে আইনি লড়াই, অন্যদিকে রাজপথের প্রচারণা, সব মিলিয়ে কুমিল্লার এই আসনটি এখন সারা দেশের মানুষের কাছে কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু। প্রশাসন কি হাসনাত আবদুল্লাহর এই শঙ্কা দূর করে একটি সমান সুযোগের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারবে? সেই উত্তরের অপেক্ষায় এখন সাধারণ ভোটাররা।
নির্বাচন কেবল ভোটের দিন নয়, বরং মনোনয়নপত্র যাচাই, বাছাই থেকেই এর স্বচ্ছতা শুরু হয়। হাসনাত আবদুল্লাহর অভিযোগগুলো গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা প্রশাসনের নৈতিক দায়িত্ব।
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন