জামায়াতের একাধিক হেভিওয়েটের প্রার্থিতা বাতিল, আপিলেই শেষ ভরসা

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: জানুয়ারি ৪, ২০২৬, ০৫:০৯ পিএম
জামায়াতের একাধিক হেভিওয়েটের প্রার্থিতা বাতিল, আপিলেই শেষ ভরসা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর একাধিক প্রভাবশালী প্রার্থীর মনোনয়নপত্র ধারাবাহিকভাবে বাতিল হওয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন আসনে দলটির হেভিওয়েট হিসেবে পরিচিত প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিল হওয়াকে জামায়াতের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা। 

এ অবস্থায় মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে কিছুটা হতাশা দেখা দিলেও দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আপিল প্রক্রিয়ায় প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার বিষয়ে তাঁরা আশাবাদী।

রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যাচাই-বাছাই শেষে আইনগত ও প্রক্রিয়াগত কারণ দেখিয়ে এসব মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ঋণখেলাপি সংক্রান্ত জটিলতা, তথ্য গোপন, হলফনামায় অসঙ্গতি এবং নির্বাচন আইন অনুযায়ী অযোগ্যতার বিষয়গুলো মনোনয়ন বাতিলের ক্ষেত্রে মুখ্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাতিল হওয়া জামায়াতের প্রভাবশালী প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছেন কক্সবাজার-২ আসনে দলের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ, যশোর-২ আসনে ডা. মোসলেহ উদ্দিন, ঢাকা-২ আসনে আবদুল হক, গাইবান্ধা-১ আসনে মাজেদুর রহমান মাজেদ, কুমিল্লা-৩ আসনে ইউসুফ হাকিম সোহেল এবং কুড়িগ্রাম-৩ আসনে মাহবুবুল আলম সালেহী।

এছাড়া জামায়াতের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত আরও কয়েকটি আসনেও দলের মনোনীত প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিল বা স্থগিত করা হয়েছিল। তবে গাইবান্ধা-১ আসনে মাজেদুর রহমান মাজেদের মনোনয়ন প্রথমে বাতিল হলেও পরবর্তীতে তা বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।

মনোনয়ন বাতিলের এই সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন জামায়াত নেতারা। এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ফ্যাসিবাদী সময়ের সাজানো ও মিথ্যা মামলাকে সামনে রেখে তার মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। হলফনামায় ঋণখেলাপি বা কর ফাঁকির কোনো অভিযোগ না থাকা সত্ত্বেও ২০১৩ সালের একটি আদালত অবমাননার মামলাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রশাসনের ভেতরে দলীয় প্রভাব ও পক্ষপাত থাকলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, মনোনয়ন যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সব প্রার্থীর জন্য একই আইন ও বিধি প্রযোজ্য। কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীকে বিশেষ সুবিধা কিংবা অসুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই। কমিশনের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপিল হলে শুনানির মাধ্যমে বিষয়গুলো নিষ্পত্তি করা হবে। ফলে যাঁদের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে, তাদের ভাগ্য এখন আপিল শুনানির ওপর নির্ভর করছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রভাবশালী প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিল হলে জামায়াতের নির্বাচনী প্রস্তুতিতে বড় প্রভাব পড়তে পারে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আইনুল ইসলাম বলেন, মনোনয়ন বাতিলের বিষয়গুলো এখনো চূড়ান্ত নয়; আপিল বা আদালতের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে প্রার্থিতা ফেরত আসে। তবে শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন না পেলে এর নেতিবাচক প্রভাব নেতাকর্মী ও ভোটারদের মনোভাবের ওপর পড়তে পারে। 

তিনি আরও বলেন, প্রার্থীদের হলফনামায় দেওয়া আর্থিক তথ্য আরও কঠোরভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

জামায়াতের কেন্দ্রীয় কমিটির মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, সারাদেশে যাচাই-বাছাই শেষে কিছু মনোনয়ন বাতিল বা স্থগিত হওয়া সাময়িক বিষয়। অনেক ক্ষেত্রে কাগজপত্রের ঘাটতি বা তথ্যগত ভুল থাকে, যা আপিলের মাধ্যমে সমাধান হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। 

দলের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বিভিন্ন জেলায় রিটার্নিং কর্মকর্তাদের আচরণে ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে। কোথাও তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে যা গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের সিদ্ধান্ত অব্যাহত থাকলে নির্বাচনের অবাধ ও নিরপেক্ষতা নিয়ে দেশবাসীর মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

মনোনয়ন বাতিল ও স্থগিত হওয়াকে কেন্দ্র করে জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া বাড়ছে। তবে আপিল প্রক্রিয়ায় প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার আশায় কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী তাঁরা নির্বাচনী প্রস্তুতি অব্যাহত রেখেছেন।

ইএইচ