আসন্ন গণভোট ও জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অন্তর্বর্তীকালীন রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন উত্তাপ ছড়িয়েছে। ১১ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেছেন যে, একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল গণভোটে ‘না’ ভোট প্রদানের পক্ষে গোপনে ও প্রকাশ্যে প্রচারণা চালাচ্ছে।
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, গণভোটে যদি ‘না’ জয়যুক্ত হয়, তবে দেশের সংস্কার প্রক্রিয়া থমকে যাবে এবং জুলাই অভ্যুত্থানের মূল চেতনা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে।
মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপি কার্যালয়ের সামনে ‘ভোটের গাড়ি’ উদ্বোধনকালে তিনি এসব মন্তব্য করেন।
সরাসরি নাম না নিলেও তার বক্তব্যের লক্ষ্য যে বিএনপি, তা রাজনৈতিক মহলে স্পষ্ট। নাহিদ ইসলাম তার বক্তব্যে গণভোটের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ছাত্র-জনতা যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল, তার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতেই এই সংস্কার ও গণভোট।
তিনি বলেন, একটি রাজনৈতিক দল সুকৌশলে ‘না’ এর পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে। তাদের উদ্দেশ্য হলো আগের সেই বিতর্কিত ও ত্রুটিপূর্ণ পদ্ধতি বহাল রাখা। যদি গণভোটে ‘না’ জয়ী হয়, তবে জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদের রক্ত ও ত্যাগের কোনো মূল্য থাকবে না।
তিনি আরও যোগ করেন, গণভোটের জয়-পরাজয়ের ওপরই নির্ভর করছে রাষ্ট্র মেরামতের ভবিষ্যৎ। যারা ‘না’ এর পক্ষে কাজ করছেন, তারা মূলত পুরাতন ফ্যাসিবাদী কাঠামোকেই ফিরিয়ে আনতে চান।
দেশের শীর্ষ একটি রাজনৈতিক দল ভোটারদের বিভিন্ন ধরনের ‘কার্ড’ বা সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, তার কঠোর সমালোচনা করেন নাহিদ ইসলাম।
তিনি এটিকে সস্তা প্রচারণা ও প্রতারণা হিসেবে অভিহিত করেছেন। নাহিদ ইসলাম প্রশ্ন তুলে বলেন, একটি দল বলছে তারা ক্ষমতায় গেলে বিভিন্ন কার্ডের মাধ্যমে সুবিধা দেবে। কিন্তু এই বিশাল অংকের টাকা কোথা থেকে আসবে, তার কোনো রূপরেখা তারা দিচ্ছে না। আওয়ামী লীগও একসময় ১০ টাকায় চাল খাওয়ানোর কথা বলে জনগণকে ধোঁকা দিয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত দেশ ছাড়খার করে দিয়েছে। সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য মানুষের সঙ্গে এমন প্রতারণা বন্ধ করতে হবে।
নির্বাচন পরবর্তী পরিকল্পনা নিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, এনসিপি এবং তাদের ১১ দলীয় জোট নির্বাচনে জয়লাভ করলে সরকার গঠন করে দ্রুততম সময়ে রাষ্ট্রীয় সংস্কার সম্পন্ন করবে। তিনি দাবি করেন, তাদের জোট কোনো সস্তা প্রতিশ্রুতি নয়, বরং টেকসই রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে কাজ করছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এনসিপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান ও সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মোহাম্মদ সজীব ভূঁইয়াসহ দলের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
আসিফ মাহমুদও তার বক্তব্যে সুষ্ঠু নির্বাচন ও গণভোটের মাধ্যমে জনমতের প্রতিফলন ঘটানোর ওপর জোর দেন। নির্বাচনী প্রচারণাকে তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দিতে ‘ভোটের গাড়ি’ উদ্বোধন করা হয়। এই ভ্রাম্যমাণ প্রচারণার মাধ্যমে গণভোটের প্রয়োজনীয়তা এবং এনসিপির নির্বাচনী ইশতেহার জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হবে বলে জানানো হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নাহিদ ইসলামের এই বক্তব্য নির্বাচনের আগে ১১ দলীয় জোট ও বড় দলগুলোর, বিশেষ করে বিএনপির মধ্যে বিদ্যমান দূরত্ব ও আদর্শিক সংঘাতকে আরও স্পষ্ট করে তুলল। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ নিয়ে যে মেরুকরণ শুরু হয়েছে, তা আগামী দিনের নির্বাচনি সহিংসতা বা উত্তেজনা বৃদ্ধির কারণ হতে পারে। জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে গণভোটকে এসিড টেস্ট হিসেবে দেখছে এনসিপি।
নাহিদ ইসলামের এই হুঁশিয়ারি কেবল একটি দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়, বরং ভোটারদের প্রতি একটি বিশেষ বার্তাও বটে। এখন দেখার বিষয়, রাজপথের বড় দলগুলো এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কী ধরনের রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বন করে।
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন