দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় নির্বাসনে থাকার পর দেশে ফিরে বিএনপির পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন তারেক রহমান। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাঁর এই নেতৃত্ব গ্রহণকে নিছক একটি দলের পদবদল নয়, বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র কাঠামোর মোড় পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, এতদিন খালেদা জিয়ার প্রতীকী কর্তৃত্বে দল ঐক্যবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে তারেক রহমান একক নেতৃত্বে আসীন হয়েছেন। এটি তাঁর জন্য যেমন নিরঙ্কুশ ক্ষমতার সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি দলের শৃঙ্খলা রক্ষা ও জনআকাঙ্ক্ষা পূরণের পূর্ণ দায়ভারও তাঁর ওপর ন্যস্ত করেছে।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন বক্তব্যে তারেক রহমানের রাজনৈতিক ভাষায় পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিহিংসার রাজনীতির বদলে তিনি এখন পুনর্মিলন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং রাষ্ট্র পুনর্গঠনের কথা বলছেন। বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অতীতের 'হাওয়া ভবন' কেন্দ্রিক নেতিবাচক ভাবমূর্তি মুছে ফেলা এবং আওয়ামী লীগ পরবর্তী রাজনীতিতে জামায়াতসহ অন্যান্য ধর্মীয় দলগুলোর সঙ্গে আদর্শিক লড়াইয়ে জয়ী হওয়া।
সাধারণ মানুষ এখন কেবল একজন দলীয় প্রধান নয়, বরং একজন রাষ্ট্রনায়কের প্রত্যাশা করছে যিনি ভঙ্গুর অর্থনীতি ও প্রশাসনিক অস্থিরতা কাটিয়ে স্থিতিশীলতা ফেরাতে পারবেন। আগামী নির্বাচনের ফলাফলই নির্ধারণ করবে তারেক রহমান কি কেবল একজন সফল রাজনীতিক হিসেবে থাকবেন, নাকি রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো সাধারণ ক্ষমতার পরিবর্তন ছিল না। এটি ছিল রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতার এক চূড়ান্ত বিস্ফোরণ। গত ১৫ বছরের প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্ব, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য রাষ্ট্রকে একটি ব্যর্থ কাঠামোর দিকে ঠেলে দিয়েছিল। সেই উত্তাল সময়ে ছাত্র-জনতার রক্তে কেনা এই নতুন বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য পরীক্ষাটি আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই নতুন বাস্তবতায় দেড় যুগের নির্বাসন কাটিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে ফেরা বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
বিএনপির রাজনীতিতে খালেদা জিয়া সবসময়ই ছিলেন ঐক্যের প্রতীক। তারেক রহমান দীর্ঘদিন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করলেও দলের ভেতরে ও বাইরে খালেদা জিয়ার একটি নৈতিক ও আবেগীয় অবস্থান ছিল। এখন সেই ছাতা সরে যাওয়ার পর তারেক রহমান সম্পূর্ণ একা এবং স্বাধীন।
এই একক নেতৃত্ব তাঁর জন্য একটি "দ্বিমুখী তলোয়ার"। একদিকে তিনি এখন যেকোনো সিদ্ধান্ত দ্রুত এবং স্বাধীনভাবে নিতে পারছেন, অন্যদিকে দলের কোনো ব্যর্থতা বা বিশৃঙ্খলার জন্য তিনি আর কারো ওপর দায় চাপাতে পারবেন না। তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও ধৈর্য এখন দলের ভেতরের শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনের প্রধান মানদণ্ড।
ইতিহাসের পাতায় দেখা গেছে, নির্বাসন হয় একজন নেতাকে ধ্বংস করে দেয়, অথবা তাঁকে একজন পরিণত রাষ্ট্রনায়কে রূপান্তরিত করে। দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা এর উজ্জ্বল উদাহরণ। তারেক রহমানও দীর্ঘ সময় লন্ডনে নির্বাসিত ছিলেন। এই সময়ে তিনি অসংখ্য মামলা, কুৎসা এবং রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার শিকার হয়েছেন।
গত কয়েক মাসের তাঁর বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাঁর ভাষায় একটি গুণগত পরিবর্তন এসেছে। আগে যেখানে কেবল ক্ষমতা দখলের লড়াই ছিল প্রধান, সেখানে এখন স্থান পাচ্ছে "রাষ্ট্র সংস্কার" এবং "জাতীয় পুনর্মিলন"। তিনি বারবার বলছেন—"আমরা প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না।" এই পরিবর্তনের সুরটি যদি বাস্তবে রূপ পায়, তবে তা বাংলাদেশের দ্বান্দ্বিক রাজনীতিতে এক নতুন ধারার সূচনা করতে পারে।
তারেক রহমানের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা হলো ২০০১-২০০৬ মেয়াদের কিছু নেতিবাচক প্রচারণা এবং 'হাওয়া ভবন' সংক্রান্ত অভিযোগ। বিরোধী পক্ষগুলো দীর্ঘ সময় ধরে এই ইস্যুটিকে তাঁর বিরুদ্ধে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। এই নেতিবাচক ভাবমূর্তি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য কেবল সুন্দর বক্তব্য যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন:
দুর্নীতিবিরোধী কঠোর অবস্থান: দলের ভেতরে দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত করে বহিষ্কার করা।
প্রশাসনিক সংস্কারের রোডম্যাপ: রাষ্ট্র পরিচালনায় গেলে কীভাবে নিরপেক্ষ প্রশাসন গড়বেন, তার স্পষ্ট পরিকল্পনা।
সুশাসন নিশ্চিত করা: দলীয় ক্যাডার রাজনীতির বদলে জনসেবামূলক রাজনীতি চালু করা।
মানুষ বিশ্বাস করে কাজে। তারেক রহমান যদি তাঁর দলের নেতা-কর্মীদের দখলদারি ও চাঁদাবাজি থেকে দূরে রাখতে পারেন, তবেই সাধারণ মানুষের মনে তাঁর প্রতি সত্যিকারের বিশ্বাস ফিরবে।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ দৃশ্যত নিষিদ্ধ এবং মাঠের বাইরে। ফলে বিএনপির সামনে এখন আর কোনো সনাতনী প্রতিপক্ষ নেই। বর্তমানের লড়াইটি হচ্ছে আদর্শিক। একদিকে বিএনপির উদারপন্থী জাতীয়তাবাদ, অন্যদিকে জামায়াত ও অন্যান্য ধর্মীয় দলগুলোর কট্টরপন্থী আদর্শ। এই মেরূকরণে তারেক রহমানকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পা ফেলতে হবে। তরুণ প্রজন্মের বড় একটি অংশ যারা ২০২৪-এর আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে, তারা কোনো ধরনের উগ্রবাদ বা স্বৈরতন্ত্র পছন্দ করে না। তারেক রহমানকে এই নতুন প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করতে হবে।
বাংলাদেশ বর্তমানে একটি চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মুদ্রাস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট এবং কর্মসংস্থানের অভাব সাধারণ মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। এই অবস্থায় একজন রাষ্ট্রনায়কের কাছ থেকে মানুষ কেবল রাজনৈতিক বক্তৃতা চায় না, চায় টেকসই অর্থনৈতিক পরিকল্পনা।
তারেক রহমানকে প্রমাণ করতে হবে যে, তাঁর দল ক্ষমতায় গেলে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে এবং পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে এনে দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা সম্ভব হবে। বাজার সিন্ডিকেট ভাঙা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার কার্যকর কৌশলই হবে তাঁর জনপ্রিয়তার আসল চাবিকাঠি।
রাজনীতিকরা চিন্তা করেন পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে, কিন্তু একজন রাষ্ট্রনায়ক চিন্তা করেন পরবর্তী প্রজন্ম নিয়ে। তারেক রহমান এখন ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। তিনি কি কেবল ভোট জিতে প্রধানমন্ত্রী হতে চান, নাকি একটি বিধ্বস্ত রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করে ইতিহাসে অমর হতে চান?
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি একজন ত্রাণকর্তা দাবি করে। বিচার বিভাগকে স্বাধীন করা, নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার মতো মৌলিক কাজগুলো যদি তিনি সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারেন, তবেই তিনি রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন।
তারেক রহমানের নেতৃত্ব কেবল একটি দলের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, এটি এখন জাতীয় ভাগ্যের সাথে জড়িত। তাঁর দীর্ঘ নির্বাসনের যাতনা এবং বর্তমানের রাজনৈতিক বাস্তবতা তাঁকে কতটা পরিণত করেছে, তার প্রমাণ পাওয়া যাবে আগামী জাতীয় নির্বাচনে। জনগণ তাঁকে কেবল আওয়ামী লীগের বিকল্প হিসেবে দেখবে না, বরং একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের কারিগর হিসেবে দেখতে চায়।
তারেক রহমান কি পারবেন ইতিহাসের এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে? তিনি কি পারবেন অতীতের গ্লানি মুছে একটি সোনালী ভবিষ্যৎ উপহার দিতে? সময়ই বলে দেবে তিনি কি কেবল একজন 'রাজনীতিক' হিসেবে ক্ষমতা ভোগ করবেন, নাকি 'রাষ্ট্রনায়ক' হয়ে বাংলাদেশের জনগণের হৃদয়ে স্থায়ী আসন নেবেন।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন