রাজশাহীতে প্রতীক বরাদ্দে উত্তেজনা

জাপাকে প্রতীক দিলে রাজশাহীতে নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: জানুয়ারি ২১, ২০২৬, ০৪:৩৪ পিএম
জাপাকে প্রতীক দিলে রাজশাহীতে নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না

রাজশাহীতে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাঠ এখন সংঘাত আর হুমকির মুখে। বুধবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আয়োজিত প্রতীক বরাদ্দ অনুষ্ঠানে এক নজিরবিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। 

জাতীয় নাগরিক পার্টির এনসিপির স্থানীয় এক নেতা প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, আওয়ামী লীগের সহযোগী হিসেবে পরিচিত জাতীয় পার্টিকে নির্বাচনী প্রতীক দেওয়া হলে রাজশাহীতে ভোটের আয়োজন পণ্ড করে দেওয়া হবে। এই প্রকাশ্য হুমকিতে খোদ জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়েছে।

প্রতীক বরাদ্দে বাধা বুধবার সকাল থেকেই রাজশাহীর জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে প্রার্থীদের উপস্থিতিতে উৎসবমুখর পরিবেশে প্রতীক বরাদ্দ শুরু করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক আফিয়া আখতার। 

তবে দুপুরের দিকে সেখানে হাজির হন এনসিপির কার্যক্রম স্থগিত থাকা জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক জেলা আহ্বায়ক নাহিদুল ইসলাম ওরফে সাজু। তিনি সরাসরি রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে গিয়ে একটি লিখিত অভিযোগপত্র জমা দেন। সেখানে দাবি করা হয়, যারা বিগত স্বৈরাচারী শাসনামলে গণতন্ত্র ধ্বংস করেছে এবং জনগণের ভোটাধিকার হরণ করেছে, তাদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কোনো অধিকার নেই।

এনসিপির লিখিত অভিযোগের ভাষ্য নাহিদুল ইসলামের দেওয়া স্মারকলিপিতে অত্যন্ত কড়া ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয় আমরা অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি যে, আওয়ামী লীগের দোসর জাতীয় পার্টিসহ স্বৈরাচারী ব্যবস্থার সহযোগী ব্যক্তি ও গোষ্ঠী এই নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছে এবং তাদের প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। 

এরা অতীতে গণতন্ত্র হত্যা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেছে। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে এসব স্বৈরাচারী শক্তিকে রাজনৈতিকভাবে প্রত্যাখ্যান করা সময়ের দাবি। অভিযোগে আরও দাবি করা হয়, ভোট কারচুপি ও দমন-পীড়নের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের প্রার্থিতা বাতিল করে নির্বাচন কমিশনকে সাহসিকতার পরিচয় দিতে হবে।

আইনের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই এনসিপি নেতার লিখিত অভিযোগ ও বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে রিটার্নিং কর্মকর্তা আফিয়া আখতার আইনের কঠোর অবস্থানের কথা মনে করিয়ে দেন। তিনি অত্যন্ত ধৈর্য্যের সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং বলেন আমরা পুরোপুরি আইন অনুযায়ী কাজ করছি। চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা ইতোমধ্যেই প্রকাশিত হয়ে গেছে। এই পর্যায়ে এসে জাতীয় পার্টির প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ না করার কোনো আইনি ভিত্তি বা সুযোগ আমাদের নেই। আইনের ঊর্ধ্বে গিয়ে প্রশাসন একটি কাজও করতে পারবে না।

নাহিদুলের চূড়ান্ত আলটিমেটাম রিটার্নিং কর্মকর্তার আইনি ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হতে পারেননি এনসিপি নেতা নাহিদুল ইসলাম। তিনি সম্মেলনে উপস্থিত সবার সামনে চিৎকার করে বলেন রাজশাহীতে জাতীয় পার্টি বা আওয়ামী লীগের কোনো দোসরকে প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে না। যদি আপনারা প্রতীক দেন, তবে রাজশাহীতে কোনো জাতীয় নির্বাচন হবে না। হতে দেওয়া হবে না ইনশাআল্লাহ। 

এ সময় তাঁর সাথে থাকা কয়েকজন অনুসারী উচ্চস্বরে সমর্থন জানিয়ে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করে তোলেন। পরে নাহিদুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে জানান, আগামীকাল বৃহস্পতিবার তাঁরা জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করবেন। সন্তোষজনক জবাব না পেলে কঠোর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের উদ্বেগ রাজশাহীর জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রতীক বরাদ্দের মতো একটি আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে নির্বাচন বন্ধের হুমকি দেওয়া গণতান্ত্রিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী। যদিও ৫ আগস্ট পরবর্তী পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগীদের প্রতি জনমনে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে, কিন্তু আইনি প্রক্রিয়া চ্যালেঞ্জ করে নির্বাচন ঠেকিয়ে দেওয়ার ঘোষণা নির্বাচনী পরিবেশকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। 

প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রতীক বরাদ্দ শেষে প্রচারণার কাজ শুরু হবে। তবে এনসিপির এই কঠোর অবস্থানের পর জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা কতটা নিরাপদে প্রচার চালাতে পারবেন এবং ভোটের দিন আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেমন থাকবে, তা নিয়ে বড় ধরণের সংশয় তৈরি হয়েছে।

সর্বশেষ পরিস্থিতি রাজশাহীর সাধারণ ভোটাররা এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানে অনেকটা দ্বিধাবিভক্ত। একদিকে স্বৈরাচারমুক্ত নির্বাচনের আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে সংঘাতহীন ভোট গ্রহণের প্রত্যাশা। এখন সবার নজর আগামীকাল এনসিপির পরবর্তী পদক্ষেপ এবং নির্বাচন কমিশনের প্রতিক্রিয়ার দিকে। রাজশাহী মহানগরীতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সকল প্রার্থীকে নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

জেএইচআর