রাজধানীর মিরপুর আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ আজ যেন এক জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরুর প্রথম দিনেই ঢাকা-১৫ আসনে নিজেদের শক্তির জানান দিল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। শুধু দলীয় শক্তি প্রদর্শনই নয়, জুলাই আন্দোলনের চেতনায় গঠিত ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি)-র আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সশরীরে উপস্থিতি এই সমাবেশের রাজনৈতিক গুরুত্বকে নিয়ে গেছে এক ভিন্ন উচ্চতায়।
বৃহস্পতিবার বিকেল পৌনে ৩টায় সমাবেশ শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই মিরপুরের অলিগলি ‘আল্লাহু আকবার’ এবং নির্বাচনী স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে। এই আসন থেকে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান নিজে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। গত ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দের পর আজই প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রচারণায় নামলেন তিনি।
সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান একটি ‘বৈষম্যহীন ও ইনসাফভিত্তিক’ বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, 'আমরা কোনো ব্যক্তিগত লাভের জন্য রাজনীতি করি না। জুলাই-আগস্টের শহীদদের রক্ত আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে মাথানত না করে বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে হয়। ঢাকা-১৫ আসন থেকে শুরু হওয়া এই ইনসাফের লড়াই সারাদেশে ছড়িয়ে পড়বে।
সমাবেশের সবচেয়ে আলোচিত দিক ছিল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জুলাই আন্দোলনের অন্যতম স্থপতি নাহিদ ইসলামের উপস্থিতি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জামায়াতের আমিরের নির্বাচনী প্রচারণায় নাহিদ ইসলামের যোগদান কেবল সংহতি নয়, বরং আগামী দিনের একটি বৃহত্তর ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক শক্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সমাবেশে বক্তব্যে নাহিদ ইসলাম বলেন, 'আমরা একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, যেখানে ভোটাধিকার হবে প্রশ্নাতীত। জুলাই আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে যারা রাজপথে আপসহীন ছিল, তাদের পক্ষেই তরুণ প্রজন্ম অবস্থান নেবে।' উল্লেখ্য, জামায়াত ও এনসিপি জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে লড়ার বিষয়ে আগেই সমঝোতা করেছে, যার অংশ হিসেবে ঢাকা-১১ আসনে জামায়াত প্রার্থী এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলামের সমর্থনে নিজ প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।
ঢাকা-১৫ আসনে প্রচারণার এই উত্তাপ কেবল রাজধানীতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আগামীকাল ২৩ ও ২৪ জানুয়ারি ডা. শফিকুর রহমান দুই দিনের বিশেষ নির্বাচনী সফরে উত্তরবঙ্গ যাবেন। এই সফরের শুরু হবে পঞ্চগড় জেলা থেকে। সেখান থেকে দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও হয়ে রংপুরে বিশাল জনসভায় ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে তার। ২৪ জানুয়ারি তিনি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের কিংবদন্তি শহীদ আবু সাঈদের কবরে শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে দ্বিতীয় দিনের প্রচারণা শুরু করবেন।
তফসিল অনুযায়ী, ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই প্রচারণা চলবে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে বহুল প্রতীক্ষিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং একই সঙ্গে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের ওপর গণভোট। নির্বাচন কমিশন কঠোরভাবে আচরণবিধি অনুসরণের নির্দেশ দিলেও প্রচারণার প্রথম দিনেই রাজধানীসহ দেশের প্রধান শহরগুলো পোস্টার, ব্যানার এবং মিছিলে ছেয়ে গেছে।
সমাবেশে আসা সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে ছিল উৎসবের আমেজ। মিরপুরের স্থানীয় বাসিন্দা ও জামায়াত সমর্থকরা জানান, তারা একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে যোগ্য নেতৃত্ব বেছে নিতে চান। তবে বড় দলগুলোর প্রচারণা ও একই দিনে গণভোটের আয়োজনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখা প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ঢাকা-১৫ আসনে জামায়াতে ইসলামীর এই বিশাল সমাবেশ মূলত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের রাজনীতির মেরুকরণ স্পষ্ট করে দিয়েছে। একদিকে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত সাংগঠনিক শক্তি, অন্যদিকে জুলাই আন্দোলনের তরুণ তুর্কিদের সমর্থন—এই দুইয়ের মেলবন্ধন ভোটের মাঠে কতটুকু প্রভাব ফেলে, তা দেখার জন্য ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে দেশবাসীকে। তবে প্রচারণার প্রথম দিনেই মিরপুরের এই শো-ডাউন যে প্রতিপক্ষ দলগুলোর ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করেছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন