পঞ্চগড়ের ঐতিহাসিক চিনিকল মাঠ আজ রূপ নিয়েছিল জনসমুদ্রে। ১০ দলীয় জোটের নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান দেশের চলমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও উত্তরবঙ্গের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা নিয়ে এক আবেগঘন এবং দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদান করেন।
বঞ্চনার ইতিহাস টেনে তিনি ঘোষণা করেন, আগামী দিনে উন্নয়নের ধারা শুরু হবে ‘তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ’ পর্যন্ত।
বক্তব্যের শুরুতেই ডা. শফিকুর রহমান জনগণের সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করেন। বর্তমান সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ‘কার্ড’ বা বিশেষ সুবিধার রাজনীতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, ভাই, আমাদের কাছে দেওয়ার মতো কোনো কার্ড নেই। আপনারা সবাই ভাইবোনেরা আমাদের কার্ড। আপনাদের বুকে আমরা একটা ভালোবাসার কার্ড চাই। আপনাদের সমর্থন, দোয়া ও ভালোবাসা দিয়ে আগামী দিনে বেকার এবং দায় দয়ামুক্ত একটা বাংলাদেশ আমরা গড়তে চাই।
তিনি সাফ জানিয়ে দেন, জামায়াত ও তার জোট মানুষকে কারো ‘দয়ার পাত্র’ হিসেবে দেখতে চায় না, বরং নাগরিকদের মর্যাদা নিশ্চিত করতে চায়।
জামায়াতের আমির তার বক্তব্যে উত্তরবঙ্গের প্রতি বিমাতা সুলভ আচরণের তীব্র নিন্দা জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সৃষ্টির পর থেকে উত্তরবঙ্গকে ইচ্ছা করে গরিব করে রাখা হয়েছে। আমি সেই বঞ্চনার সাক্ষী হতে এসেছি। এ উর্বর মাটি বাংলাদেশকে খাদ্য ও পুষ্টি যোগায়, অথচ সেই অঞ্চলের মানুষই অবহেলিত। উত্তরবঙ্গ আমাদের কলিজার অংশ, একে আর পেছনে পড়ে থাকতে দেওয়া হবে না।
তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, ১০ দলীয় জোট ক্ষমতায় আসলে উত্তরবঙ্গকে ‘কৃষিভিত্তিক শিল্পের রাজধানী’ হিসেবে গড়ে তোলা হবে। বন্ধ হয়ে যাওয়া চিনিকলগুলো পুনরায় চালু করে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার ঘোষণা দেন তিনি।
এতকাল বাংলাদেশের উন্নয়নের স্লোগান ছিল ‘টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া’। ডা. শফিকুর রহমান এ ধারণাকে পাল্টে দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে বলেন, উন্নয়নের জোয়ার টেকনাফ থেকে শুরু হয়ে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। আমরা এটা উল্টাইয়া দেব। এখন থেকে উন্নয়ন শুরু হবে তেঁতুলিয়া থেকে, যা টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। আমরা ভারসাম্যের উন্নয়ন চাই।
উত্তরবঙ্গের নদীগুলোর বর্তমান মরণদশা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে আমির বলেন, শরীরের রক্তনালি বন্ধ হয়ে গেলে মানুষ যেমন মারা যায়, তেমনি আমাদের নদীগুলোকেও খুন করা হয়েছে। এ নদীগুলো আমাদের প্রাণ। ১০ দলীয় জোট সরকার গঠন করলে শুধু নদীর জীবনই ফিরে আসবে না, মানুষের জীবনেও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসবে।
স্বাস্থ্যসেবা ও উন্নয়নের জন্য বিপুল অর্থের জোগান নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রশ্নের উত্তরে তিনি সরাসরি দুর্নীতির দিকে আঙুল তোলেন। তিনি বলেন, অনেকে বলেন এত টাকা কোথায় পাবেন? আমি বলি, যারা দেশ থেকে ২৮ লাখ কোটি টাকা চুরি করে বিদেশে নিয়ে গেছে, প্রয়োজনে তাদের পেটের ভেতর হাত ঢুকিয়ে সেই টাকা বের করে আনা হবে। আগামী দিনে কাউকে আর এক পয়সা চুরি করতে দেওয়া হবে না।
তিনি ঘোষণা করেন, জোট ক্ষমতায় আসলে দেশের ৬৪ জেলার প্রতিটি জেলায় একটি করে মানসম্মত মেডিকেল কলেজ স্থাপন করা হবে, যাতে সাধারণ মানুষকে চিকিৎসার জন্য রাজধানীমুখী হয়ে রাস্তায় প্রাণ হারাতে না হয়। বিশেষ করে পঞ্চগড়ে একটি আধুনিক মেডিকেল কলেজ করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে ডা. শফিকুর রহমান পঞ্চগড়-১ ও ২ আসনের জোট প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন এবং তাদের হাতে প্রতীক তুলে দেন। পঞ্চগড়-১ আসন, জোটের সমন্বয়ক ও আলোচিত ছাত্রনেতা সারজিস আলমের হাতে ‘শাপলা কলি’ প্রতীক তুলে দেওয়া হয়। পঞ্চগড়-২ আসন, প্রার্থী সফিউল আলমের হাতে ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীক তুলে দেন আমির। প্রার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, এরা আপনাদের সেবক হতে এসেছে, শাসক হতে নয়। তিনি ভোটারদের আহ্বান জানান যেন তারা যোগ্য ও সৎ মানুষকে পার্লামেন্টে পাঠিয়ে একটি ইনসাফ কায়েমের সরকার গঠনে সহায়তা করেন।
ডা. শফিকুর রহমান তার ১২ মিনিটের সংক্ষিপ্ত কিন্তু অর্থবহ বক্তব্যে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে উত্তরবঙ্গের চেহারা বদলে দেওয়ার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। তিনি বলেন, এখানকার মানুষ পরিশ্রমী, মাটি উর্বর। আমাদের শুধু দরকার একনিষ্ঠ নেতৃত্ব। আপনারা পাশে থাকলে এ অবহেলিত জনপদই হবে আগামীর বাংলাদেশের মডেল।
জুমার নামাজের পর শুরু হওয়া এ জনসভাটি সুশৃঙ্খলভাবে শেষ হয়। জনসভাকে কেন্দ্র করে পুরো পঞ্চগড় শহরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছিল এবং সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা গেছে।
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন