নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যকার আদর্শিক ও কৌশলগত দূরত্ব এখন প্রকাশ্য বাদানুবাদে রূপ নিয়েছে।
গত মঙ্গলবার ময়মনসিংহে তারেক রহমান কর্তৃক উত্থাপিত প্রশ্নের জবাবে আজ বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী সাইফুল আলম খানের জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান অত্যন্ত কঠোর ও যুক্তিপূর্ণ পাল্টা জবাব দেন।
তিনি দাবি করেন, জামায়াতের সাবেক দুই শীর্ষ নেতা মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ তাদের অধীনে থাকা মন্ত্রণালয়গুলোতে দুর্নীতির ছিটেফোঁটাও লাগতে দেননি বলেই সে সময় মন্ত্রিত্ব ছাড়ার প্রয়োজন মনে করেননি।
তারেক রহমান প্রশ্ন তুলেছিলেন, বিএনপি যদি দুর্নীতিবাজই হতো, তবে জামায়াত নেতারা কেন পাঁচ বছর সরকারে ছিলেন? এর জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, দু-একজন নেতা এখন বলছেন, ঠিক আছে আমরা এত অসৎ ছিলাম, আপনারা এত সৎ ছিলেন তো ছেড়ে গেলেন না কেন? আমরা ছেড়ে যাইনি এ কারণে অন্তত তিনটি মন্ত্রণালয় বেঁচে যাক। দুর্নীতির হাত থেকে রক্ষা পাক। তিনি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, ওই তিন মন্ত্রণালয়ে জামায়াত নেতাদের দায়িত্ব পালনকালে কেউ একটি টাকার দুর্নীতির প্রমাণও দিতে পারেনি।

কারওয়ান বাজারের মতো ব্যস্ততম পাইকারি বাজারে দাঁড়িয়ে শফিকুর রহমান দেশের অর্থনীতিকে কুরে খাওয়া ‘চাঁদাবাজি’ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “আমি রাজনীতিও করব, আবার চাঁদাবাজিও করব—কিন্তু আমাকে চাঁদাবাজ বলা যাবে না, এটা কোনো কথা হতে পারে না।
তিনি স্পষ্ট করেন যে, কৃষক, পরিবহন মালিক এবং সাধারণ ব্যবসায়ীরা আজ ‘বাজপাখির মতো কালো চেহারা’র চাঁদাবাজদের কবলে পিষ্ট।শফিকুর রহমান ঘোষণা করেন, ১১ দলীয় জোট ক্ষমতায় গেলে ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকেই দেশের চিত্র বদলে যাবে।
তিনি বলেন, “ক্ষমতায় গেলে ৯০ শতাংশ চাঁদাবাজের হাত অবশ হয়ে যাবে। বাকি ১০ শতাংশকে অনুরোধ করা হবে, তাতে কাজ না হলে তাদের বিরুদ্ধে নির্দয়, নিষ্ঠুর ও কঠোর আচরণ করা হবে। তখন দেখা হবে না কে কার বাবা, ভাই বা সন্তান।
শেরপুরের হত্যাকাণ্ড এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্বাচনী কার্যালয় পোড়ানো ও মা-বোনদের ওপর হামলার কথা উল্লেখ করে জামায়াতের আমির বলেন, নির্বাচনের আলামত ভালো দেখা যাচ্ছে না। গায়ে পড়ে ঝগড়া বাঁধানোর চেষ্টা চলছে।
তিনি নির্বাচন কমিশন ও সরকারকে হুঁশিয়ার করে বলেন, উপযুক্ত পদক্ষেপ নিয়ে জনগণের আস্থা অর্জন করতে না পারলে এর দায়ভার প্রশাসনকেই নিতে হবে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ছাত্র-জনতা রাজপথে ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ স্লোগান দিয়েছিল কোনো বিশেষ দল বা ব্যক্তিকে ক্ষমতায় বসাতে নয়, বরং সমাজে সাম্য ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য। দখলবাজি, মামলাবাজি আর দুর্নীতিবাজদের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করাই ছিল সেই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য।
জনসভায় শফিকুর রহমান ঢাকা-১২ আসনের প্রার্থী সাইফুল আলম খানের হাতে ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীক তুলে দেন এবং আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি প্রতিপক্ষের উদ্দেশ্যে বলেন, মুখে গণতন্ত্রের বুলি না আউড়ে কাজে তার প্রমাণ দিতে এবং অন্যকে সম্মান করতে শিখতে হবে।
জনসভায় আরও বক্তব্য রাখেন ১১ দলীয় ঐক্যের নেতা রাশেদ প্রধান, ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি সিবগাতুল্লাহ এবং ডাকসু ভিপি আবু সাদিকসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। তারা সবাই একটি দুর্নীতিমুক্ত ও বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
বিএনপি ও জামায়াতের এই সাম্প্রতিক বাক্যযুদ্ধ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, দীর্ঘদিনের নির্বাচনী জোট এখন এক চরম আস্থার সংকটে ভুগছে। তারেক রহমানের আক্রমণের পর শফিকুর রহমানের এই আত্মপক্ষ সমর্থনমূলক এবং পাল্টা আক্রমণাত্মক বক্তব্য ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক মেরুকরণে নতুন মাত্রা যোগ করল। বিশেষ করে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি ইস্যুতে জামায়াতের কঠোর অবস্থান ভোটারদের মনে কতটুকু প্রভাব ফেলে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন