জামায়াত আমির

মেজরিটি-মাইনরিটি বলে কিছু থাকবে না, দেশ সবার

নওগাঁ প্রতিনিধি প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৫, ২০২৬, ১২:৫৯ পিএম
মেজরিটি-মাইনরিটি বলে কিছু থাকবে না, দেশ সবার
ছবি: সংগৃহীত

তৈরি হচ্ছে এক নতুন বাংলাদেশ, যেখানে ধর্মীয় পরিচিতি নয়, বরং ‘নাগরিক’ পরিচয়ই হবে শ্রেষ্ঠ। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, আগামী দিনে বাংলাদেশে কোনো ‘সংখ্যাগুরু’ (মেজরিটি) বা ‘সংখ্যালঘু’ (মাইনরিটি) বিভাজন মানা হবে না। দেশটা হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, সাঁওতাল এবং মুসলিম—প্রত্যেকটি মানুষের সমান অধিকারের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে।

বৃহস্পতিবার নওগাঁর এটিএম মাঠে আয়োজিত এক বিশাল নির্বাচনী জনসভায় এ অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির ডাক দিয়েছেন। 

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে নওগাঁর এই জনসভাটি জামায়াতের শক্তির এক বড় মহড়া হিসেবেই দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

জনসভায় দেওয়া বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিভাজনের সংস্কৃতিতে আঘাত করেন। তিনি বলেন, আমরা ঘোষণা দিয়েছি, এই দেশে মেজরিটি-মাইনরিটি বলে কোনো শব্দ আমরা রাখব না। যারা এই দেশের মাটিতে জন্মেছে, তারা সকলেই এ দেশের মালিক। কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা গোষ্ঠীর ওপর ভিত্তি করে নাগরিকের অধিকার নির্ধারিত হবে না।

তিনি আশ্বাস দেন যে, জামায়াত যদি দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পায়, তবে প্রতিটি নাগরিকের জানমাল ও ধর্মীয় স্বাধীনতার নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেবে রাষ্ট্র। বিশেষ করে নারী অধিকার ও নিরাপত্তার প্রশ্নে তিনি বলেন, কোনো জালিম যেন আমাদের মা-বোনদের দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস না পায়—এমন এক সুরক্ষিত পরিবেশ আমরা তৈরি করব।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে জামায়াত আমিরের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক আদর্শ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও বিরোধী মহলে কঠোর সমালোচনা চলছে। সেই সমালোচনার প্রতি ইঙ্গিত করে ডা. শফিকুর রহমান কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন, গত পাঁচ দিন ধরে আমার ওপর ধারাবাহিকভাবে ‘মিথ্যার মিসাইল’ নিক্ষেপ করা হচ্ছে। দুর্ভাগ্যবশত, আমার কিছু পুরোনো বন্ধুও এই অপপ্রচারে শরিক হয়েছেন। আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, আমি তাদের ক্ষমা করে দিয়েছি। আল্লাহও যেন তাদের ক্ষমা করেন। আমি এই সব অপপ্রচারের জবাব দিইনি এবং দেবোও না।

তার এই মন্তব্যকে বিশ্লেষকরা ‘সহনশীল রাজনীতির’ বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন, যার মাধ্যমে তিনি কাদা ছোড়াছুড়ির ঊর্ধ্বে গিয়ে নিজেকে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে জামায়াত আমির তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষাকে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জুলাইয়ের রাজপথে নামা তরুণ-তরুণীরা রাষ্ট্র থেকে করুণা হিসেবে ‘বেকার ভাতা’ চায়নি, তারা চেয়েছে মেধার মূল্যায়ন এবং সম্মানজনক কাজ।

তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে দেশের যুবসমাজকে আধুনিক শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বৈশ্বিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টিই হবে তাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি।

বাংলাদেশের প্রচলিত ‘বংশপরম্পরার রাজনীতি’ বা উত্তরাধিকার প্রথার কঠোর সমালোচনা করেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি ঘোষণা দেন, আগামী বাংলাদেশে রাজনীতির মাঠ কোনো বিশেষ পরিবারের ‘জমিদারি’ থাকবে না।

তিনি বলেন, আমরা এমন এক বাংলাদেশ গড়ব যেখানে যোগ্যতা ও দেশপ্রেমই হবে বড় পরিচয়। আমি দোয়া করি, যেন এই দেশের একজন সাধারণ রিকশাচালকের মেধাবী সন্তানও তার মেধার জোরে আগামীতে এ দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারে এবং তা বাস্তবায়ন করতে পারে।

অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রশ্নে জামায়াত আমির বলেন, গত দেড় দশকে দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে। তিনি অঙ্গীকার করেন, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে একটি পয়সাও দেশের বাইরে থাকতে দেবে না। পাচারকৃত অর্থ ফেরত এনে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা করা হবে এবং তা জনকল্যাণে ব্যয় করা হবে। এছাড়া দেশের হাট-বাজার, রাস্তাঘাট বা ব্যবসা-বাণিজ্যে কোনো ধরনের চাঁদাবাজি বা দখলদারিত্ব সহ্য করা হবে না বলেও তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি দেন।

নওগাঁর এই জনসভা থেকে ডা. শফিকুর রহমান যে বার্তা দিয়েছেন, তা জামায়াতের প্রথাগত ভাবমূর্তির চেয়ে কিছুটা আলাদা এবং উদারপন্থী। ‘মেজরিটি-মাইনরিটি’ ধারণা অস্বীকার করা এবং সকল ধর্মের মানুষের সমান মালিকানার দাবি বর্তমান পরিবর্তিত বাংলাদেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করতে পারে। তার এই ‘ক্ষমাশীল’ এবং ‘মেধাভিত্তিক’ রাজনীতির আহ্বান সাধারণ ভোটারদের মধ্যে কতটা প্রভাব ফেলে, তা দেখার জন্য ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

এএন