ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও বৈচিত্র্যের এক নতুন অধ্যায় সূচিত হয়েছে। এবারের নির্বাচনে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে চারজন প্রার্থী বিজয়ী হয়ে জাতীয় সংসদে নিজেদের আসন নিশ্চিত করেছেন।
চমকপ্রদ তথ্য হলো, এই চার বিজয়ীর সবাই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মনোনীত প্রার্থী। এর মধ্যে একই পরিবারের দুই নিকটাত্মীয় বা ‘বেয়াই’ রয়েছেন, যারা ভিন্ন ভিন্ন আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে বিজয়ী হয়েছেন।
বৃহস্পতিবার সারাদেশে ২৯৯টি আসনে ভোট গ্রহণ ও জুলাই চার্টার নিয়ে গণভোট সম্পন্ন হয়েছে। এখন পর্যন্ত ২৭০টি আসনের বেসরকারি ফলাফল পাওয়া গেছে, যার ভিত্তিতে সংখ্যালঘু প্রতিনিধিদের এই জয়ের চিত্র উঠে এসেছে।
এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত দুই বিজয়ী হলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এবং ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরী। সম্পর্কে তারা একে অপরের বেয়াই।
ঢাকার কেরানীগঞ্জের ভূমিপুত্র গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ঢাকা-৩ আসন থেকে বড় জয় পেয়েছেন। তিনি মোট ৯৮,৭৮৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. শাহীনুর ইসলাম, যিনি পেয়েছেন ৮২,২৩২ ভোট।
মাগুরা-২ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে লড়েছেন নিতাই রায় চৌধুরী। তিনি ১,৪৭,৮৯৬ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের মো. মুশতারশেদ বিল্লাহ পেয়েছেন ১,১৭,০১৮ ভোট।
পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলেও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থীরা জনগণের বিপুল সমর্থন পেয়েছেন। পাহাড়ি এলাকা থেকে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী বান্দরবান জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সাচিং প্রু ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ১,৪১,৪৫৫ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী আবু সাঈদ মো. সূজা উদ্দীনকে বিশাল ব্যবধানে পরাজিত করেছেন।
রাঙামাটি আসনে ২,০১,৫৪৪ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন দীপেন দেওয়ান। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী পহেল চাকমা (ফুটবল প্রতীক), যিনি পেয়েছেন মাত্র ৩১,২২২ ভোট।
বিএনপি এবার ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে মোট ৬ জনকে মনোনয়ন দিয়েছিল। তাদের মধ্যে চারজন জয়ী হলেও বাগেরহাট-১ আসনের কপিল কৃষ্ণ মণ্ডল এবং বাগেরহাট-৪ আসনের সোমনাথ দে পরাজিত হয়েছেন।
অন্যদিকে, এবারের নির্বাচনে কিছু ব্যতিক্রমী মনোনয়ন দেখা গেছে। জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি প্রথমবারের মতো সংখ্যালঘু প্রার্থী দিলেও তারা জয়ের দেখা পাননি:
কৃষ্ণ নন্দী (খুলনা-১): জামায়াতে ইসলামীর একমাত্র হিন্দু প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে তিনি পরাজিত হয়েছেন।
প্রীতম দাশ (মৌলভীবাজার-৪): এনসিপির এই সংখ্যালঘু প্রার্থীও ভোটারদের মন জয়ে ব্যর্থ হয়েছেন।
এবারের নির্বাচনে মোট ৭৯ জন সংখ্যালঘু প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। যার মধ্যে ২২টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল থেকে ৬৭ জন এবং স্বতন্ত্র হিসেবে ১২ জন প্রার্থী ছিলেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির এই বিজয় প্রমাণ করে যে দলটি সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা তৈরির চেষ্টা করছে। বিশেষ করে ঢাকা ও মাগুরার মতো গুরুত্বপূর্ণ আসনে প্রবীণ সংখ্যালঘু নেতাদের জয় তৃণমূল পর্যায়ে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির বার্তা দেয়। তবে সংসদীয় গণতন্ত্রে সংখ্যালঘুদের আরও বেশি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সংরক্ষিত আসনের বাইরে সরাসরি নির্বাচনে মনোনয়নের সংখ্যা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন তারা।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন