দীর্ঘ ১৮ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন শাসনের আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ঘটছে আজ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পর আজ বিকেলে শপথ নিতে যাচ্ছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন মন্ত্রিসভা।
মঙ্গলবার দুপুর গড়াতেই সচিবালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে সম্ভাব্য মন্ত্রীদের ফোনে আমন্ত্রণ জানানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এবারের মন্ত্রিসভায় অভিজ্ঞ প্রবীণ রাজনীতিকদের পাশাপাশি রাজপথের লড়াকু তরুণ মুখ এবং বিশেষজ্ঞদের এক অনন্য সমন্বয় দেখা যাচ্ছে।
সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে মন্ত্রিসভায় স্থান পাচ্ছেন গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর এবং সাবেক তারকা ফুটবলার আমিনুল হক। এ ছাড়াও বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের শীর্ষ নেতারা পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নতুন মন্ত্রিসভার প্রাথমিক আকার হতে পারে ৫০ সদস্যের। এর মধ্যে ২৫ জন পূর্ণমন্ত্রী এবং ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া গেছে। বিকেল ৪টায় জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন নতুন সরকারকে শপথ বাক্য পাঠ করাবেন।
নতুন মন্ত্রীদের জন্য সচিবালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ব্যাপক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। তাঁদের আনা নেওয়ার জন্য ইতোমধ্যে ৪৯টি সরকারি গাড়ি প্রস্তুত রাখা হয়েছে। দুপুর ১টার পর থেকেই আমন্ত্রিত নেতাদের বাসভবনে এই গাড়িগুলো পৌঁছাতে শুরু করেছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং দলের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতারাই মূলত মন্ত্রিসভার মেরুদণ্ড হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছেন। আজ দুপুর পর্যন্ত যাঁরা পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে ফোন পেয়েছেন তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দলের মহাসচিব এবং অভিজ্ঞ এই রাজনীতিক মন্ত্রিসভার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাচ্ছেন।
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত এবং অর্থনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে খ্যাত এই নেতা পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে ডাক পেয়েছেন। সালাহউদ্দিন আহমেদ, দীর্ঘদিন নির্বাসিত জীবন শেষে দেশে ফিরে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া এই নেতাও পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিচ্ছেন। ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ও হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, দলের প্রবীণ এই দুই নেতাও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে ডাক পেয়েছেন। আব্দুল আউয়াল মিন্টু ও এ জে এম জাহিদ হোসেন, ব্যবসায়ী ব্যক্তিত্ব মিন্টু এবং চিকিৎসক নেতা জাহিদ হোসেনও মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হতে যাচ্ছেন।
খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর ও আরিফুল হক চৌধুরী, সিলেট থেকে নির্বাচিত এই দুই হেভিওয়েট নেতা পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে ডাক পেয়ে ইতিহাস গড়ছেন। জহির উদ্দিন স্বপন ও মিজানুর রহমান মিনু, বরিশাল ও রাজশাহীর এই দুই প্রভাবশালী নেতাও পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিচ্ছেন। আফরোজা খানম রিতা ও মো. আসাদুজ্জামান, নারী নেতৃত্বের প্রতিনিধি রিতা এবং প্রবীণ নেতা আসাদুজ্জামানও পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে ডাক পেয়েছেন। খলিলুর রহমান, অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানকে তাঁর দক্ষতার ধারাবাহিকতায় টেকনোক্র্যাট কোটায় পূর্ণমন্ত্রী করা হচ্ছে।
এবারের মন্ত্রিসভার সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো রাজপথের তরুণ নেতৃত্বের মূল্যায়ন। নুরুল হক নুর, পটুয়াখালী-৩ আসন থেকে নির্বাচিত গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুর প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছেন। ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে আসা এই নেতার অন্তর্ভুক্তিকে তারুণ্যের বড় জয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। মো. আমিনুল হক, সাবেক জাতীয় ফুটবলার আমিনুল হক ঢাকা-১৬ আসনে পরাজিত হলেও তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা ও জনপ্রিয়তাকে মূল্যায়ন করে টেকনোক্র্যাট কোটায় প্রতিমন্ত্রী করা হচ্ছে।
এহছানুল হক মিলন, সাবেক এই জনপ্রিয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী আবারও সরকারে ফিরছেন। চাঁদপুর-১ আসন থেকে বিজয়ী মিলন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার ফোন পেয়েছেন। নতুন মন্ত্রিসভার প্রতিমন্ত্রীদের তালিকায় আঞ্চলিক ভারসাম্য ও নতুন মুখকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, জামালপুর থেকে বিজয়ী মিল্লাত প্রতিমন্ত্রী হিসেবে ডাক পেয়েছেন। ফরহাদ হোসেন আজাদ, দলের পল্লী উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক আজাদ এবারই প্রথম মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেন। জাকারিয়া তাহের সুমন, কুমিল্লার এই নেতাও প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার ফোন পেয়েছেন। মীর শাহে আলম, বগুড়া জেলা বিএনপির এই হেভিওয়েট নেতা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিচ্ছেন।
শরীফুল আলম, কিশোরগঞ্জ থেকে নবনির্বাচিত এই নেতাকেও প্রতিমন্ত্রী হিসেবে ডাক দেওয়া হয়েছে। হাজি আমিনুর রশীদ ইয়াছিন, কুমিল্লার এই প্রভাবশালী নেতা টেকনোক্র্যাট প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন। বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণকে ভাগ করে নিতে দক্ষিণ এশিয়া ও বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর প্রতিনিধিরা ঢাকায় পৌঁছেছেন। ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং টোবগে এবং ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা বিশেষ বিমানে আজই ঢাকায় অবতরণ করছেন। সকালে মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জু ইতোমধ্যে পৌঁছেছেন।
যুক্তরাজ্য, তুরস্ক, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার প্রতিনিধিরা গতরাত থেকেই ঢাকায় অবস্থান করছেন। যুক্তরাজ্যের ভারত প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি সীমা মালহোত্রা এবং পাকিস্তানের পরিকল্পনা মন্ত্রী আহসান ইকবালের উপস্থিতি এই আয়োজনকে আন্তর্জাতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ করেছে। আজ সকালে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথের পর বিএনপির পক্ষ থেকে এক যুগান্তকারী ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তারেক রহমানের নির্দেশে বিএনপির কোনো সংসদ সদস্য এবার সরকারি শুল্কমুক্ত গাড়ি বা কোনো আবাসন প্লট গ্রহণ করবেন না। রাষ্ট্র সংস্কারের অংশ হিসেবে বিলাসিতা পরিহার করে জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করার যে অঙ্গীকার তাঁরা করেছেন, এটি তারই প্রমাণ।
বিকেল ৪টায় দক্ষিণ প্লাজার খোলা আকাশের নিচে নতুন সরকার যখন শপথ নেবে, তখন তা হবে এক নতুন বাংলাদেশের সূচনা। গত দেড় দশকের প্রশাসনিক স্থবিরতা কাটিয়ে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং সাধারণ মানুষের উচ্চাশা পূরণ করাই হবে এই মন্ত্রিসভার প্রধান চ্যালেঞ্জ। প্রবীণদের অভিজ্ঞতা আর নবীনদের উদ্যম, এই দুইয়ের মিশেলে বাংলাদেশ কোন উচ্চতায় পৌঁছায় সেটিই এখন দেখার বিষয়।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন