ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আজ এক ঐতিহাসিক ও নজিরবিহীন দৃশ্যের অবতারণা হলো। যে রাজনৈতিক দলটি দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে শহীদ মিনারে ফুল দেওয়াকে তাদের আদর্শিক অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক মনে করে এড়িয়ে চলেছে, সেই জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃত্ব আজ ২১ ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করলেন। নবনির্বাচিত বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বইছে আলোচনার ঝড়।
শনিবার প্রথম প্রহরে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদনের পরপরই বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের একটি বড় বহর নিয়ে শহীদ বেদিতে উপস্থিত হন ডা. শফিকুর রহমান। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি তাঁর এই উপস্থিতির কারণ হিসেবে ‘রাষ্ট্রীয় আচার’ বা ‘স্টেট প্রটোকল’-কে সামনে আনেন।
দীর্ঘদিন কেন আসেননি বা জামায়াতের আগের অবস্থানের পরিবর্তন হলো কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি সরাসরি বলেন, "এবার আমি এসেছি রাষ্ট্রীয় আচার হিসেবে। বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে এটি আমার দায়িত্ব। আমার সঙ্গীদের নিয়ে আমাকে আসতে হবে, তাই আমি এসেছি।"
তাঁর এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু অর্থবহ উত্তর ইঙ্গিত দেয় যে, সংসদের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনকেই তিনি অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। তবে জামায়াত কি এখনো ফুল দেওয়াকে ‘নাজায়েজ’ মনে করে—এমন তীক্ষ্ণ প্রশ্নের মুখে তিনি বিরক্তি প্রকাশ করে পাল্টা প্রশ্ন করেন, "এ ধরনের প্রশ্ন আপনি কেন আজকে করছেন?" এরপর তিনি আর কোনো মন্তব্য না করে স্থান ত্যাগ করেন।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল জামায়াতে ইসলামীকে দেশের রাজনীতির মূল ধারায় এক শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে এসেছে।

আসন সংখ্যা জামায়াত এককভাবে ৬৮টি আসনে জয়লাভ করেছে। জোটগত শক্তি তাদের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের মোট আসন সংখ্যা ৭৭টি। মর্যাদা এই বিপুল জনম্যান্ডেট নিয়ে জামায়াত এখন সংসদের প্রধান বিরোধী দল।
বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে ডা. শফিকুর রহমানের জন্য শহীদ মিনারে যাওয়া কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং আন্তর্জাতিক ও দেশীয় পরিমণ্ডলে দলের একটি ‘মডারেট’ বা উদার ভাবমূর্তি তুলে ধরার চেষ্টা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
ফুল দেওয়ার পর প্রথাগত নিরবতা পালনের পাশাপাশি তারা শহীদ মিনারের বেদিতে দাঁড়িয়ে ভাষাশহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় হাত তুলে দোয়া ও মোনাজাত করেন। এই মোনাজাতের বিষয়টিও ছিল চোখে পড়ার মতো, যা জামায়াতের ধর্মীয় আদর্শের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় আচারের এক ধরনের সংমিশ্রণ হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে।
শফিকুর রহমান কেবল বায়ান্নর ভাষাশহীদদের মধ্যেই তাঁর শ্রদ্ধা সীমাবদ্ধ রাখেননি। সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি ইতিহাসের একটি দীর্ঘ পথপরিক্রমা তুলে ধরেন।
জামায়াত আমিরের শহীদ মিনারে যাওয়ার খবরটি চাউর হওয়ার সাথে সাথেই ফেসবুকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। অনেকেই পুরোনো দিনের ভিডিও ক্লিপ বা জামায়াত নেতাদের আগের বক্তব্য শেয়ার করে মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, এক সময় এই দলটি শহীদ মিনারে ফুল দেওয়াকে ‘মূর্তি পূজা’ বা ‘বিজাতীয় সংস্কৃতি’ হিসেবে অভিহিত করত।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত এখন একটি ‘ট্রানজিশনাল পিরিয়ড’ বা রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদার হওয়ার সম্ভাবনা বা সংসদের প্রধান বিরোধী দল হওয়ার কারণে তারা আর প্রান্তিক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে থাকতে চাইছে না। রাষ্ট্রীয় প্রটোকল মেনে চলা তাদের জন্য এখন রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতাও বটে।
উল্লেখ্য যে, জামায়াতে ইসলামী দলগতভাবে এখনো শহীদ মিনারে ফুল দেওয়ার কোনো কেন্দ্রীয় কর্মসূচি ঘোষণা করেনি। দলের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজেও স্পষ্ট করা হয়েছে যে, ডা. শফিকুর রহমানের এই সফর মূলত 'বিরোধীদলীয় নেতা' হিসেবে তাঁর রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অংশ। দলটির কট্টর সমর্থক ও নতুন প্রজন্মের ভোটারদের মধ্যে যেন কোনো আদর্শিক বিভ্রান্তি না তৈরি হয়, সেজন্যই ‘রাষ্ট্রীয় আচার’ শব্দবন্ধটি বারবার ব্যবহার করা হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
২১ ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারের এই দৃশ্যটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। জামায়াতের মতো একটি ক্যাডারভিত্তিক আদর্শিক দলের সর্বোচ্চ নেতার শহীদ বেদিতে আসা কি নিছকই ‘রাষ্ট্রাচার’, নাকি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে আসার একটি কৌশলগত সূচনা তা সময়ই বলে দেবে। তবে ২০২৬ সালের এই ২১ ফেব্রুয়ারি যে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিশেষ অধ্যায় হিসেবে যুক্ত হলো, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন