রাষ্ট্রের শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও বেশি ‘জনবান্ধব’ ও ‘কার্যকর’ হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, জনগণের আস্থা অর্জনই হলো যে কোনো বাহিনীর সফলতার মূল মাপকাঠি।
বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর এক অভিজাত মিলনায়তনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। সভায় ঢাকা-১৪ এবং ঢাকা-১৬ নির্বাচনী এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক অপরাধ দমনে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
ডা. শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে একটি ন্যায়ভিত্তিক ও ইনসাফ কায়েম করা সমাজের স্বপ্ন তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কেবল অপরাধ দমনের যন্ত্র নয়, বরং তারা জনগণের সেবক। একটি গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্রে পুলিশ বা অন্যান্য বাহিনীর প্রতি সাধারণ মানুষের ভয় নয়, বরং ভরসার সম্পর্ক থাকা জরুরি।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘জনগণের জানমাল রক্ষা করা পবিত্র দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে যদি সততা ও পেশাদারিত্ব বজায় থাকে, তবেই সমাজ থেকে অন্যায় ও জুলুম বিদায় নেবে। আমরা এমন একটি পরিবেশ চাই যেখানে গভীর রাতেও একজন নাগরিক নিজেকে নিরাপদ বোধ করবেন।’
বিরোধীদলীয় নেতা কেবল বাহিনীর সংস্কার নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক ঐক্যের ওপরও জোর দিয়েছেন। তিনি সকল রাজনৈতিক দল এবং সামাজিক সংগঠনকে দল-মত নির্বিশেষে দেশের শান্তি, শৃঙ্খলা ও উন্নয়নের স্বার্থে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার আহ্বান জানান। তার মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জনগণের সহযোগিতা ছাড়া কেবল বাহিনী দিয়ে শতভাগ অপরাধ নির্মূল সম্ভব নয়।
সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম এবং ঢাকা-১৬ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল বাতেন। তারা নিজ নিজ এলাকার মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন।
সংসদ সদস্যরা বিশেষ করে ‘কিশোর গ্যাং’ সংস্কৃতি এবং ‘মাদক’ নির্মূলে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণের দাবি জানান। ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম বলেন, এলাকার উন্নয়ন তখনই সার্থক হবে যখন যুবসমাজ মাদকমুক্ত থাকবে। অপরাধ দমনে আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পূর্ণ সহযোগিতা করব, তবে সাধারণ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হয়, সেদিকেও নজর রাখতে হবে।’
আবদুল বাতেন তার বক্তব্যে এলাকার সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষায় নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দেন।
সভায় উপস্থিত বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করেন। তারা জানান যে, নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ইতিমধ্যে বিশেষ অভিযান ও জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি চলমান রয়েছে। কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেন যে, অপরাধী যেই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। তবে কাজগুলো আরও সুচারুভাবে সম্পন্ন করতে তারা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সাধারণ জনগণের সক্রিয় সহযোগিতা কামনা করেন।
২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে এই সভাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিরোধীদলীয় নেতার উপস্থিতিতে এই ধরনের সভা বাহিনীর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
আধুনিক যুগে কিশোর গ্যাং বা সাইবার অপরাধের মতো নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জনপ্রতিনিধি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই ‘সমন্বিত টেবিল বৈঠক’ কার্যকর সমাধান দিতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি জনমনে যে দীর্ঘদিনের আস্থার সংকট ছিল, তা দূর করতে ‘জনবান্ধব’ হওয়ার এই আহ্বান একটি ইতিবাচক বার্তা হিসেবে কাজ করবে।
ডা. শফিকুর রহমানের এই আহ্বান কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং এটি একটি আধুনিক ও নিরাপদ রাষ্ট্র গড়ার রূপরেখা। যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সত্যিই জনগণের অকৃত্রিম বন্ধু হয়ে উঠতে পারে, তবেই বাংলাদেশে প্রকৃত শান্তি ও উন্নয়ন স্থায়ী রূপ পাবে। ঢাকা-১৪ ও ঢাকা-১৬ নির্বাচনী এলাকা থেকে শুরু হওয়া এই সমন্বিত উদ্যোগ সারা দেশে মডেল হিসেবে ছড়িয়ে পড়বে এমনটাই প্রত্যাশা করছেন সাধারণ নাগরিকরা।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন