ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান, যেখানে শারীরিক ও আত্মিক পবিত্রতা উভয়ের ওপরই বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পবিত্রতা (তাহারাত) ছাড়া ইবাদত কবুল হয় না। রাসুলুল্লাহ (সা.)বলেছেন, পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২২৩)
আর পবিত্রতার মূলভিত্তি হলো অজু। নামাজসহ অধিকাংশ ইবাদতের জন্য অজু শর্তস্বরূপ নির্ধারিত। কিন্তু অনেকেই অজুর ফরজ সমূহ সঠিকভাবে জানেন না বা পালন করেন না-ফলে নামাজসহ অন্যান্য আমল নষ্ট হয়ে যায়। তাই একজন মুসলমানের জন্য অজুর ফরজ জানা ও তা সঠিকভাবে আদায় করা ফরজে আইন।
অজুর গুরুত্ব ও ফজিলত
অজু শুধু শারীরিক পরিচ্ছন্নতা নয়, এটি আত্মারও পবিত্রতা। হাদীসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.)বলেন, যে ব্যক্তি অজু করে মুখ ধোয়, তার মুখের সঙ্গে করা প্রতিটি পাপ পানির সঙ্গে ধুয়ে যায়, যে হাত ধোয়, তার হাতের পাপও দূর হয়, আর যে পা ধোয়, তার পদযাত্রার পাপও চলে যায়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৪৪)
অজু মানুষকে শুধু নামাজের উপযুক্তই করে না, বরং গুনাহ থেকে দূরে রাখে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথ সুগম করে।
অজুর ফরজসমূহ
কুরআনুল কারীমে অজুর ফরজ চারটি স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা বলেন, হে ঈমানদারগণ! তোমরা যখন নামাজে দাঁড়াবে, তখন মুখ ও হাত কনুই পর্যন্ত ধুয়ে নাও, মাথার কিছু অংশ মুছে নাও, এবং পা গোড়ালি পর্যন্ত ধুয়ে নাও। (সূরা মায়িদা: ৬)
এই আয়াতের ব্যাখ্যা অনুযায়ী অজুর চার ফরজ হলো-
১. মুখমণ্ডল ধোয়া: চুলের গোড়া থেকে থুতনির নিচ পর্যন্ত এবং এক কান থেকে অন্য কান পর্যন্ত অংশকে মুখমণ্ডল বলা হয়। পুরো মুখমণ্ডল জুড়ে পানি পৌঁছানো ফরজ। দাঁড়ির নিচের চামড়ায় পানি পৌঁছানোও ফরজ, যদি দাঁড়ি পাতলা হয়।
ফিকহি নোট: দাঁড়ি ঘন হলে দাঁড়ির ভেতরে পানি ঢোকানো সুন্নত; পাতলা হলে চামড়ায় পানি পৌঁছাতে হবে।
২. দুই হাত কনুইসহ ধোয়া: কনুই পর্যন্ত নয়, বরং কনুইসহ ধোয়া ফরজ। অনেক সময় মানুষ কনুইয়ের উপরের অংশ শুকনো রেখে দেয় এটি অজু নষ্ট করে দেয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.)একবার এক সাহাবির হাতে শুকনো অংশ দেখে বলেছিলেন, যাও, আবার অজু করো। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৪৩) অর্থাৎ অজু তখনই সম্পূর্ণ হবে, যখন দুই হাত সম্পূর্ণভাবে পানি দ্বারা ধোয়া হবে।
৩. মাথার কিছু অংশ মুছে ফেলা: পুরো মাথা না মুছে শুধু এক অংশ মুছা ফরজ। তবে রাসুলুল্লাহ (সা.) অভ্যাস ছিল পুরো মাথা, দুই কান ও ঘাড়ের পেছন অংশ পর্যন্ত মুছা।
এতে বোঝা যায়, পুরো মাথা মুছে ফেলা সুন্নত মুয়াক্কাদা। হযরত আলী (রা.) বলেন, নবী (সা.)পুরো মাথা মুছতেন, এক চুলও বাদ রাখতেন না। (আবু দাউদ, হাদিস: ১১৯)
৪. দুই পা গোড়ালি পর্যন্ত ধোয়া: পায়ের আঙুলের ফাঁক এবং গোড়ালি পর্যন্ত পানি পৌঁছানো ফরজ। অনেক সময় মানুষ তাড়াহুড়ো করে অজু করে, ফলে পায়ের ফাঁকে পানি পৌঁছায় না- এতে অজু হয় না।
রাসুলুল্লাহ (সা.)সতর্ক করে বলেছেন, হে আগুনের জন্য হুঁশিয়ার হও-যাদের গোড়ালি শুকনো থাকে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৬)
অজুর সুন্নতসমূহ সংক্ষেপে
যদিও ফরজ চারটি, তবে অজুর অনেকগুলো সুন্নত আছে, যেমন- অজুর আগে বিসমিল্লাহ বলা, হাত ধোয়া, মিসওয়াক করা, মুখে পানি নেওয়া ও নাকে পানি টানা, প্রতিটি অঙ্গ তিনবার ধোয়া, অজুর শেষে শাহাদত পাঠ ও দোয়া পড়া ইত্যাদি।
হাদীসে এসেছে, যে ব্যক্তি সুন্দরভাবে অজু করে ‘আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ...’ পাঠ করে, তার জন্য জান্নাতের সব দরজা খুলে দেওয়া হয়।
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৩৪)
অজু ভঙ্গের কারণসমূহ
অজু করার পর কিছু কারণে তা ভেঙে যায়, যেমন- পেশাব–পায়খানা নির্গত হওয়া, বাতাস নির্গত হওয়া, নিদ্রা, মাতাল অবস্থা বা অচেতনতা, বমি বা রক্তপাত ইত্যাদি।
অজু ভেঙে গেলে নামাজ, তাওয়াফ বা কুরআন স্পর্শ করা বৈধ নয়।
অজুর আত্মিক শিক্ষা
অজু শুধু একটি পরিচ্ছন্নতার কাজ নয়, এটি মুসলমানের অন্তরের পবিত্রতার প্রতীক। যখন একজন মুমিন অজু করে, তখন সে শারীরিক ময়লার সঙ্গে অন্তরের গুনাহকেও ধুয়ে ফেলতে থাকে। অজুর মাধ্যমে মানুষ নিজেকে নামাজের প্রস্তুতির পাশাপাশি আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর যোগ্য করে তোলে।
রাসুলুল্লাহ (সা.)বলেন, আমার উম্মতের কিয়ামতের দিন মুখমণ্ডল, হাত ও পা অজুর চিহ্নে উজ্জ্বল থাকবে। এ চিহ্নই হবে জান্নাতের এক বিশেষ সম্মান। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৩৬)
অজুর ফরজ জানা এবং তা সঠিকভাবে আদায় করা প্রতিটি মুসলমানের জন্য অপরিহার্য। পবিত্রতা ছাড়া নামাজ, আর নামাজ ছাড়া ঈমান পূর্ণ হয় না। তাই প্রতিদিনের জীবনে আমরা যেন অজুর ফরজগুলো জেনে, মনোযোগসহকারে তা পালন করি।
আল্লাহ তাআলা বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ পছন্দ করেন তাদের, যারা তওবা করে এবং যারা পবিত্রতা অর্জন করে। (সূরা আল-বাকারা: ২২২)
পবিত্রতার মাধ্যমে আত্মা হয় পরিশুদ্ধ, ইবাদত হয় গ্রহণযোগ্য, আর জীবন হয় আল্লাহমুখী।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন