বর্তমান যুগে মানুষ উন্নতির শিখরে পৌঁছে গেছে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও যোগাযোগের বিস্ময়কর অগ্রগতি আমাদের জীবনযাত্রাকে সহজ করেছে। কিন্তু এই অগ্রগতির মাঝেও মানবতা যেন কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে। মানুষ আজ বিভ্রান্ত, উদ্বিগ্ন ও আত্মিকভাবে শূন্য। এমন বাস্তবতায় নবী করিম হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নতের অনুসরণই হতে পারে আমাদের প্রকৃত মুক্তি ও শান্তির পথ।
সুন্নত: ‘সুন্নত’ শব্দের অর্থ হলো চলার পথ বা অনুসরণীয় রীতি। ইসলামী পরিভাষায় সুন্নত বলতে বোঝানো হয়, রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কথা, কাজ, অনুমোদন ও জীবনাচার, যা তিনি কুরআনের ব্যাখ্যা ও বাস্তব প্রয়োগ হিসেবে আমাদের সামনে উপস্থাপন করেছেন। কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। (সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ২১)
ই আয়াত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে, রাসূল (সা.) এর জীবনই হলো মুসলমানদের জন্য আদর্শ পথনির্দেশ। তাঁর প্রতিটি কাজ, প্রতিটি আচরণ মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের জন্য শিক্ষণীয় ও অনুসরণীয়।
রাসূল (সা.) কখনো নিজের মনগড়া কিছু বলেননি। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, তিনি নিজের ইচ্ছা থেকে কিছু বলেন না। এটি তো ওহি, যা তাঁর কাছে অবতীর্ণ হয়। (সূরা আন-নجم, আয়াত: ৩-৪)
অতএব, সুন্নত কুরআনের পরিপূরক নয়, বরং তারই বাস্তব প্রতিফলন। কুরআনের আদেশগুলোকে কীভাবে জীবনে প্রয়োগ করতে হবে, তার জীবন্ত ব্যাখ্যা দিয়েছেন রাসূলুল্লাহ (সা.)। যেমন নামাজ, রোজা, যাকাত বা হজ, এসব ইবাদতের বিস্তারিত পদ্ধতি কুরআনে নেই; তা এসেছে রাসূল (সা.) এর শিক্ষার মাধ্যমে।
রাসূল (সা.) এর জীবন ছিল সংযম, নম্রতা ও ভালোবাসায় পরিপূর্ণ। তিনি ছিলেন পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীল, প্রতিবেশীর প্রতি সদয়, দরিদ্রদের প্রতি দানশীল এবং শত্রুর প্রতিও সহানুভূতিশীল। তাঁর চরিত্রে ছিল ধৈর্য, সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও ক্ষমাশীলতা।
তিনি বলেছেন, তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যার চরিত্র সর্বোত্তম। (বুখারি)
আজকের সমাজে যেখানে হিংসা, প্রতারণা, অনৈতিকতা ও বিভাজন বেড়ে চলেছে, সেখানে রাসূল (সা.) এর আদর্শে ফেরার মাধ্যমেই সমাজে ন্যায় ও মানবতা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
রাসূল (সা.) আমাদের শুধু নামাজ-রোজা শেখাননি, বরং জীবনযাপনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আদর্শ স্থাপন করেছেন। সকালে ঘুম থেকে ওঠা, হাসা, কথা বলা, খাওয়া, পরিধান করা, এমনকি কিভাবে বিশ্রাম নিতে হবে, সবকিছুতেই ছিল তাঁর সুন্দর আদব ও আচরণ।
তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি আমার সুন্নতকে ভালোবাসে, সে আমাকে ভালোবাসে; আর যে আমাকে ভালোবাসে, সে জান্নাতে আমার সঙ্গী হবে।' (তিরমিজি)
এই হাদীস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, সুন্নতের অনুসরণ শুধু ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা নয়, বরং তা ভালোবাসা ও ঈমানের প্রকাশ।
যদি আমরা সমাজজীবনে রাসূল (সা.) এর শিক্ষা প্রয়োগ করতে পারি, তাহলে সমাজে থাকবে না অবিচার, বৈষম্য বা অন্যায়। তাঁর শিক্ষা ছিল পারস্পরিক সহানুভূতি, ন্যায় ও দায়িত্ববোধের ওপর ভিত্তি করে।
তিনি বলেছেন, তোমরা একে অপরের প্রতি দয়া না করলে আল্লাহ তায়ালা তোমাদের প্রতি দয়া করবেন না। এ শিক্ষাই সমাজে সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে তুলতে পারে। (বুখারি ও মুসলিম)
রাসূল (সা.) অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। তিনি সুদ, প্রতারণা ও জুলুম নিষিদ্ধ করেছিলেন এবং সততা, পরিশ্রম ও ন্যায়সঙ্গত লেনদেনকে উৎসাহিত করেছিলেন। রাজনীতি ও শাসন ব্যবস্থায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন জবাবদিহিতা ও পরামর্শভিত্তিক সিদ্ধান্তগ্রহণের নীতি (শূরা)।
আজকের বিশ্বে দুর্নীতি, বৈষম্য ও ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে মুক্তি পেতে হলে নবীজির এই নীতিই হতে পারে সর্বোত্তম সমাধান।
অনেকে মনে করেন, সুন্নত শুধু আরবের ১৪০০ বছর আগের জীবনের জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু বাস্তবে রাসূল (সা.)-এর শিক্ষা সার্বজনীন ও চিরন্তন। তাঁর জীবনদর্শন আধুনিক মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান ও নৈতিক শিক্ষার ক্ষেত্রেও অনন্য। যেমন, স্বাস্থ্যবিধি, পরিচ্ছন্নতা, খাদ্যাভ্যাস, ঘুমের রুটিন সবকিছুতেই তিনি যে নির্দেশ দিয়েছেন, তা আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানও সমর্থন করে।
যখন মুসলমানরা রাসূল (সা.) এর সুন্নত থেকে দূরে সরে যায়, তখন তাদের জীবনে আসে বিভ্রান্তি ও অশান্তি। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা সতর্ক করেছে, যে ব্যক্তি রাসূলের বিরোধিতা করে এবং সঠিক পথ ত্যাগ করে, আমি তাকে সেই পথে চালিত করব, যা সে নিজে বেছে নেবে, এবং পরিণামে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১১৫)
রাসূলুল্লাহ (সা.) এর জীবন মানবতার সর্বোত্তম উদাহরণ। তাঁর প্রতিটি কাজ, প্রতিটি নির্দেশ, প্রতিটি অভ্যাস মানবজীবনের প্রতিটি দিককে আলোকিত করতে পারে। আজকের অশান্ত পৃথিবীতে শান্তি, ন্যায় ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার একমাত্র উপায় হলো, রাসূল (সা.) এর সুন্নতের অনুসরণ।
আমরা যদি আন্তরিকভাবে তাঁর পথ অনুসরণ করতে পারি, তাহলে আমাদের ব্যক্তিজীবন হবে পরিশুদ্ধ, সমাজ হবে ন্যায়নিষ্ঠ, রাষ্ট্র হবে শান্তিপূর্ণ, আর মানবতা ফিরে পাবে তার প্রকৃত মর্যাদা। বলুন (হে মুহাম্মদ): যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমাকে অনুসরণ করো, আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গুনাহ ক্ষমা করবেন। (সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৩১)
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন