কূপের পানি: ইসলামের দৃষ্টিতে পবিত্রতা ও ব্যবহারবিধি

ধর্ম ডেস্ক প্রকাশিত: নভেম্বর ২, ২০২৫, ১০:১২ পিএম
কূপের পানি: ইসলামের দৃষ্টিতে পবিত্রতা ও ব্যবহারবিধি

ইসলাম এমন একটি জীবনব্যবস্থা, যা মানুষের প্রতিটি প্রয়োজনের জন্য নীতিমালা নির্ধারণ করেছে। 

পানির ব্যবহার, পবিত্রতা ও নাপাকতা সম্পর্কেও ইসলামী শরীয়তে স্পষ্ট বিধান রয়েছে। বিশেষত প্রাচীন যুগে কূপ (কুয়া) ছিল পানি সংগ্রহের প্রধান উৎস। তাই ইসলামি ফিকহে ‘কূপের পানির বিশুদ্ধতা ও ব্যবহারের নিয়ম’ নিয়ে বিশদ আলোচনা পাওয়া যায়। 

কূপ বা কুয়া হলো মাটির নিচ থেকে পানি আহরণের জন্য তৈরি গভীর গর্ত। প্রাচীনকাল থেকে এটি ছিল মানুষের প্রধান পানির উৎস। কূপের পানি দ্বারা ওযু, গোসল, রান্না, পান ও কৃষি—সবই পরিচালিত হতো। ইসলামে পানি পবিত্রতার প্রতীক। 

আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আমি পানি দ্বারা সবকিছু জীবিত করেছি।” (সূরা আল-আম্বিয়া: আয়াত ৩০) অতএব, কূপের পানি শুধু জৈবিক জীবন নয়, বরং আত্মিক পবিত্রতার মাধ্যমও। 

ইসলামে পানি তিন প্রকার, পবিত্র ও পবিত্রীকারী পানি (طهور) যা নিজেও পবিত্র এবং অন্যকে পবিত্র করতে পারে; যেমন বৃষ্টির পানি, নদীর পানি, কূপের পানি।  পবিত্র কিন্তু পবিত্রীকারী নয় (طاهر) যেমন ব্যবহৃত পানি, যা ওযু বা গোসলের পর অবশিষ্ট থাকে। নাপাক (نجس) যেমন নাপাক বস্তু দ্বারা দূষিত পানি। কূপের পানি সাধারণত প্রথম শ্রেণির মধ্যে পড়ে অর্থাৎ এটি পবিত্র ও পবিত্রীকারী। যতক্ষণ পর্যন্ত এতে নাপাক বস্তু পড়ে তার বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত সেই পানি ওযু ও গোসলে ব্যবহারযোগ্য। 

নবী করিম (সা.) এর যুগে ‘বুদাআহ কূপ’ (بئر بضاعة) নামে একটি কূপ ছিল, যেখানে বিভিন্ন অপবিত্র বস্তু যেমন কাপড়, পশুর চামড়া ইত্যাদি পড়ত। 

সাহাবায়ে কিরাম বিষয়টি নিয়ে নবী (সা.) এর কাছে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, “পানি পবিত্র, কোনো কিছু তাকে নাপাক করতে পারে না।” (সহিহ বুখারি, হাদীস: ১৯৮; সহিহ মুসলিম, হাদীস: ২৭৯) অর্থাৎ যদি নাপাক বস্তু পানির রঙ, গন্ধ বা স্বাদ পরিবর্তন না করে, তবে পানি পবিত্র থাকে। 

ইসলামী ফিকহে চার মাজহাবের আলেমরা কূপের পানির বিষয়ে বিশদ মতামত দিয়েছেন। হানাফি মতে কূপের পানি যদি নাপাক বস্তুর সংস্পর্শে আসে এবং রং, গন্ধ বা স্বাদ পরিবর্তিত না হয়, তাহলে পানি পবিত্র থাকবে। তবে পরিবর্তন ঘটলে পানি তুলে ফেলা বা পরিবর্তন করা জরুরি। শাফেয়ি মতে যদি পানি দুই কুল্লা (প্রায় ২১৬ লিটার) হয় এবং নাপাক পড়ে কিন্তু পরিবর্তন না হয়, তা পবিত্র। 

মালিকি ও হাম্বলি মতে, পরিমাণ যাই হোক, পানি পরিবর্তন না হলে সেটি পবিত্র। মূলনীতি হলো বিশুদ্ধতা; সন্দেহ নয়, বাস্তব পরিবর্তনই সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে। যদি ছোট প্রাণী কূপে পড়ে বেঁচে থাকে, পানি পবিত্র। যদি মারা যায় কিন্তু পরিবর্তন না হয়, তবুও ব্যবহারযোগ্য। তবে রঙ, গন্ধ বা স্বাদ বদলে গেলে কূপ পরিষ্কার করা জরুরি। 

ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) বলেন, কোনো প্রাণীর মৃতদেহ পড়ে পচে গেলে পানি পরিবর্তন করা ওয়াজিব। ইসলামের ইতিহাসে কূপ সমাজ ও সহযোগিতার প্রতীক যেমন রাসূলুল্লাহ (সা.) ‘রুমাহ কূপ’ ক্রয় করে মুসলমানদের জন্য দান করেছিলেন। 

কূপের পানি ওযু, গোসল, রান্না, পান, কৃষি এবং পশুর পানীয় হিসেবে বৈধ। ব্যক্তিগত বা জনকল্যাণমূলক কূপ খনন সাদাকায়ে জারিয়া।

হাদীসে আছে “মানুষ মারা গেলে তার সমস্ত আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি নয় সাদাকায়ে জারিয়া, উপকারী জ্ঞান এবং নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।” (সহিহ মুসলিম, হাদীস: ১৬৩১) সুতরাং, কূপের পানি মূলত পবিত্র যতক্ষণ না তার রঙ, গন্ধ বা স্বাদ পরিবর্তিত হয়। নাপাকতার প্রমাণ হতে হবে নিশ্চিত সন্দেহ নয়, প্রমাণই ভিত্তি। পানি সংরক্ষণ ও বিশুদ্ধ রাখা ইবাদতের অংশ।

ইসলাম শেখায় পানি আল্লাহর আমানত। কূপের পানি বিশুদ্ধ থাকলে এটি আল্লাহর নেয়ামত; আর দূষিত হলে তা পরিষ্কার করা মানুষের দায়িত্ব। 

আজকের পৃথিবীতে পানি সংকট ও দূষণের যুগে ইসলামি নীতি আমাদের শেখায় প্রতিটি ফোঁটা পানি মূল্যবান, তা সংরক্ষণ করা ঈমানের দাবি।

ইএইচ