নামাজ ইসলামের অন্যতম মৌলিক স্তম্ভ। পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পাশাপাশি কিছু নামাজ রয়েছে, যা ফরজ না হলেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ। এর মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ হলো বিতর নামাজ, যা দিনের শেষ ইবাদত হিসেবে মুসলমানের আমলনামা পূর্ণতা দেয়।
বিতর নামাজ কী: ‘বিতর’ শব্দের অর্থ একক, বিজোড় বা অদ্বিতীয়। আরবি ভাষায় 'الوتر';অর্থাৎ অদ্বিতীয়- যেমন আল্লাহ নিজেই ‘বিতর’, এক ও অদ্বিতীয়। এই নামাজকে 'বিতর নামাজ' বলা হয় কারণ এতে রাকাআতের সংখ্যা বিজোড়-সাধারণত তিন রাকাআত।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ এক (বিতর) এবং তিনি বিজোড় সংখ্যা পছন্দ করেন, তাই তোমরা বিতর নামাজ পড়ো। (সহিহ মুসলিম)
বিতর নামাজের সময়: বিতর নামাজ ইশার নামাজের পর থেকে ফজরের আগ পর্যন্ত যেকোনো সময় পড়া যায়। তবে সর্বোত্তম সময় হলো রাতের শেষ তৃতীয়াংশে, অর্থাৎ তাহাজ্জুদের আগে বা পরে। যারা নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়েন, তারা বিতর নামাজটি তাহাজ্জুদের পর আদায় করতে পারেন। আর যারা তাহাজ্জুদ পড়তে পারেন না, তারা ইশার নামাজের পরেই বিতর আদায় করে নেবেন-এটাই উত্তম।
রাকাআত সংখ্যা ও আদায়ের পদ্ধতি: বিতর নামাজ সাধারণত তিন রাকাআত ওয়াজিব। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ মুসলমান তিন রাকাআতে এটি আদায় করেন, যেমন
প্রথম রাকাআতে সূরা ফাতিহার পর একটি সূরা পাঠ করে রুকু-সিজদা সম্পন্ন করা। দ্বিতীয় রাকাআতে সূরা ফাতিহার পর আরেকটি সূরা পাঠ করে রুকু-সিজদা শেষে তৃতীয় রাকাআতে দাঁড়ানো। তৃতীয় রাকাআতে সূরা ফাতিহা ও একটি সূরা পাঠের পর রুকুতে যাওয়ার আগে 'দোয়া কুনুত' পড়া হয়। তারপর রুকু, সিজদা করে সালাম ফেরানো হয়।
দোয়া কুনুত: দোয়া কুনুত বিতর নামাজের একটি বিশেষ অংশ। এটি রাসুলুল্লাহ (সা.) নিয়মিত পড়তেন। বাংলা অর্থে এর সারাংশ হলো, হে আল্লাহ! আমরা তোমারই সাহায্য চাই, তোমারই ক্ষমা চাই, তোমারই প্রশংসা করি, এবং তোমারই ওপর নির্ভর করি। হে আল্লাহ! তোমারই আনুগত্য করি, তোমারই ওপর ভরসা রাখি, তোমারই দিকে ফিরে আসি... শত্রুদের থেকে আমাদের রক্ষা করো। এই দোয়া আমাদের আত্মসমর্পণ, ভক্তি ও আল্লাহর প্রতি আস্থা প্রকাশ করে।
বিতর নামাজের গুরুত্ব ও ফজিলত: বিতর নামাজকে নবীজী (সা.) অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আদায় করতেন। তিনি বলেছেন, বিতর নামাজ ফরজ নয়, তবে এটি আমার ও আমার অনুসারীদের জন্য ওয়াজিব। (আবু দাউদ)
অর্থাৎ এটি এমন একটি নামাজ যা না পড়লে পাপ হবে না, তবে ছেড়ে দেওয়া ইসলামী আদব ও রাসুলের সুন্নতের পরিপন্থী।
আরেকটি হাদীসে এসেছে, যে ব্যক্তি বিতর নামাজ না পড়ে ঘুমিয়ে যায়, সে যেন সকালে উঠে তা আদায় করে নেয়। (তিরমিজি শরীফ)
অর্থাৎ বিতর নামাজের গুরুত্ব এতটাই যে, মিস হয়ে গেলে সকালেও কাজা করে নেওয়া উচিত।
বিতর নামাজের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য: রাতের গভীরে আল্লাহর সঙ্গে নিঃশব্দ কথোপকথন-এটাই বিতর নামাজের মূল সৌন্দর্য। দিনের ব্যস্ততা শেষে এ নামাজ মানুষকে আত্মসমালোচনার সুযোগ দেয়। এটি যেন এক ধরনের দিনশেষের আত্মার ধোয়া, যেখানে মানুষ আল্লাহর কাছে নিজের ভুল ও পাপের ক্ষমা প্রার্থনা করে।
এ সময় আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ার আসমানে অবতীর্ণ হয়ে বলেন, কে আছো, যে আমার কাছে কিছু চাইবে? আমি তা দেব। (সহিহ বুখারি)
এই মুহূর্তেই বিতর নামাজ আদায় করলে বান্দা তার রবের সর্বাধিক সান্নিধ্য লাভ করে।
করণীয়
ইশার নামাজের পর বিতর পড়া অভ্যাস করুন: যারা নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়তে পারেন না, তারা ইশার পর তিন রাকাআত বিতর পড়ে ঘুমানো উত্তম।
তাহাজ্জুদের পর পড়লে অধিক ফজিলত: নবীজী (সা.) তাহাজ্জুদের পর বিতর নামাজ আদায় করতেন। তাই যাদের ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস আছে, তারা বিতরটি শেষে রাখুন।
দোয়া কুনুত শিখে নিন: এটি বিতরের বিশেষ দোয়া। মুখস্থ না থাকলে কাগজে লিখে রাখুন, ধীরে ধীরে শিখে নিন।
সময় নষ্ট না করে নিয়মিততা বজায় রাখুন: নামাজে ধারাবাহিকতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। একদিন বাদ দিলে যেন অন্যদিন দ্বিগুণ মনোযোগে পূরণ করেন।
বিতর নামাজ দিয়ে দিন শেষ করুন: নবীজী বলেছেন, তোমাদের দিনের শেষ নামাজ হোক বিতর। অর্থাৎ এ নামাজের মাধ্যমে দিনটি আল্লাহর প্রশংসা ও দোয়ার মাধ্যমে সমাপ্ত করুন।
বিতর নামাজ এমন একটি ইবাদত যা মুসলমানের দিনশেষে আত্মিক শান্তির দোয়ার মতো। এটি যেন দিনের ক্লান্তি শেষে আত্মার বিশ্রাম।
যে ব্যক্তি রাতে ঘুমানোর আগে তিন রাকাআত বিতর নামাজ আদায় করে, সে যেন সারা দিনের হিসাব আল্লাহর হাতে তুলে দেয় শান্তির সঙ্গে।
আসুন, আমরা সবাই এই সুন্নতকে জীবনের অংশ করে নেই, যেন প্রতিটি রাত হয় বিতরের আলোয় পরিশুদ্ধ, আর প্রতিটি সকাল হয় নতুন করে আল্লাহর রহমত লাভের সূচনা।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন