ইসলাম একটি পবিত্রতার ধর্ম। এখানে মানুষকে শুধু মন ও বিশ্বাসে নয়, বরং দেহ ও পরিচ্ছন্নতায়ও শুদ্ধ থাকতে বলা হয়েছে। কুরআন থেকে হাদিস পর্যন্ত সর্বত্র পরিষ্কারভাবে উল্লেখ আছে-নাপাক অবস্থা থেকে পবিত্রতা অর্জন করা ইমানের অংশ। কেননা নামাজ, তিলাওয়াত, তাওয়াফ, মসজিদে অবস্থানসহ বহু ইবাদত আছে যা নাপাক অবস্থায় বৈধ নয়। তাই নাপাক অবস্থার হুকুম ও করণীয় জানা প্রতিটি মুসলিমের জন্য জরুরি।
এই বিষয়ে মুসলিম সমাজে অনেক ভুল ধারণা, অজ্ঞতা কিংবা দ্বিধা-দ্বন্দ্বও দেখা যায়। অনেক সময় শারীরিক অশুদ্ধতা, বীর্যপাত, হায়েজ-নিফাস, প্রস্রাব-পায়খানার পর পরিচ্ছন্নতা-এসব বিষয়ে মানুষ লজ্জাবোধের কারণে সঠিক জ্ঞান নিতে চায় না। অথচ শরীয়াহ খুবই সরলভাবে প্রতিটি বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে।
নিচে সংক্ষিপ্ত অথচ পূর্ণাঙ্গভাবে নাপাক অবস্থা, তার হুকুম, করণীয় এবং নিষিদ্ধ কাজগুলো তুলে ধরা হলো।
ইসলামি শরীয়াতে নাপাক বা অপবিত্রতা দুই প্রকার: হাদাসে আকবার (বড় নাপাকি)।
এটি সেই অবস্থা যখন ফরজ গোসল বা ‘গোসল ফরজ’ ছাড়া পবিত্রতা অর্জন সম্ভব নয়। এর অন্তর্ভুক্ত- বীর্যপাত (স্বপ্নদোষ সহ), যৌনসংসর্গ, হায়েজ (মাসিক), নিফাস (সন্তান জন্মের পর রক্তপাত), প্রসব ব্যথা শুরুর পর সন্তান জন্ম, এই অবস্থায় গোসল না করা পর্যন্ত কোনো ইবাদত করা বৈধ নয়।
হাদাসে আসগার (ছোট নাপাকি)। এটি সাধারণ অশুদ্ধতা, যা শুধু অজু করার মাধ্যমে শুদ্ধ হয়। যেমন- প্রস্রাব বা পায়খানার পর পাদ (গ্যাস নির্গমন), ঘুমে অজ্ঞান অবস্থায় গভীর ঘুম শরীরের যেকোনো স্থানে রক্তপাত। এই অবস্থায় শুধু অজু করলেই ইবাদত করা যায়।
বড় নাপাক অবস্থায় যা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ- নামাজ পড়া, মসজিদে প্রবেশ বা অবস্থান, কুরআনের অক্ষর স্পর্শ করা, কুরআন তিলাওয়াত (চোখে দেখে পড়া), তাওয়াফ করা (হজ/ওমরায়)।
ছোট নাপাক অবস্থায় নিষিদ্ধ- নামাজ (অজু ছাড়া), কুরআনের অক্ষর স্পর্শ, তাওয়াফ, তবে এই অবস্থায়- দোয়া, জিকির, তাসবিহ, দরুদ ইত্যাদি করা বৈধ।
নাপাক অবস্থায় কুরআন শোনা যাবে কি- হ্যাঁ। কুরআন শোনা সব অবস্থায় বৈধ।
হাদিসে আছে, নবী করিম (সা.) অজু ছাড়াই কুরআন শুনতেন।
নাপাক অবস্থায় আল্লাহর জিকির ও দরুদ- যেকোনো সময় করা যাবে। কারণ জিকিরের জন্য অজু বা গোসল বাধ্যতামূলক নয়।
মোবাইলে কুরআন ধরলে কি অজু লাগে- না। কারণ মোবাইল বা স্ক্রিন কুরআনের আসল মুসহাফ নয়। তবে সম্মানার্থে অজু থাকা উত্তম।
গোসল ফরজ হওয়ার কারণ ও দলিল- বীর্যপাত, হাদিস: ‘জল নির্গত হলে গোসল ফরজ।’ সহিহ মুসলিম অর্থাৎ যেকোনো অবস্থায় বীর্যপাত ঘটলে গোসল আবশ্যক।
সহবাস (যৌনসঙ্গম)- যদিও বীর্যপাত না ঘটে, তবুও জরায় প্রবেশ ঘটলে গোসল ফরজ।
হায়েজ-নিফাসের রক্ত বন্ধ হওয়া, এ অবস্থায় পরিষ্কার হওয়ার পর অবশ্যই গোসল করতে হবে।
ইসলাম শরীয়াহ অনুযায়ী গোসলের তিনটি ফরজ আছে- মুখে পানি পৌঁছানো, নাকে পানি পৌঁছানো, সমগ্র দেহ ভিজানো, এগুলো না হলে গোসল সম্পূর্ণ হবে না।
নাপাক অবস্থা থেকে পবিত্র হওয়ার পদ্ধতি: ছোট নাপাকি-অজু: প্রস্রাব-পায়খানার পর পরিষ্কার পানি দিয়ে ধৌত করে অজু করতে হবে।
সুন্নাহ মতে অজুর চার ফরজ- মুখ ধোয়া, হাত-কনুইসহ ধোয়া, মাথার মাসেহ, পা ধোয়া এগুলো সম্পন্ন হলে ছোট নাপাকি দূর হয়।
বড় নাপাকি-ফরজ গোসল: গোসলের সুন্নত পদ্ধতি- হাত ধোয়া, লজ্জাস্থান ধোয়া, ওজুর মতো অজু করা, মাথায় তিনবার পানি ঢালা, সমগ্র শরীরে পানি ঢালতে ঢালতে নিশ্চিত হওয়া যে কোনো স্থানে শুকনো নেই, এভাবেই পবিত্রতা সম্পন্ন হয়।
নাপাক অবস্থায় সাধারণ কিছু ভুল, যা অনেকেই জানেন না
- নাপাক অবস্থায় আল্লাহর নাম নেওয়া নিষিদ্ধ ভাবা, বাস্তবে এটি ভুল ধারণা। জিকির সব অবস্থাতেই করা যাবে।
- গোসল ছাড়া বিছানায় যাওয়া যাবে না, হাদিসে আছে, রাতের ঘুমের আগে অজু করে শুয়ে পড়া মুস্তাহাব; কিন্তু বাধ্যতামূলক নয়।
- নাপাক অবস্থায় দোয়া করা যাবে না, এটিও ভুল। দোয়া সব অবস্থাতেই বৈধ।
- নারীর হায়েজ অবস্থায় কুরআন দেখা যাবে না, স্পর্শ ব্যতীত চোখ দিয়ে দেখা বৈধ।
দৈনন্দিন জীবনে নাপাক অবস্থা সম্পর্কে সতর্কতা: পরিচ্ছন্নতা না মানলে নামাজ কবুল হয় না, ইবাদত পবিত্রতার ওপর নির্ভর করে। অবহেলা করলে নামাজ নষ্ট হয়ে যায়।
বাচ্চাদের পরিচ্ছন্নতা শেখানো জরুরি: অজু, গোসল, পবিত্রতা-বিশেষ করে কিশোর বয়স থেকেই শিখানো উচিত।
শরীরের নাপাকি জমানো শারীরিক ক্ষতিও বয়ে আনে: পরিচ্ছন্নতা স্বাস্থ্যসম্মত। ইসলামে পরিচ্ছন্নতা অর্ধেক ইমান।
ইসলাম দেহ, মন, চিন্তা-সবকিছুর সামগ্রিক পবিত্রতা চায়। মানুষ যখন ইবাদত করে, সে সরাসরি আল্লাহর সামনে দাঁড়ায়। সেই অবস্থায় সর্বোচ্চ শারীরিক পরিচ্ছন্নতা পালন করা শ্রদ্ধা ও সম্মানের অংশ।
কুরআনের নির্দেশ, নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবা গ্রহণকারী ও পবিত্রতা অবলম্বনকারীকে ভালোবাসেন। সুরা বাকারাহ, ২২২
হাদিসের নির্দেশ: নবী করিম (সা.) বলেছেন, পরিচ্ছন্নতা ইমানের অর্ধেক। সহিহ মুসলিম
নাপাক অবস্থা মানুষের স্বাভাবিক জীবনের অংশ, এতে লজ্জার কিছু নেই। ইসলামের সৌন্দর্য হলো-এটি একটি সুসমন্বিত, বাস্তবভিত্তিক এবং সহজ দিকনির্দেশনা দিয়েছে। ছোট নাপাকি হোক কিংবা বড় নাপাকি-পরিচ্ছন্ন হওয়ার সুনির্দিষ্ট নিয়ম আছে। এ নিয়ম মানার মাধ্যমেই মুসলমান আল্লাহর সামনে শুদ্ধ অবস্থায় দাঁড়াতে পারে।
পরিবারে, সমাজে, মসজিদে এবং শিক্ষাস্থানে নাপাকির সঠিক জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ-যাতে মানুষ ভুল ধারণা না পোষণ করে এবং ইবাদত নষ্ট না হয়।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন