ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মুসলমানের জীবনে যে অপরিহার্য ইবাদত, সেই নামাজের জন্য আহ্বান জানানো হয় আযান ও ইকামত-এর মাধ্যমে। আযান ও ইকামত কেবল নামাজের সময় ঘোষণা নয়, বরং এতে রয়েছে ঈমান, তাওহিদ, রিসালাত ও আখিরাতের গভীর শিক্ষা। আযান ও ইকামত-এর জবাব দেওয়া সুন্নত ও অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি আমল, যা অনেক সময় আমাদের অজানা বা অবহেলিত থেকে যায়।
‘আযান’ শব্দের অর্থ হলো ঘোষণা বা আহ্বান। নির্দিষ্ট সময়ে নামাজের জন্য মুসলমানদের আহ্বান জানাতেই আযান দেওয়া হয়। আযানের প্রতিটি বাক্য মুসলমানের ঈমানকে নবায়ন করে এবং আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়।
আযানের মাধ্যমে মূলত তিনটি বিষয় ঘোষণা করা হয়, এক, আল্লাহ তায়ালা সর্বশ্রেষ্ঠ, দুই, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসুল, তিন, নামাজই মুক্তি ও সফলতার পথ।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আযান শুনে মুয়াজ্জিনের বাক্যের অনুরূপ জবাব দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। এটি সুন্নতে মুয়াক্কাদা। হাদিসে এসেছে, “তোমরা যখন মুয়াজ্জিনকে আযান দিতে শুনবে, তখন সে যা বলে, তোমরাও তা-ই বলবে,” (সহিহ মুসলিম)।
আযানের জবাব দেওয়ার মাধ্যমে একজন মুসলমান প্রকাশ্যে ও গোপনে আল্লাহর একত্ববাদে সাক্ষ্য দেয়।
মুয়াজ্জিন যে বাক্য বলবে, শ্রোতাও সেই বাক্য বলবে। তবে দুইটি ব্যতিক্রম রয়েছে, ‘হাইয়া ‘আলাস সালাহ’ এবং ‘হাইয়া ‘আলাল ফালাহ’।
এই দুই বাক্যের উত্তরে বলতে হবে, ‘লা হাওলা ওয়ালা কুয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহ’ (আল্লাহ ছাড়া কোনো শক্তি ও ক্ষমতা নেই)। এর গভীর অর্থ হলো, নামাজ পড়া বা সফল হওয়া আল্লাহর সাহায্য ছাড়া সম্ভব নয়।
আযান শেষ হলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর দরুদ পাঠ করা সুন্নত। এরপর নিচের দোয়াটি পড়া অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ, ‘আল্লাহুম্মা রব্বা হাযিহিদ দা‘ওয়াতিত তাম্মাহ...’। হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি আন্তরিকতার সাথে এই দোয়া পাঠ করবে, কিয়ামতের দিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জন্য শাফাআত করবেন।
ইকামত ও তার গুরুত্ব
ইকামত হলো জামাতে নামাজ শুরু হওয়ার পূর্ব ঘোষণা। ইকামত-এর বাক্যগুলো আযানের মতোই, শুধু 'কাদ কামাতিস সালাহ' বাক্যটি অতিরিক্ত থাকে, যা নামাজ শুরু হওয়ার ঘোষণা দেয়।
ইকামত-এর জবাব দেওয়াও মুস্তাহাব। আযানের মতোই ইকামত-এর প্রতিটি বাক্যের জবাব দেওয়া যায়। 'কাদ কামাতিস সালাহ' এর উত্তরে বলা যায়, ‘আকামাহাল্লাহু ওয়া আদামাহা’ (আল্লাহ নামাজ কায়েম করুন এবং তা স্থায়ী রাখুন)।
আযান ও ইকামত-এর জবাব দেওয়ার মাধ্যমে বান্দার গুনাহ মাফ হয়, বারবার তাওহিদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য দেওয়ার মাধ্যমে ঈমান দৃঢ় হয়, আযান শুনে শয়তান পালিয়ে যায়, জবাব দেওয়ার মাধ্যমে মুমিন নিজেকে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে রক্ষা করে, আযানের জবাব মানুষকে ধীরে ধীরে নামাজের জন্য মানসিক ও আত্মিকভাবে প্রস্তুত করে, এবং আযানের পর দোয়া পাঠকারীর জন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শাফাআত নিশ্চিত হয়।
আযান চলাকালীন কথা বন্ধ রাখা, মনোযোগ সহকারে শোনা, মোবাইল, কাজকর্ম থামিয়ে জবাব দেওয়া, বিনয় ও শ্রদ্ধার সাথে দোয়া করা।
বর্তমানে অনেকেই আযানকে কেবল শব্দ হিসেবে শোনেন, জবাব দেন না। বিশেষ করে বাজার, অফিস বা যানবাহনে থাকাকালে আযান উপেক্ষিত হয়। অথচ অল্প সময়ের এই আমল জান্নাতের পথে অমূল্য পুঁজি হতে পারে।
আযান ও ইকামত-এর জবাব একটি ছোট কিন্তু অত্যন্ত বরকতময় সুন্নত আমল। এটি আল্লাহর স্মরণ, রাসুলের প্রতি ভালোবাসা এবং নামাজের প্রস্তুতির এক অনন্য মাধ্যম। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের প্রতিটি স্তরে এই সুন্নত চর্চা হলে ঈমানি পরিবেশ গড়ে উঠবে। আমাদের উচিত আযান শুনলেই মনোযোগসহকারে জবাব দেওয়া এবং পরবর্তী প্রজন্মকে এই ফজিলতপূর্ণ আমলের শিক্ষা দেওয়া।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে আযান ও ইকামত-এর জবাব দেওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন