শীতের হাড় কাঁপানো ঠান্ডায় অজু, শরীর ও ইবাদত

ধর্ম ডেস্ক প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২৫, ২০২৫, ০৭:১৫ পিএম
শীতের হাড় কাঁপানো ঠান্ডায় অজু, শরীর ও ইবাদত

শীতকাল মানুষের জীবনে যেমন স্বস্তি ও আরামের বার্তা নিয়ে আসে, তেমনি অতিরিক্ত শীত অনেকের জন্য কষ্ট ও স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় ঠান্ডা পানিতে হাত-পা ভেজানো, অজু করা কিংবা দৈনন্দিন কাজের প্রয়োজনে পানির সংস্পর্শে আসা অনেক সময় শারীরিক সমস্যার জন্ম দেয়। 

বয়স্ক মানুষ, শিশু, অসুস্থ ব্যক্তি এবং দিনমজুর বা শ্রমজীবী মানুষের জন্য এই কষ্ট আরও তীব্র হয়। এমন পরিস্থিতিতে ইসলাম মানুষের শরীর, সুস্থতা ও ইবাদতের ব্যাপারে অত্যন্ত সহজ ও মানবিক নির্দেশনা দেয়।

ইসলাম দেহের নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেয়

ইসলাম শুধু পরকালের মুক্তির কথা বলে না, বরং দুনিয়ার জীবনে মানুষের শরীর, স্বাস্থ্য ও কল্যাণকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না (সূরা বাকারা, ১৯৫)। এই আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের শরীরের ক্ষতি করা ইসলামসম্মত নয়। 

অতিরিক্ত ঠান্ডায় যদি কেউ শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় থাকে, যেমন হাত-পা অবশ হয়ে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া, বাতব্যথা বা জ্বর-সর্দির তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়া, তবে সে অবস্থায় নিজের ক্ষতি ডেকে আনা ইসলাম সমর্থন করে না।

অজু ও ঠান্ডা পানি নিয়ে শরীয়তের দৃষ্টিভঙ্গি

নামাজের পূর্বশর্ত হিসেবে অজু ফরজ হলেও ইসলাম বাস্তবতা ও মানুষের সক্ষমতাকে বিবেচনা করেই বিধান দিয়েছে। স্বাভাবিক অবস্থায় পানি দিয়ে অজু করা আবশ্যক হলেও যদি পানি ব্যবহার করলে শারীরিক ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তাহলে ইসলাম বিকল্প ব্যবস্থা রেখেছে। 

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, দ্বীনের মধ্যে কঠোরতা নেই (সহিহ বুখারি)। শীতকালে অত্যন্ত ঠান্ডা পানি ব্যবহার করে অজু করতে গিয়ে যদি কেউ অসুস্থ হওয়ার আশঙ্কা করে বা ইতোমধ্যে অসুস্থ থাকে, তবে তার জন্য বেশ কিছু সহজ উপায় রয়েছে।

প্রথমত, যদি সম্ভব হয় তবে অজুতে কুসুম গরম পানি ব্যবহার করা উত্তম। এতে অজুও সম্পন্ন হবে এবং শরীরও সুরক্ষিত থাকবে। 

দ্বিতীয়ত, অজুর সময় অপচয় না করে সুন্নত পরিমাণে পানি ব্যবহার করে অঙ্গগুলো সীমিত রাখা যাতে শরীর কম ঠান্ডার সংস্পর্শে আসে। 

তৃতীয়ত, যদি পানি ব্যবহার করা একেবারেই ক্ষতিকর হয়, যেমন তীব্র শীত এবং পানি গরম করার কোনো সুযোগ নেই কিংবা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পানি ব্যবহার নিষেধ, তাহলে তায়াম্মুম করা সম্পূর্ণ বৈধ। 

কোরআনে বলা হয়েছে, যদি তোমরা অসুস্থ হও বা পানি না পাও, তবে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করো (সূরা নিসা, ৪৩)। এ থেকে স্পষ্ট হয় যে, শরীর রক্ষার স্বার্থে তায়াম্মুম করা ইসলামসম্মত এবং এতে কোনো গুনাহ নেই।

দৈনন্দিন কাজ ও অসুস্থ ব্যক্তির জন্য পরামর্শ

শীতকালে ঘরের কাজ, কৃষিকাজ বা রিকশা চালানোর মতো পেশায় নিয়োজিত মানুষদের প্রায়ই ঠান্ডা পানির সংস্পর্শে আসতে হয়। এতে ত্বকের সমস্যা ও স্নায়বিক জটিলতা দেখা দিতে পারে। ইসলামের দৃষ্টিতে এসব মানুষের উচিত কাজের সময় সুরক্ষামূলক উপকরণ ব্যবহার করা এবং কাজ শেষে দ্রুত শরীর শুকিয়ে নেওয়া। 

কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমার শরীরেরও তোমার ওপর অধিকার রয়েছে (সহিহ বুখারি)। একইভাবে যারা অসুস্থ, তাদের জন্য ইসলাম বিশেষ ছাড় দিয়েছে। দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে কষ্ট হলে বসে বা শুয়ে নামাজ পড়া এবং রোজা রাখা ক্ষতিকর হলে পরবর্তীতে তা কাজা করার অনুমতি রয়েছে।

শীতকালে ইসলামের আলোকে করণীয়

ইসলামে অহেতুক কষ্ট করাকে তাকওয়া বা আল্লাহভীতি মনে করা ভুল, বরং ভারসাম্যই মূলনীতি। শীতকালে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং ইবাদতে আন্তরিকতা বজায় রেখে শরীয়তের সহজ বিধান গ্রহণ করাই ইসলামের শিক্ষা। এর পাশাপাশি দরিদ্র ও শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং গরম কাপড় বা কম্বল দান করা বড় সওয়াবের কাজ। 

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যেখানে ইবাদত ও মানবিক কল্যাণ একে অপরের পরিপূরক। শীতের কনকনে ঠান্ডায় আমাদের উচিত শরীরের যত্ন নেওয়া এবং আল্লাহর দেওয়া সহজ সুযোগগুলো গ্রহণ করে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করা।

ইএইচ