ইসলামের ইবাদত ব্যবস্থায় জিকির হলো আত্মার খোরাক। মহানবী সা. ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি তার প্রভুর জিকির করে আর যে করে না, তাদের উদাহরণ হলো জীবিত ও মৃত ব্যক্তির মতো। জিকিরের জগতে এমন কিছু ছোট বাক্য রয়েছে যার ওজন আসমান ও জমিন ব্যাপি।
এ দোয়াটি মূলত আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষ্য এবং সূরা ইখলাসের মূল বার্তার সংমিশ্রণ। হাদিসের কিতাবসমূহে এটি বর্ণিত হয়েছে এভাবে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, আহাদান সামাদান, লাম ইয়ালিদ ওয়ালাম ইউলাদ, ওয়ালাম ইয়াকুল লাহু কুফুওয়ান আহাদ। যার অর্থ হলো আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরিক নেই। তিনি এক অদ্বিতীয়, অমুখাপেক্ষী। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও কেউ জন্ম দেয়নি। আর তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই।
এই দোয়াটির ফজিলত সম্পর্কে বিশিষ্ট সাহাবী হজরত তামিম দারি রা. থেকে একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি এই দোয়াটি ১০ বার পাঠ করবে, তার আমলনামায় ২০ লক্ষ বা দুই মিলিয়ন নেকি লেখা হবে।
মুহাদ্দিসিনদের মতে, এই বর্ণনার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা উম্মতে মুহাম্মদীকে অত্যন্ত অল্প সময়ে বিশাল সওয়াব অর্জনের সুযোগ করে দিয়েছেন। এটি আল্লাহর অশেষ দয়া বা ফজলে এলাহির অন্তর্ভুক্ত।
এই দোয়াটি কেন এত শক্তিশালী তার উত্তর লুকিয়ে আছে এর শব্দগুলোর গভীর অর্থের মাঝে। এখানে তাওহিদের তিনটি প্রধান দিক ফুটে উঠেছে। প্রথমত, উপাসনার একত্ব। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলে বান্দা স্বীকার করছে যে, সাহায্য চাওয়া, সিজদা করা এবং ভয় পাওয়ার যোগ্য একমাত্র আল্লাহ।
দ্বিতীয়ত, আল্লাহর নাম ও গুণাবলী। আহাদান ও সামাদান শব্দ দুটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আহাদ অর্থ তিনি সত্তাগতভাবে এক এবং সামাদ অর্থ তিনি অমুখাপেক্ষী, কিন্তু মহাবিশ্বের প্রতিটি ধূলিকণা তাঁর মুখাপেক্ষী। তিনি খাওয়া, দাওয়া, ঘুম বা ক্লান্তি থেকে পবিত্র। তৃতীয়ত, বংশীয় বা লৈঙ্গিক সম্পর্ক থেকে পবিত্রতা। দোয়াটির শেষাংশ সূরা ইখলাসের আয়াত, যা প্রমাণ করে যে আল্লাহর কোনো সন্তান বা পিতা মাতা নেই। তিনি সৃষ্টির শুরু ও শেষের ঊর্ধ্বে।
এই দোয়ার সওয়াব হাসিল করার জন্য বিশেষ কোনো কঠিন শর্ত নেই, তবে কিছু আদব বা নিয়ম পালন করলে আমলটি কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। হাদিসের নির্দেশনা অনুযায়ী দিনে অন্তত ১০ বার এই দোয়াটি পড়ার চেষ্টা করা উচিত। সকালে বা সন্ধ্যায় যেকোনো সময় এটি পড়া যায়। শুধু মুখে উচ্চারণ করলেই হবে না, বরং অন্তরে বিশ্বাস রাখতে হবে যে আল্লাহ সত্যিই এক এবং অদ্বিতীয়। ওজু অবস্থায় জিকির করা উত্তম হলেও ওজু ছাড়াও এটি পাঠ করা জায়েজ। আল্লাহর কাছে সেই আমল সবচেয়ে প্রিয় যা অল্প হলেও নিয়মিত করা হয়।
আধুনিক ব্যস্ত জীবনে দীর্ঘ ইবাদত করার সময় পাওয়া যায় না। এই দোয়াটি পাঠ করতে বড়জোর ২ থেকে ৩ মিনিট সময় লাগে অথচ বিনিময়ে অর্জিত হচ্ছে বিশ লাখ নেকি। কিয়ামতের দিন যখন মানুষ একটি নেকির জন্য হাহাকার করবে, তখন এই সামান্য কয়েক মিনিটের জিকির জান্নাতে যাওয়ার উসিলা হতে পারে।
এছাড়া এর আধ্যাত্মিক উপকারিতাও অনেক। তাওহিদের জিকির শয়তানকে দূরে রাখে, হৃদয়ে প্রশান্তি আনে এবং বান্দার ছোটখাটো গুনাহ মোচনে সহায়তা করে।
আল্লাহ তাআলার ভাণ্ডার অসীম এবং তিনি যাকে ইচ্ছা অপরিমিত দান করেন। তবে মনে রাখতে হবে, জিকিরের পাশাপাশি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ঠিক রাখা বাধ্যতামূলক। ফরজ বর্জন করে শুধু জিকির দিয়ে পূর্ণ কামিয়াবি অর্জন সম্ভব নয়। তাই প্রতিদিনের কর্মব্যস্ততার ফাঁকে এই দোয়াটি ১০ বার পাঠ করার অভ্যাস করা প্রয়োজন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তাওহিদের এই মহান জিকিরের ওপর আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন