পবিত্র শবে বরাত ২০২৬: ফজিলত, আমল, নিয়ত ও দোয়ার পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা

ধর্ম ডেস্ক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৩, ২০২৬, ০৬:৩২ পিএম
পবিত্র শবে বরাত ২০২৬: ফজিলত, আমল, নিয়ত ও দোয়ার পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা

ইসলামী ক্যালেন্ডার অনুযায়ী শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতটি ‘লাইলাতুল বরাত’ বা ‘শবে বরাত’ হিসেবে পরিচিত। ফারসি ‘শব’ মানে রাত আর ‘বরাত’ মানে মুক্তি; অর্থাৎ এটি মুক্তির রাত। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে (সম্ভাব্য ১৪ বা ১৫ ফেব্রুয়ারি) এই পবিত্র রাতটি পালিত হবে। এই রাতে মহান আল্লাহ তায়ালা আগামী এক বছরের জন্য মানুষের রিজিক, হায়াত ও তকদির নির্ধারণ করেন এবং অসংখ্য গুনাহগার বান্দাকে ক্ষমা করে দেন।

হাদিস শরিফে এই রাতটিকে অত্যন্ত মহিমান্বিত বলা হয়েছে। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ শাবান মাসের মধ্যবর্তী রাতে দুনিয়ার আকাশে অবতীর্ণ হন এবং কালব গোত্রের ভেড়ার পশমের চেয়েও বেশি সংখ্যক মানুষকে ক্ষমা করেন।” (তিরমিজি)। এই রাতে আল্লাহ তায়ালা ডাকতে থাকেন— ‘আছে কি কেউ ক্ষমা প্রার্থনাকারী? আমি তাকে ক্ষমা করব। আছে কি কেউ রিজিক অন্বেষণকারী? আমি তাকে রিজিক দান করব।’

শবে বরাতে নফল নামাজ পড়ার কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই। তবে কমপক্ষে ১২ রাকাত পড়া উত্তম। দুই রাকাত করে যত খুশি নফল নামাজ আদায় করা যায়।

আরবি নিয়ত:

(উচ্চারণ: নাওয়াইতু আন উসাল্লিয়া লিল্লাাহি তা’আলা রাকআতাই সালাতিন নাফলি, মুতাওয়াজ্জিহান ইলাা কাবাতিশ শারীফাতি— আল্লাহু আকবার।)

বাংলা নিয়ত:

আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য শবে বরাতের দুই রাকাত নফল নামাজ কেবলামুখী হয়ে আদায় করছি— আল্লাহু আকবার।

শবে বরাতের রাতে সালাতুত তাসবীহ নামাজ পড়া অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। এই নামাজে মোট ৩০০ বার তাসবীহ পাঠ করতে হয়। তাসবীহটি হলো:

সুবহানাল্লাহি ওয়ালহামদু লিল্লাহি ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার।

পদ্ধতি:

১. দাঁড়িয়ে সানা পড়ার পর ১৫ বার তাসবীহটি পড়ুন।
২. সুরা কিরাত পড়ার পর রুকুতে যাওয়ার আগে ১০ বার।
৩. রুকুতে থাকাকালীন ‘সুবহানা রাব্বিয়াল আজিম’ পাঠের পর ১০ বার।
৪. রুকু থেকে দাঁড়িয়ে ‘সামিয়াল্লাহু লিমান হামিদা’ বলার পর ১০ বার।
৫. প্রথম সেজদাহতে তাসবীহ পড়ার পর ১০ বার।
৬. দুই সেজদাহর মাঝে বসা অবস্থায় ১০ বার।
৭. দ্বিতীয় সেজদাহতে ১০ বার।

এভাবে প্রতি রাকাতে ৭৫ বার করে চার রাকাতে মোট ৩০০ বার তাসবীহ পূর্ণ হবে।

শাবান মাসে বেশি বেশি রোজা রাখা নবীজির (সা.) সুন্নত ছিল। শবে বরাতের পরদিন (১৫ই শাবান) নফল রোজা রাখা অত্যন্ত বরকতময়। অনেকে শাবান মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ আইয়ামে বিজের রোজা রাখেন।

রোজার নিয়ত (বাংলা):

“আমি আগামীকাল পবিত্র শবে বরাতের নফল রোজা রাখার নিয়ত করছি।”

আরবি নিয়ত:

(উচ্চারণ: নাওয়াইতু আন আসুমা গাদাম মিন শাহরি শাবানাস সুন্নাতি লিল্লাাহি তা’আলা।)

শবে বরাত হলো পাপমুক্তির রাত। এই রাতে মহান আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করে ক্ষমা চাওয়া মুমিনের প্রধান কাজ।

হজরত আয়েশা (রা.) নবীজিকে (সা.) জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমি যদি লাইলাতুল কদর বা বরাত পাই তবে কী দোয়া পড়ব?’ তিনি এই দোয়াটি শিখিয়েছিলেন:

(উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন, তুহিব্বুল আফওয়া ফাফু আন্নি।) অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল, আপনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন; অতএব আমাকে ক্ষমা করুন।

পাপমুক্তির জন্য এই দোয়াটি অন্তত একবার পড়া উচিত। নবীজি (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি বিশ্বাস ও একনিষ্ঠতার সাথে দিনে বা রাতে এই দোয়াটি পড়বে এবং মারা যাবে, সে জান্নাতি হবে। (সহিহ বুখারি)।

এই রাতে ইবাদতের কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই, তবে আপনি নিম্নের কাজগুলো করতে পারেন:

কুরআন তিলাওয়াত: বিশেষ করে সুরা ইয়াসিন, সুরা আর-রাহমান এবং সুরা দুখান তিলাওয়াত করা উত্তম।

জিকির-আজকার: সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার এবং দরুদ শরিফ পাঠ করা।

কবর জিয়ারত: রাসূলুল্লাহ (সা.) এই রাতে মদিনার ‘জান্নাতুল বাকি’ গোরস্তানে গিয়ে মৃতদের জন্য দোয়া করেছিলেন। তাই সময় থাকলে পিতা-মাতা বা আত্মীয়দের কবর জিয়ারত করা সুন্নত।

মোনাজাত: নিজের পরিবার, দেশ এবং সারা বিশ্বের মুসলিম উম্মাহর শান্তি ও রিজিকের জন্য আল্লাহর কাছে রোনাজারি করা।

শবে বরাতে ইবাদতের নামে অনেক ক্ষেত্রে বিদাত ও কুসংস্কার ঢুকে পড়েছে। এগুলো থেকে দূরে থাকা জরুরি:

আতশবাজি ও পটকা ফোটানো: এটি গুনাহের কাজ এবং অন্যের ইবাদতে বিঘ্ন ঘটায়।
অহেতুক আলোকসজ্জা: অপচয় ইসলামে নিষিদ্ধ।

হালুয়া-রুটি নিয়ে বাড়াবাড়ি: ইবাদত বাদ দিয়ে কেবল খাওয়ার উৎসবে মেতে ওঠা উচিত নয়।

ছবি তোলা বা ভিডিও করা: বর্তমান সময়ে ইবাদতগাহে সেলফি তোলা বা উচ্চশব্দে কথা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে।

শবে বরাত আমাদের জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ। সারা বছরের পরিকল্পনা যেমন আল্লাহ তায়ালা এই রাতে চূড়ান্ত করেন, তেমনি আমাদের তওবাও কবুল করেন। আসুন, ২০২৬ সালের এই পবিত্র রজনীতে আমরা দুনিয়াবি সব কোলাহল ভুলে নির্জনে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল হই। পবিত্র এই রাতটি কেবল রসম বা প্রথা হিসেবে পালন না করে, হৃদয়ের গভীর থেকে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করি।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে শবে বরাতের পরিপূর্ণ সওয়াব দান করুন এবং গুনাহমুক্ত জীবন দান করুন। আমিন।

এএন