নফল রোজার ফজিলত ও তাৎপর্য: আল্লাহর ভালোবাসা ও নৈকট্য লাভ

ধর্ম ডেস্ক প্রকাশিত: এপ্রিল ৮, ২০২৬, ০৩:৪৯ পিএম
নফল রোজার ফজিলত ও তাৎপর্য: আল্লাহর ভালোবাসা ও নৈকট্য লাভ

নফল ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর বিশেষ ভালোবাসা অর্জন করা। হাদিসে কুদসিতে বর্ণিত আছে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমার বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার এতটা কাছে চলে আসে যে, আমি তাকে ভালোবাসতে শুরু করি। আর আমি যখন তাকে ভালোবাসি, তখন আমি তার কান হয়ে যাই যা দিয়ে সে শোনে, তার চোখ হয়ে যাই যা দিয়ে সে দেখে...(সহিহ বুখারি)।

নফল রোজা রাখার মাধ্যমে একজন মুমিন তার প্রবৃত্তিকে দমন করে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে নিজেকে উৎসর্গ করে, যা তাকে 'বিলায়ত' বা আল্লাহর বন্ধুত্ব লাভে সাহায্য করে।

মানুষ হিসেবে আমাদের ফরজ ইবাদতগুলোতে অনেক সময় ভুলভ্রান্তি বা একাগ্রতার অভাব থাকে। কেয়ামতের দিন যখন ফরজ আমলের হিসাব নেওয়া হবে, তখন যদি তাতে কোনো ঘাটতি দেখা যায়, আল্লাহ ফেরেশতাদের বলবেন, দেখো, আমার বান্দার কোনো নফল আমল আছে কি না। নফল রোজা তখন ফরজ রোজার সেই শূন্যস্থান পূরণ করবে এবং বান্দার নাজাতের উসিলা হবে।

রোজাদারদের সম্মানে জান্নাতে একটি বিশেষ দরজা রাখা হয়েছে, যার নাম 'রাইয়ান'। কেয়ামতের দিন ঘোষণা করা হবে, ‘রোজাদাররা কোথায়? তখন তারা ওই দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। নফল রোজার মাধ্যমে একজন মুমিন জান্নাতের এই ভিআইপি প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে পারে।

রোজা হলো মুমিনের জন্য ঢালস্বরূপ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একদিন রোজা রাখে, আল্লাহ সেই একদিনের বিনিময়ে তার মুখমণ্ডলকে জাহান্নাম থেকে সত্তর বছরের পথ দূরে সরিয়ে দেন।(সহিহ মুসলিম)। নিয়মিত নফল রোজা পালনকারী ব্যক্তি জাহান্নামের আগুন থেকে একটি সুরক্ষিত দুর্গের মতো নিরাপত্তা লাভ করেন।

নফল রোজা যেকোনো দিন রাখা যায় (হারাম দিনগুলো বাদে), তবে বিশেষ কিছু দিন রয়েছে যেগুলোর সওয়াব অনেক বেশি। 

রমজান মাসের পর শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা রাখার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখল এবং এরপর শাওয়ালের ছয়টি রোজা রাখল, সে যেন সারা বছর রোজা রাখল। এটি একটি গাণিতিক হিসাব—একটি নেক আমলের সওয়াব ১০ গুণ। ৩০ দিন (রমজান) + ৬ দিন = ৩৬ দিন। ১০ দিয়ে গুণ করলে হয় ৩৬০ দিন, যা একটি চান্দ্র বছরের সমান।

জিলহজ মাসের ৯ তারিখে (হজ পালনকারী ব্যতীত অন্যদের জন্য) এই রোজা রাখা সুন্নত। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘আরাফার দিনের রোজার ব্যাপারে আমি আল্লাহর কাছে আশা করি যে, এটি তার পূর্ববর্তী এক বছর এবং পরবর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে।(সহিহ মুসলিম)।

১০ই মহররমের রোজা বিগত এক বছরের গুনাহ মুছে দেয়। ইয়াহুদিদের সাথে সাদৃশ্য বর্জন করতে এর আগে বা পরে আরও একটি রোজা রাখা উত্তম।

প্রতিটি হিজরি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোজা রাখা সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ। রাসুল (সা.) এই দিনগুলোতে রোজা রাখার জন্য বিশেষ তাগিদ দিতেন। এই তিন দিন রোজা রাখা সারা বছর রোজা রাখার সমতুল্য।‘ঙ. সোমবার ও বৃহস্পতিবারের রোজা

সাপ্তাহিক এই দুই দিন রোজা রাখা সুন্নত। নবীজি (সা.)-কে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘এই দুই দিন আল্লাহর দরবারে বান্দার আমলনামা পেশ করা হয়। আমি পছন্দ করি যে, যখন আমার আমল পেশ করা হবে তখন যেন আমি রোজাদার থাকি।

রোজা মানুষকে ধৈর্য ও সংযম শেখায়। যখন কেউ হালাল খাবার ও পানীয় থাকা সত্ত্বেও কেবল আল্লাহর ভয়ে তা ত্যাগ করে, তখন তার মধ্যে এক গভীর আধ্যাত্মিক শক্তি জাগ্রত হয়। এই শক্তি তাকে বাকি জীবনে হারাম থেকে বেঁচে থাকতে সাহায্য করে।

নফল রোজা রাখার মাধ্যমে একজন স্বচ্ছল ব্যক্তি ক্ষুধার যন্ত্রণা অনুভব করতে পারেন। এটি তাকে অভাবী ও দুস্থ মানুষের প্রতি দয়ালু হতে এবং দান-সদকায় উদ্বুদ্ধ করে।‘৩. স্বাস্থ্যগত উপকারিতা

আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানও এখন 'ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং' বা মাঝেমধ্যে উপবাস থাকার জয়গান গাইছে। নফল রোজা শরীরের পরিপাকতন্ত্রকে বিশ্রাম দেয়, মেদ কমায় এবং রক্তচাপ ও শর্করা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।

নফল রোজার নিয়ত সুবহে সাদিকের পর দুপুরে সূর্য মাথার ওপর থেকে ঢলে পড়ার আগ পর্যন্ত করা যায়, যদি এর মাঝে কিছু পানাহার না করা হয়। নফল ইবাদত যত গোপনে করা যায়, তার সওয়াব ও ইখলাস তত বাড়ে। লোক দেখানো ভাব পরিহার করা জরুরি। কোনো মেহমান আসলে বা বিশেষ প্রয়োজনে নফল রোজা ভাঙলে গুনাহ হয় না, তবে পরবর্তীতে তার কাজা করে নেওয়া উত্তম।

পরিশেষে বলা যায়, নফল রোজা কেবল ক্ষুধার্ত থাকার নাম নয়; বরং এটি রুহের খোরাক। এটি মুমিনের চরিত্র সংশোধন করে এবং আল্লাহর সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক তৈরি করে। যারা আখিরাতে উচ্চ মর্যাদা প্রত্যাশা করেন, তাদের উচিত ফরজ পালনের পাশাপাশি সাধ্যমতো নফল রোজার অভ্যাস গড়ে তোলা। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই মহান ইবাদত পালনের তৌফিক দান করুন। আমিন।

এএন