পৃথিবীর ইতিহাসে যখন শ্রমিকের কোনো অধিকার ছিল না, যখন দাসপ্রথা আর শোষণের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছিল মেহনতি মানুষ, ঠিক তখনই মানবতার মুক্তির দিশারি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)। তিনি কেবল একজন ধর্মপ্রচারক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সমাজ সংস্কারক।
শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় তিনি যে বৈপ্লবিক আদর্শ রেখে গেছেন, তা কিয়ামত পর্যন্ত বিশ্বের জন্য এক চিরন্তন আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে। আজকের এই আধুনিক যুগেও যখন শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য পাওনা আর আত্মসম্মানের জন্য লড়াই করছে, তখন মহানবী (সা.)-এর দেখানো পথই হতে পারে একমাত্র সমাধানের পথ।
শ্রমিককে সমাজ সাধারণত নিচু নজরে দেখে, কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) শিখিয়েছেন ভিন্ন চিত্র। একদিন এক সাহাবীর হাতের তালু কঠোর পরিশ্রমে কালো এবং খসখসে হয়ে গিয়েছিল। নবীজি (সা.) তা দেখে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার হাতের এই অবস্থা কেন? সাহাবী উত্তর দিলেন, পরিবারের জীবিকা নির্বাহের জন্য আমি পাথরে কাজ করি।
তখন দয়ার নবী (সা.) সেই শ্রমিকের হাতটি নিজের হাতে তুলে নিয়ে তাতে চুম্বন করলেন এবং বললেন, এই সেই হাত, যাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ভালোবাসেন। একজন বিশ্বনেতা ও রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে একজন সাধারণ শ্রমিকের শ্রমক্লান্ত হাতে চুম্বন করা, পৃথিবীর ইতিহাসে এর চেয়ে বড় সম্মান শ্রমিকের জন্য আর কেউ দিতে পারেনি।
শ্রমিক শোষণের অন্যতম হাতিয়ার হলো তাদের পাওনা আদায়ে বিলম্ব করা। মহানবী (সা.) এই শোষণের মূলে আঘাত করে ঘোষণা করেছেন এক ঐতিহাসিক মূলনীতি। তিনি বলেছেন, শ্রমিকের গায়ের ঘাম শুকানোর আগেই তার পারিশ্রমিক পরিশোধ করে দাও। এই একটি বাক্যই শ্রমিকের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় নিশ্চয়তা। তিনি স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছেন যে, যারা শ্রমিকের কাজ করিয়ে নিয়ে তার পারিশ্রমিক দেয় না, কিয়ামতের দিন স্বয়ং আল্লাহ তাদের বিরুদ্ধে বাদী হবেন।
ইসলামের আগে শ্রমিকদের মনে করা হতো মালিকের সম্পদ বা দাস। কিন্তু নবীজি (সা.) এই প্রথা ভেঙে দিয়ে ঘোষণা করলেন, তোমাদের অধীনস্থরা তোমাদেরই ভাই। আল্লাহ তাদেরকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন। সুতরাং যার অধীনে কোনো ভাই থাকে, সে যা খাবে তাকেও তা-ই খাওয়াবে, সে যা পরবে তাকেও তা-ই পরাবে। এই বাণীর মাধ্যমে তিনি মালিক ও শ্রমিকের মধ্যকার শ্রেণি বৈষম্য দূর করে দিয়েছেন। তিনি কেবল মুখেই বলেননি, বরং নিজে যখন উটের পিঠে চড়তেন, তখন তাঁর খাদেমকেও পালাক্রমে উটে চড়াতেন এবং নিজে হেঁটে যেতেন।
বর্তমান করপোরেট দুনিয়ায় শ্রমিকের ওপর কাজের পাহাড় চাপিয়ে দেওয়া একটি সাধারণ ঘটনা। কিন্তু মহানবী (সা.) কঠোরভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, তাদের ওপর এমন কোনো কাজ চাপিয়ে দিও না, যা তাদের সাধ্যের বাইরে। আর যদি এমন কঠিন কাজ দিতেই হয়, তবে তোমরা নিজেরাও তাদের সাহায্য করো। এটি মালিক, শ্রমিক সুসম্পর্কের এক অনন্য উদাহরণ।
নবীজি (সা.) ভিক্ষাবৃত্তিকে ঘৃণা করতেন এবং কায়িক শ্রমকে উৎসাহিত করতেন। তিনি বলতেন, নিজের হাতের উপার্জিত খাদ্যের চেয়ে উত্তম খাদ্য আর নেই। এমনকি আল্লাহর নবী দাউদ (আ.) নিজ হাতে বর্ম তৈরি করে তা বিক্রি করে জীবন ধারণ করতেন, এই উদাহরণ দিয়ে তিনি বুঝিয়েছেন যে কোনো কাজই ছোট নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বয়ং শৈশবে মক্কাবাসীদের ছাগল চড়িয়েছেন এবং যৌবনে সফলভাবে ব্যবসা পরিচালনা করেছেন। তিনি শ্রমকে ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছেন।
আজকের মে দিবসে বা শ্রমিকের অধিকারের আলোচনায় আমরা যখন বড় বড় তত্ত্ব কথা শুনি, তখন ফিরে তাকালে দেখি ১৪০০ বছর আগেই মহানবী (সা.) শ্রমিকের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক অধিকার নিশ্চিত করে গেছেন। যদি আজকের মালিকরা শ্রমিকদের ভাই হিসেবে গণ্য করত, তাদের ন্যায্য পাওনা সময়মতো দিত এবং তাদের সাথে সদাচরণ করত, তবে বিশ্বে কোনো শ্রমিক অসন্তোষ থাকত না।
বিশ্বনবী (সা.)-এর আদর্শ কেবল তসবিহ পাঠে নয়, বরং তাঁর শেখানো ইনসাফ ও দয়া সমাজের প্রতিটি স্তরে, বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষের জীবনে প্রতিফলিত করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। শ্রমিকের মর্যাদা রক্ষাই হোক প্রকৃত ইসলামী সমাজ গঠনের প্রথম ধাপ।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন