হজের ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নত আমল কী কী? জেনে নিন

আমার সংবাদ ধর্ম ডেস্ক প্রকাশিত: মে ২৩, ২০২৬, ০৪:০৩ পিএম
হজের ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নত আমল কী কী? জেনে নিন

হজ আল্লাহ তাআলার প্রতি নিখাদ ভালোবাসা, নিরঙ্কুশ আনুগত্য এবং আত্মশুদ্ধির এক অনন্য ইবাদত। এই মহান ইবাদতের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ তাঁদের ঐতিহ্য, আত্মত্যাগের শিক্ষা এবং আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের অঙ্গীকারকে নতুন করে স্মরণ করেন। হজ সবার ওপর ফরজ নয়, বরং আর্থিক ও শারীরিকভাবে সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের ওপর জীবনে একবার ফরজ হয়। যাঁরা প্রথমবার ফরজ হজ আদায় করতে যান, তাঁদের পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকে না। তাই হজের দিনগুলোতে হজের আমল ও বিধিবিধান সম্পর্কে জানা অত্যন্ত জরুরি।

হজের ফরজ ও ওয়াজিবসমূহ
হজের ফরজ ৪টি:

  • ১. হজের নিয়তে ইহরাম পরিধান করা এবং তালবিয়া পাঠ করা।
  • ২. ৯ জিলহজ আরাফাতের ময়দানে (কিছু সময়ের জন্য হলেও) অবস্থান করা।
  • ৩. তাওয়াফে জিয়ারত বা ফরজ তাওয়াফ সম্পাদন করা।
  • ৪. এই ফরজগুলো সুনির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট স্থানে ধারাবাহিকভাবে করা।

হজের ওয়াজিব ৯টি:

  • ১. সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে সাঈ করা বা দ্রুত চলা।
  • ২. ৯ জিলহজ দিবাগত রাতে মুজদালিফায় অবস্থান করা এবং সূর্যোদয় পর্যন্ত সেখানে থাকা।
  • ৩. শয়তানের স্তম্ভে (জামারাত) পাথর নিক্ষেপ করা (রমি)।
  • ৪. বহিরাগত হাজিদের জন্য মক্কা শরিফে প্রবেশের পর সর্বপ্রথম ‘তাওয়াফে কুদুম’ করা।
  • ৫. মক্কা থেকে শেষ বিদায়ের সময় ‘বিদায়ী তাওয়াফ’ করা।
  • ৬. ১০ জিলহজ পাথর মারার পর মাথা মুণ্ডানো বা চুল ছোট করা।
  • ৭. কোরবানি দেওয়া (বহিরাগত হাজিদের জন্য)।
  • ৮. নির্দিষ্ট দিনে দুই নামাজ একত্রে পড়া (আরাফায় জোহর-আসর এবং মুজদালিফায় মাগরিব-এশা)।
  • ৯. পাথর মারা, কোরবানি ও মাথা মুণ্ডন এই কাজগুলো ধারাবাহিকভাবে সম্পন্ন করা।

ইহরামের প্রস্তুতি ও নিয়মকানুন: ইহরাম বাঁধার আগেই গোঁফ, বগল ও নাভির নিচের লোম পরিষ্কার করা, নখ কাটা এবং গোসল করে পবিত্র হওয়া আবশ্যক। ইহরাম বাঁধার আগে সুগন্ধি ব্যবহার করা মুস্তাহাব, তবে ইহরামের পর সুগন্ধি ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

ইহরাম বাঁধার নিয়ম:

  • ১. পবিত্রতার জন্য গোসল বা অজু করে নেওয়া এবং সেলাইবিহীন দুটি সাদা কাপড় (লুঙ্গি ও চাদর) পরিধান করা।
  • ২. মিকাতের নির্ধারিত স্থানে বা তার আগে ইহরামের নিয়তে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করা। নামাজ শেষে মাথা থেকে টুপি সরিয়ে ফেলা।
  • ৩. হজের জন্য হলে ‘লাব্বাইক হাজ্জান’ বলে নিয়ত করা।
  • ৪. নিয়তের পর পরই উচ্চৈঃস্বরে তিনবার তালবিয়া (লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক...) পাঠ করা। তালবিয়া পাঠের মাধ্যমে ইহরাম সম্পূর্ণ হয় এবং তখন থেকে স্বাভাবিক সময়ের অনেক বৈধ কাজও হারাম হয়ে যায়।

মক্কায় পৌঁছানোর পরের আমল: মক্কায় পৌঁছে কাবা শরিফ সাতবার প্রদক্ষিণ (তাওয়াফ) করতে হবে। তাওয়াফের সময় পুরুষদের জন্য ডান কাঁধ উন্মুক্ত রাখা (ইজতিবাহ) এবং প্রথম তিন চক্কর দ্রুত পদে চলা (রমল) সুন্নত।

তাওয়াফ শেষে সাফা পর্বত থেকে শুরু করে মারওয়া পর্যন্ত মোট সাতবার সাঈ বা দৌড়াতে হবে।

এরপর মাথা মুণ্ডন বা চুল ছেঁটে ইহরাম মুক্ত হতে হয়। হজের আগে ইহরাম থেকে এই স্বাভাবিক জীবনে প্রত্যাবর্তন করাকে ‘হজে তামাত্তু’ বলা হয়।

হজের দিনগুলোর ধারাবাহিক আমল

৮ জিলহজের আমল: এই দিন নিজ কক্ষ বা কাবাঘরে বসে পুনরায় হজের ইহরাম বেঁধে মিনায় পৌঁছাতে হবে। সেখানে জোহর, আসর, মাগরিব, এশা এবং পরদিনের ফজরসহ মোট পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে হবে।

৯ জিলহজের আমল: সকালে মিনা থেকে রওনা হয়ে আরাফাতের ময়দানে পৌঁছাতে হবে। সেখানে জোহর ও আসরের নামাজ একত্রে আদায় করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত দোয়া, দরুদ ও ইস্তিগফারে মশগুল থাকতে হবে। সূর্যাস্তের পর মাগরিব না পড়েই মুজদালিফার দিকে রওনা হতে হবে এবং সেখানে গিয়ে মাগরিব ও এশা একত্রে পড়তে হবে। এই রাতে মুজদালিফায় অবস্থান ও বিশ্রাম নিতে হবে এবং মিনার জন্য অন্তত ৪৯টি পাথর সংগ্রহ করতে হবে।

১০ জিলহজের আমল: মুজদালিফা থেকে মিনায় ফিরে শুধু বড় শয়তানের স্তম্ভে ৭টি পাথর নিক্ষেপ করতে হবে। এরপর নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে কোরবানি দিয়ে মাথা মুণ্ডন বা চুল ছোট করতে হবে। এর মাধ্যমে ইহরামের সমাপ্তি ঘটবে। এরপর মক্কায় গিয়ে ‘তাওয়াফে জিয়ারত’ সম্পন্ন করতে হবে (যা ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত করা যায়)।

১১ ও ১২ জিলহজের আমল: এই দুই দিন মিনায় অবস্থান করে প্রতিদিন শয়তানের ছোট, মধ্যম ও বড় এই তিনটি স্তম্ভেই ৭টি করে মোট ২১টি করে পাথর নিক্ষেপ করতে হবে। ১২ জিলহজ পাথর মারা শেষ করে মিনা থেকে চূড়ান্ত বিদায় নিয়ে হাজিরা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যান। তবে মনে রাখতে হবে, ফরজ তাওয়াফে জিয়ারত সম্পন্ন করার আগে স্ত্রী সহবাস সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।