দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে নতুন এক ইতিহাসের সোনালি অধ্যায় রচিত হলো থাইল্যান্ডের ব্যাংককে। প্রথাগত ফুটবল মাঠের বাইরে এবার ইনডোর ফুটবলের (ফুটসাল) আঙিনায় নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করল বাংলাদেশের মেয়েরা।
প্রথমবারের মতো আয়োজিত সাফ নারী ফুটসাল চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে মালদ্বীপকে ১৪-২ গোলের বিশাল ব্যবধানে চূর্ণ করে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে সাবিনা, মনিকা ও তহুরারা।
রোববার ব্যাংককের নন্থাবুরি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে বাংলাদেশের আধিপত্য ছিল এতটাই যে, মালদ্বীপের রক্ষণভাগ কার্যত তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে।
এ শিরোপা জয়ের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় নারী ফুটবলে অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে বাংলাদেশ আবারও নিজেদের অবস্থান জানান দিল।
ম্যাচ শুরুর আগে সমীকরণ ছিল অত্যন্ত সহজ, মালদ্বীপের বিপক্ষে কেবল ড্র করলেই শিরোপা নিশ্চিত ছিল বাংলাদেশের। কিন্তু মাঠের লড়াইয়ে ড্র নয়, বরং বড় ব্যবধানে জয়ের ক্ষুধা নিয়েই মাঠে নেমেছিল লাল-সবুজ প্রতিনিধিরা। ম্যাচের শুরুতেই অবশ্য একটি অনাকাঙ্ক্ষিত অঘটনের শিকার হয় বাংলাদেশ। খেলার মাত্র ৩ মিনিটের মাথায় গোলরক্ষক স্বপ্না আক্তার ও ডিফেন্ডার মাসুরা পারভীনের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ নিয়ে ১-০ তে এগিয়ে যায় মালদ্বীপ।
তবে এই ধাক্কা বাংলাদেশের মেয়েদের দমাতে পারেনি। বরং গোল হজম করার পর যেন আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলে ওঠে সাবিনা খাতুনের দল।
ম্যাচের ৫ মিনিটের মাথায় দর্শনীয় এক ফ্রি-কিক থেকে সমতা ফেরান অধিনায়ক সাবিনা খাতুন। যদিও এর পরপরই পেনাল্টি মিস করেন তিনি, কিন্তু ১৩ মিনিটে আবারও ফ্রি-কিক থেকে গোল করে দলকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে নেন।
২০ মিনিটের প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগেই বাংলাদেশ ৬-১ গোলে এগিয়ে যায়। সাবিনার সাথে এই অর্ধে জোড়া গোল করেন লিপি আক্তারও।
বিরতির পর ফিরে এসে বাংলাদেশ যেন আরও ক্ষুধার্ত হয়ে ওঠে। মালদ্বীপের গোলপোস্ট লক্ষ্য করে একের পর এক আক্রমণ সাজাতে থাকে তহুরা ও কৃষ্ণা রানী সরকাররা। ম্যাচের ২২তম মিনিটে নিজের তৃতীয় গোল পূর্ণ করে হ্যাটট্রিক করেন বাংলার গোলমেশিন সাবিনা খাতুন।
২৬ মিনিটে তিনি ব্যক্তিগত চতুর্থ গোলটিও করেন। মাতসুশিমা সুমাইয়া, নিলুফা ইয়াসমিন, কৃষ্ণা রানী এবং শেষ দিকে মেহেরুন ও মাসুরার গোলে ব্যবধান দাঁড়ায় ১৪-২। পুরো টুর্নামেন্টে মালদ্বীপকে খুঁজে পাওয়া যায়নি বাংলাদেশের গতির ঝড়ে।
লিগ পদ্ধতির এই টুর্নামেন্টে ৭টি দেশ অংশগ্রহণ করেছিল। ৬ ম্যাচে ৫ জয় এবং ১ ড্র নিয়ে মোট ১৬ পয়েন্ট অর্জন করে টেবিলের শীর্ষে থেকে শিরোপা নিশ্চিত করে বাংলাদেশ। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ভুটান ৫ ম্যাচে ১১ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান করছে। বাংলাদেশের মেয়েরা পুরো টুর্নামেন্টে গোল করেছে রেকর্ড সংখ্যক, যা তাদের আক্রমণাত্মক ফুটবলের প্রমাণ দেয়।
২০১৮ সালে এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের মাধ্যমে বাংলাদেশের নারী ফুটসালের যাত্রা শুরু হয়েছিল তৎকালীন কোচ গোলাম রব্বানীর হাত ধরে। কিন্তু এরপর দীর্ঘ ছয় বছর এই ফরম্যাটে কোনো কার্যক্রম ছিল না।
গত বছর বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) নতুন উদ্যমে ফুটসাল দল গঠনের কাজ শুরু করে। ব্যাংককের এই টুর্নামেন্টকে সামনে রেখে বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল, যার ফল হাতেনাতে পেল বাংলাদেশ।
মেয়েদের এই আকাশচুম্বী সাফল্যের দিনে ছেলেদের ফুটসালে অবশ্য চিত্রটি ভিন্ন। ব্যাংককেই চলমান সাফ ছেলেদের ফুটসালে শিরোপা নিশ্চিত করেছে মালদ্বীপ। সেখানে বাংলাদেশ ৫ ম্যাচে মাত্র ৭ পয়েন্ট নিয়ে পঞ্চম স্থানে থেকে টুর্নামেন্ট শেষ করেছে। ছেলেদের ব্যর্থতার দিনে মেয়েদের এই জয় যেন দেশের ফুটবল ভক্তদের জন্য এক বড় স্বস্তি ও আনন্দের উপলক্ষ হয়ে এসেছে।
প্রথম আসরের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে বাংলাদেশ সাফ নারী ফুটসালে ইতিহাসে নিজেদের নাম খোদাই করল। আউটডোর ফুটবলের ঘাস থেকে ইনডোর ফুটবলের কাঠের মেঝে বা হার্ডকোর্টে খাপ খাইয়ে নেওয়া চ্যালেঞ্জিং ছিল। বাংলাদেশের মেয়েরা যান্ত্রিক ও গতির এই খেলায় নিজেদের দ্রুত মানিয়ে নিয়েছে। নিরপেক্ষ ভেন্যু ব্যাংককে দক্ষিণ এশিয়ার বাকি সব দলকে পেছনে ফেলা বাংলাদেশের ফুটবলের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়। সাবিনা খাতুনের নেতৃত্বে এই শিরোপা জয় বাংলাদেশের নারী ফুটবলের জয়যাত্রা আরও এক ধাপ এগিয়ে দিল।
এই বিজয় কেবল একটি ট্রফি নয়, বরং দেশের হাজারো উদীয়মান নারী ফুটবলারের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা। বাফুফে এবং ক্রীড়া মন্ত্রণালয় যদি এই ফুটসাল দলকে নিয়মিত দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের আওতায় রাখে, তবে এশিয়ান পর্যায়েও বাংলাদেশ বড় চমক দেখাতে সক্ষম হবে।
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন