বিশ্বকাপের আগেই বিশ্বজুড়ে উন্মাদনা, চমক ছড়াচ্ছে গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ

স্পোর্টস ডেস্ক প্রকাশিত: জুন ৬, ২০২৬, ০১:৪৪ পিএম
বিশ্বকাপের আগেই বিশ্বজুড়ে উন্মাদনা, চমক ছড়াচ্ছে গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ
কিলিয়ান এমবাপ্পে, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, লিওনেল মেসি ও নেইমার জুনিয়র। ছবি: আমার সংবাদ কোলাজ

আর মাত্র মাত্র কয়েকটা দিন, তারপরই শুরু হচ্ছে বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ও আকর্ষণীয় আসর ‘ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬’। আগামী ১১ জুন ২০২৬ তারিখে মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক এস্তাদিও অ্যাজটেকায় স্বাগতিক মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যকার উদ্বোধনী ম্যাচের মধ্য দিয়ে পর্দা উঠবে এই মহোৎসবের। 

বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে ১২ জুন দিবাগত রাত ১টায়। এরপর প্রায় ৪০ দিনব্যাপী টানটান উত্তেজনা, গোল-উৎসব আর কোটি কোটি ফুটবল ভক্তের বিনিদ্র রজনী পার করার পর ২০ জুলাই (বাংলাদেশ সময় রাত ১টা) চূড়ান্ত ফাইনালের মধ্য দিয়ে অবসান ঘটবে এই মহাযুদ্ধের।

এবারের বিশ্বকাপ ফুটবল কেবল দল সংখ্যার দিক থেকেই বড় নয়, বরং বিনোদন, আবেগ এবং মাঠ ও মাঠের বাইরের প্রতিদ্বন্দ্বিতার দিক থেকেও এটি পূর্বের সব রেকর্ড ভেঙে চুরমার করতে যাচ্ছে। ফুটবল বিশ্লেষক থেকে শুরু করে সাধারণ দর্শকসবার মতেই, এবারের আসরটি হতে যাচ্ছে ইতিহাসের অন্যতম চমকপ্রদ ও রোমাঞ্চকর এক অধ্যায়।

তারকার মেলা ও শেষ নাচের আবহ

২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা প্রজন্মের ‘লাস্ট ড্যান্স’ বা শেষবারের মতো বিশ্বমঞ্চে জ্বলে ওঠার গল্প। এবারের বিশ্বকাপে ফুটবলপ্রেমীরা দেখতে পাবেন এক অভূতপূর্ব তারকার মেলা। 

লিওনেল মেসি (আর্জেন্টিনা): কাতার বিশ্বকাপে অধরা ট্রফি উঁচিয়ে ধরার পর লিওনেল মেসি এবার নামছেন মুকুট ধরে রাখার লড়াইয়ে। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি আলবিসেলেস্তে ভক্তের চোখ আবারও এই মহাতারকার জাদুকরী বাঁ পায়ের দিকে।

ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো (পর্তুগাল): বয়সের ফ্রেমে যাকে বন্দী করা যায়নি, সেই সিআরসেভেন পর্তুগালকে প্রথম বিশ্বকাপ এনে দেওয়ার শেষ মরিয়া চেষ্টা চালাবেন এই আসরে।

নেইমার জুনিয়র (ব্রাজিল): ইনজুরি আর নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে সেলেসাওদের হেক্সা (ষষ্ঠ) মিশন সফল করতে ব্রাজিলের আক্রমণভাগের মূল ভরসা নেইমার।

কিলিয়ান এমবাপ্পে (ফ্রান্স): বর্তমান ফুটবলের গতিদানব এমবাপ্পে ফরাসিদের আবারও বিশ্বসেরার সিংহাসনে বসাতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।

এই চার দিকপাল ছাড়াও তরুণ তুর্কিদের চমক তো থাকছেই। সব মিলিয়ে মাঠের লড়াইয়ে ফুটবলের যে শৈল্পিক রূপ দেখা যাবে, তা নিশ্চিতভাবেই দর্শকদের বুঁদ করে রাখবে।

পতাকার রঙে রঙিন বিশ্ব, জনমনে ফুটবল জ্বর

ফিফা বিশ্বকাপ এমন এক বৈশ্বিক উৎসব যা কোনো ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে আটকে থাকে না। অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর বাইরেও, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া তথা বাংলাদেশে এই ফুটবল উন্মাদনা রূপ নেয় এক সামাজিক উৎসবে। বিশ্বকাপ ঘনিয়ে আসতেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আকাশ ও ছাদগুলো রঙিন হতে শুরু করেছে বিভিন্ন দেশের পতাকায়।

বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে তাকালেই দেখা যায়, ফুটবলপ্রেমীরা তাদের প্রিয় ‘ফেভারিট’ দলের প্রতি সমর্থন জানাতে বাড়ির ছাদ, ব্যালকনি, রাস্তাঘাট এমনকি গাড়িতেও প্রিয় দেশের পতাকা উড়িয়ে দিচ্ছেন। এই পতাকা ওড়ানোর প্রতিযোগিতা কেবল দলের প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ নয়, এটি এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক লড়াইও বটে, যা পাড়া-মহল্লাকে এক উৎসবমুখর আমেজে রূপান্তর করে।

মাঠের চেয়ে মাঠের বাইরে বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আর্জেন্টিনা বনাম ব্রাজিল

ফুটবল বিশেষজ্ঞরা এবং সাধারণ জনগণ- উভয় পক্ষের মতেই, সারা বিশ্বে ফুটবলার বা দলের সংখ্যা শত শত হলেও, সমর্থনের দিক থেকে সিংহভাগ জুড়েই রয়েছে আর্জেন্টিনা এবং ব্রাজিল। এই দুই পরাশক্তির ভক্তদের সংখ্যা এবং উন্মাদনা অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় আকাশচুম্বী।

মজার বিষয় হলো, খেলার মাঠে রেফারি বাঁশি বাজানোর অনেক আগেই মাঠের বাইরের যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। এবারের বিশ্বকাপেও তার ব্যতিক্রম ঘটছে না। তথ্য ও পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিটা দেশেই আর্জেন্টিনা এবং ব্রাজিলের ভক্তের সংখ্যা প্রায় সমান সমান হলেও, দৃশ্যমানতার দিক থেকে এবার আর্জেন্টিনার আকাশী-সাদা পতাকার আধিক্য কিছুটা বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কাতার বিশ্বকাপের শিরোপা জয় এবং লিওনেল মেসির তুমুল জনপ্রিয়তার কারণে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আর্জেন্টিনার প্রতি এক ধরনের বাড়তি আবেগ কাজ করছে।

তবে ব্রাজিলিয়ান সাম্বা ফুটবলের ভক্তরাও পিছিয়ে নেই। হলুদ-সবুজ পতাকায় ছেয়ে যাচ্ছে চারপাশ। মাঠের ভেতরের লড়াই যদি হয় ৯০ মিনিটের, তবে মাঠের বাইরের এই চায়ের কাপের ঝড়, ট্রল, যুক্তি-পাল্টা যুক্তি আর পতাকার দৈর্ঘ্যের প্রতিযোগিতা চলে মাসজুড়ে। বিশ্লেষকরা রসিকতা করে বলছেন, ২০২৬ বিশ্বকাপে মাঠের চেয়ে খেলার বাইরের প্রতিদ্বন্দ্বিতাই বেশি উপভোগ্য হয়ে উঠেছে।

এক নজরে ২০২৬ বিশ্বকাপের গুরুত্বপূর্ণ সূচি ও তথ্য

পাঠকদের সুবিধার্থে এবারের বিশ্বকাপের মূল আকর্ষণসমূহ ও সময়সূচি সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো। উদ্বোধনী ম্যাচে মুখোমুখি হবে মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকা, যা অনুষ্ঠিত হবে ১২ জুন ২০২৬, বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় (দিবাগত রাত)। উদ্বোধনী ভেন্যু নির্ধারণ করা হয়েছে মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক এস্তাদিও অ্যাজটেকা, যেখানে ম্যাচটি ১১ জুন স্থানীয় সময় অনুযায়ী শুরু হবে। 

পুরো টুর্নামেন্ট জুড়েই দর্শকদের মূল আকর্ষণ হিসেবে থাকবেন লিওনেল মেসি, নেইমার, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও কিলিয়ান এমবাপ্পের মতো তারকাদের দ্বৈরথ। সবশেষে, মহা ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে ২০ জুলাই ২০২৬, বাংলাদেশ সময় রাত ১টায়, যেখানে নির্ধারিত হবে বিশ্বকাপের চূড়ান্ত শিরোপা।

ফুটবল যখন মেলবন্ধনের ভাষা

ফুটবল খেলাকে বলা হয় আন্তর্জাতিক ভাষা। যেখানে রাজনীতির বিভেদ, অর্থনীতির সংকট কিংবা বর্ণবাদের দেয়াল ভেঙে মানুষ এক হয়ে যায়। মেক্সিকোর মাঠে যখন রেফারি কিক-অফের বাঁশি বাজাবেন, তখন পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ টিভি পর্দা, জায়ান্ট স্ক্রিন কিংবা স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বসে একই আবেগে ভাসবেন।

এবারের বিশ্বকাপ নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী। একদিকে যেমন ফেভারিটদের বিদায়ের শঙ্কা থাকে, অন্যদিকে আন্ডারডগ বা ছোট দলগুলোর জায়ান্ট কিলিংয়ের রোমাঞ্চ ফুটবলকে আরও বেশি অনিশ্চিত ও সুন্দর করে তোলে।

পরিশেষে বলা যায়, ১১ জুনের সেই মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য এখন পুরো বিশ্ব চাতক পাখির মতো চেয়ে আছে। মাঠের লড়াইয়ে যেই জিতুক না কেন, মাঠের বাইরের এই অনাবিল আনন্দ, প্রিয় দলের পতাকা ওড়ানোর গর্ব এবং আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের মধ্যকার চিরকালীন ও অমলিন প্রতিদ্বন্দ্বিতাই ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপকে ইতিহাসের পাতায় এক অনন্য ও ইউনিক আসর হিসেবে অমর করে রাখবে।

এএন