তিন দেশের আয়োজনে পর্দা উঠছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ফুটবল মহাযজ্ঞের

স্পোর্টস ডেস্ক প্রকাশিত: জুন ১১, ২০২৬, ০৫:৫০ পিএম
তিন দেশের আয়োজনে পর্দা উঠছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ফুটবল মহাযজ্ঞের

৯৬ বছরের বিশ্বকাপ ইতিহাসে এবারই প্রথম কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সীমাবদ্ধ থাকছে না। তিন আয়োজক দেশের ভিন্ন তিনটি শহরে, ভিন্ন ভিন্ন সময়ে জমকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বরণ করে নেওয়া হচ্ছে ফুটবল বিশ্বকে। মেক্সিকো সিটি, টরন্টো এবং লস অ্যাঞ্জেলেসের এই ত্রিমাত্রিক উদ্বোধনী আয়োজন নিয়ে বিশ্বজুড়ে এখন তুমুল উন্মাদনা।

আজ রাতে মেক্সিকোর ঐতিহ্যবাহী আজতেকা স্টেডিয়ামে উদ্বোধনী ম্যাচের ঠিক ৯০ মিনিট আগে, অর্থাৎ বাংলাদেশ সময় রাত ১১টায় শুরু হচ্ছে প্রথম উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। এই মাঠেই উদ্বোধনী ম্যাচে মুখোমুখি হবে মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকা। এরপর আগামীকাল রাতে কানাডার টরন্টো এবং শনিবার ভোরে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলসে দেখা যাবে বাকি দুটি বর্ণিল আয়োজন।

ভেঙে গেল শতাব্দীর চেনা ঐতিহ্য

ফুটবল বিশ্বকাপের দীর্ঘ ইতিহাসে সাধারণত একটি নির্দিষ্ট আয়োজক দেশ এবং একটি নির্দিষ্ট স্টেডিয়ামকে কেন্দ্র করেই উদ্বোধনী অনুষ্ঠান উদযাপিত হয়ে এসেছে। ২০০২ সালে যখন ইতিহাসে প্রথমবার জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া যৌথভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন করেছিল, তখনও এই নিয়মের ব্যতিক্রম হয়নি। সেবার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়েছিল কেবল দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে। তবে ২০২৬ সালের আসর সেই চেনা ছক সম্পূর্ণ ভেঙে দিয়েছে।

তিনটি দেশের ভৌগোলিক দূরত্ব, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং দর্শকদের উন্মাদনাকে সম্মান জানাতে ফিফা এবার প্রতিটি আয়োজক দেশেই আলাদা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করেছে। যদিও তিনটি শহরের অনুষ্ঠানের সময় আলাদা, তবে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এর ভেতরের মূল সুর ও চেতনা একই সুতোয় গাঁথা।

মেক্সিকো সিটি, ঐতিহ্যের আলো আর শাকিরার জাদু

বিশ্বকাপের প্রথম উৎসবের আলো জ্বলবে মেক্সিকোর 'প্রাসাদের নগরী' হিসেবে পরিচিত মেক্সিকো সিটিতে। আজ বাংলাদেশ সময় রাত ১১টায় ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়ামে ১৬ থেকে ১৭ মিনিটের একটি সংক্ষিপ্ত অথচ চোখধাঁধানো পরিবেশনা দিয়ে শুরু হবে এই মহোৎসব। মেক্সিকোর প্রধানমন্ত্রী ক্লদিয়া শেনবাউম এই দিনটিকে স্মরণীয় করতে দেশটিতে বিশেষ ছুটি ঘোষণা করেছেন, স্কুল-কলেজ বন্ধ রাখার পাশাপাশি সরকারি চাকরিজীবীদের ঘরে বসে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন।

মেক্সিকোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ দেশটির সমৃদ্ধ আদিবাসী সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্য। স্টেডিয়ামজুড়ে প্রদর্শন করা হবে মেক্সিকোর ঐতিহ্যবাহী কাগজের শিল্প ‘পাপেল পিকাডো’। তবে ভক্তদের জন্য সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে থাকছেন ল্যাটিন পপ কুইন শাকিরা। ২০১০ সালের ‘ওয়াকা ওয়াকা’ দিয়ে ফুটবলবিশ্বকে বুদ করে রাখা শাকিরা এবার গাইবেন অফিশিয়াল গান ‘ডাই ডাই’ (লেটস গো)। তাঁর সঙ্গে মঞ্চ মাতাবেন নাইজেরিয়ান সেনসেশন বার্না বয়।

এছাড়াও অফিশিয়াল অ্যালবামের তারকা শিল্পী যেমন আলেহান্দ্রো ফার্নান্দেজ, বেলিন্ডা, জে বালভিন এবং দক্ষিণ আফ্রিকার জনপ্রিয় গায়ক টাইলা মেক্সিকো সিটির দর্শকদের সুরের মায়াজালে ভাসাতে প্রস্তুত।

টরন্টো, কানাডীয় গৌরব ও বাংলাদেশি সংযোগ

মেক্সিকোর রেশ কাটতে না কাটতেই আগামীকাল রাতে উৎসবের ঢেউ আছড়ে পড়বে কানাডায়। টরন্টোর টরন্টো স্টেডিয়ামে স্বাগতিক কানাডা মুখোমুখি হবে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার। এই ম্যাচের আগে বাংলাদেশ সময় রাত ১১টা ৩০ মিনিটে শুরু হবে দ্বিতীয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। প্রায় ১৩ মিনিটের এই আয়োজনে একটি বিশেষ ক্ষণগণনার মাধ্যমে কানাডার ইতিহাস ও গৌরবময় মুহূর্তগুলো ফুটিয়ে তোলা হবে।

টরন্টোর মঞ্চে পারফর্ম করবেন একঝাঁক বিশ্বখ্যাত সংগীতশিল্পী। তালিকায় আছেন অ্যালানিস মরিসেট, আলেসিয়া ক্যারা, মাইকেল বুবলে এবং বলিউডের জনপ্রিয় নৃত্যশিল্পী নোরা ফাতেহি। তবে এই অনুষ্ঠানের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হতে যাচ্ছে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শিল্পী 'সঞ্জয়' । বৈশ্বিক এই মহোৎসবে তাঁর অংশগ্রহণ বাঙালি ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এক অনন্য গর্বের মুহূর্ত তৈরি করেছে।

লস অ্যাঞ্জেলস, হলিউডের শহরে আধুনিকতার ছোঁয়া

তিন দেশের এই উৎসবের সমাপ্তি ঘটবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলস স্টেডিয়ামে। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি দেখতে হলে এশিয়ান অঞ্চলের দর্শকদের শনিবার ভোরে চোখ রাখতে হবে পর্দায়। বাংলাদেশ সময় শনিবার ভোর সাড়ে পাঁচটায় শুরু হবে এই অনুষ্ঠানটি, যার স্থায়িত্ব হবে ১৩ মিনিট। এরপর সকাল সাতটায় প্যারাগুয়ের বিপক্ষে মাঠে নামবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

লস অ্যাঞ্জেলসের অনুষ্ঠানটি সাজানো হয়েছে একদম আধুনিক ধাঁচে। হলিউডের এই শহরে থাকবে বিশাল পরিসরের ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস, থ্রিডি ম্যাপিং এবং আধুনিক গল্পগাথা। এই মঞ্চ কাঁপাতে আসছেন বিশ্বসংগীতের একঝাঁক শীর্ষ তারকা। কেটি পেরি, ফিউচার, অ্যানিত্তা, লিসা, রেমা এবং টাইলার মতো আন্তর্জাতিক সেলিব্রিটিরা লস অ্যাঞ্জেলসের দর্শকদের মাতিয়ে রাখবেন।

তিন শহর, এক সুর, নেপথ্যের কারিগর মার্কো বালিচ

আলাদা তিনটি দেশে ভিন্ন ভিন্ন আবহ ও চরিত্রে এই অনুষ্ঠানগুলো তৈরি করা হলেও, এর পেছনের মূল ভাবনায় রয়েছে একতা। আর এই বিশাল যজ্ঞের পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন বিশ্বখ্যাত অলিম্পিক ও আন্তর্জাতিক ইভেন্ট প্রযোজক মার্কো বালিচ। অলিম্পিকের একাধিক স্মরণীয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের নেপথ্য কারিগর বালিচ এবার ফুটবলকে বেছে নিয়েছেন মানবজাতিকে এক করার মাধ্যম হিসেবে।

বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, বিগ্রহ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝে ফুটবলের যে মানুষকে এক সুতোয় বাঁধার অনন্য ক্ষমতা রয়েছে, সেটিই হবে তিন শহরের অনুষ্ঠানের মূল থিম। আয়োজকদের দাবি, এই ত্রিমাত্রিক উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বিশ্বের কোটি কোটি মানুষকে মনে করিয়ে দেবে যে, সীমানা আলাদা হলেও ফুটবলের আবেগ সবার এক।

বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী উদ্বোধনী অনুষ্ঠানসূচিতে দেখা যাচ্ছে, মেক্সিকো সিটির আজতেকা স্টেডিয়ামে আজ রাত ১১:০০টায় অনুষ্ঠান শুরু হবে। একই ভেন্যুতে মেক্সিকো বনাম দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে রাত ১:০০টায়।

টরন্টো স্টেডিয়ামে আগামীকাল রাত ১১:৩০ মিনিটে দ্বিতীয় দিনের কার্যক্রম শুরু হবে। সেখানে কানাডা বনাম বসনিয়ার মধ্যকার ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে রাত ১:০০টায়।

এছাড়া লস অ্যাঞ্জেলস স্টেডিয়ামে শনিবার ভোর ৫:৩০ মিনিটে দিনের শেষ আয়োজন শুরু হবে। ওই ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্র মুখোমুখি হবে প্যারাগুয়ের, যা সকাল ৭:০০টায় শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

আজ রাত থেকেই শুরু হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও মর্যাদাপূর্ণ এই ক্রীড়া উৎসব। মাঠের লড়াই শুরুর আগে শাকিরার চেনা কণ্ঠ, নোরার নাচ আর হলিউড-বলিউডের সুরের মেলবন্ধন ফুটবলপ্রেমীদের এক নতুন ও অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করতে যাচ্ছে।

এএন