মেক্সিকোতে শাকিরার ঝলক আর প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপ ফুটবলের জমকালো সূচনা 

স্পোর্টস ডেস্ক প্রকাশিত: জুন ১২, ২০২৬, ০৭:০৯ এএম
মেক্সিকোতে শাকিরার ঝলক আর প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপ ফুটবলের জমকালো সূচনা 
বিশ্বখ্যাত সুপারস্টার Shakira মেক্সিকো সিটিতে অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করেন।

মেক্সিকো সিটিতে জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ। ঐতিহাসিক ‘এস্তাদিও আসতেকা’ স্টেডিয়ামে বর্ণিল সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, ঐতিহ্যবাহী নৃত্য এবং বিশ্বখ্যাত সংগীতশিল্পী শাকিরার প্রাণবন্ত পারফরম্যান্স উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। প্রায় চার দশক পর নিজেদের দেশে আবারও বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ আয়োজনের সুযোগ পাওয়ায় মেক্সিকানদের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো।

তবে স্টেডিয়ামের ভেতরে উৎসবমুখর পরিবেশ থাকলেও বাইরে ছিল উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি। বিক্ষোভকারীদের একটি অংশের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। নিরাপত্তা বাহিনী দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এসব ঘটনার মধ্যেও মাঠে দাপট দেখিয়ে স্বাগতিক মেক্সিকো ২-০ গোলে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে টুর্নামেন্টে শুভ সূচনা করেছে।

সংস্কৃতি ও সংগীতের মেলবন্ধনে উদ্বোধনী আয়োজন

অনুষ্ঠানের শুরুতে মেক্সিকোর ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সজ্জিত শিল্পীরা দেশটির সংস্কৃতিকে তুলে ধরে নৃত্য পরিবেশন করেন। এরপর সোনালী পোশাক পরিহিত একদল পারফরমার বিশাল আকৃতির সোনালী ফুটবল নিয়ে মাঠে প্রবেশ করলে পুরো স্টেডিয়াম করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে। গ্যালারিজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে মেক্সিকোর জাতীয় পতাকার সবুজ, সাদা ও লাল রঙের আবহ।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ ছিলেন কলম্বিয়ান তারকা শাকিরা। তার গানে ও নাচে দর্শকরা মেতে ওঠেন। পাশাপাশি মঞ্চে পারফর্ম করেন জে বালভিন, বার্না বয় এবং ড্যানি ওশেন। মেক্সিকোর জনপ্রিয় পপ-পাঙ্ক ব্যান্ড ‘মানা’-র প্রধান গায়ক ফের ওলভেরা যখন ‘ওয়ে মি আমোর’ গান পরিবেশন করেন, তখন প্রায় ৮০ হাজার দর্শক একসঙ্গে কণ্ঠ মেলান।

বিশ্বকাপের অফিসিয়াল অ্যান্থেম ‘ডিএনএ’ পরিবেশন করেন ইতালীয় অপেরা শিল্পী আন্দ্রেয়া বোচেলি ও কে-পপ তারকা ইজে। তাদের পরিবেশনায় ধ্রুপদি ও আধুনিক সংগীতের সমন্বয় দর্শকদের মুগ্ধ করে।

জাতীয় সংগীতে আবেগঘন মুহূর্ত

ম্যাচ শুরুর আগে দুই দেশের জাতীয় সংগীত পরিবেশিত হয়। মেক্সিকোর জাতীয় সংগীত গেয়েছেন দেশটির জনপ্রিয় শিল্পী আলেজান্দ্রো ফার্নান্দেজ। তার সঙ্গে গলা মেলান গ্যালারিতে থাকা হাজারো সমর্থক, যা স্টেডিয়ামে আবেগঘন পরিবেশ তৈরি করে।

অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন গ্র্যামি জয়ী শিল্পী টাইলা। ‘ওয়াটার’ গানের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত এই তরুণ শিল্পী বিশ্বকাপ উপলক্ষে আয়োজিত আরও কয়েকটি অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। এবারের আসরের জন্য ফিফা ১৮টি গানের একটি বিশেষ অ্যালবামও প্রকাশ করেছে।

স্টেডিয়ামের বাইরে সংঘর্ষ, বাড়ানো হয় নিরাপত্তা

৮২ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার স্টেডিয়ামের আশপাশে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। তবুও দুই দফা বিক্ষোভে অংশ নেওয়া কিছু মুখোশধারী ব্যক্তি পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে এবং ভাঙচুর চালায় বলে জানিয়েছে প্রশাসন।

পরিস্থিতির কারণে স্টেডিয়ামের কাছাকাছি কয়েকটি মেট্রো স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।

এদিকে মাদক যুদ্ধের কারণে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য এবং শিক্ষক সংগঠনের প্রতিনিধিরা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করেন। বিশ্বকাপ উপলক্ষে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নজরকে কাজে লাগিয়ে তারা নিজেদের দাবি তুলে ধরার চেষ্টা করেন।

দর্শকদের উচ্ছ্বাসে চাপা পড়ে উত্তেজনা

সব ধরনের অস্থিরতার মধ্যেও ফুটবলপ্রেমীদের আগ্রহে ভাটা পড়েনি। মেক্সিকান সমর্থক হাভিয়ের পেরেজ পরিবার নিয়ে খেলা দেখতে এসেছিলেন। তিনি জানান, বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতা তার জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

তার ভাষায়, পরিবারকে নিয়ে স্টেডিয়ামে বসে বিশ্বকাপ দেখা তার জীবনের অন্যতম আনন্দের মুহূর্ত। তিনি আশা প্রকাশ করেন, মেক্সিকো এই আসরে আরও ভালো ফল করবে এবং অনেক দূর এগিয়ে যাবে।

তিন দেশের যৌথ আয়োজনের নতুন ইতিহাস

২০২৬ বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তিনটি দেশ-মেক্সিকো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ৪৮টি দল নিয়ে আয়োজিত এই আসর আগের যেকোনো বিশ্বকাপের তুলনায় বড় পরিসরে হচ্ছে।

মেক্সিকো উদ্বোধনী ম্যাচ আয়োজনের মাধ্যমে আরেকটি অনন্য রেকর্ড গড়েছে। দেশটি এখন একমাত্র রাষ্ট্র, যারা ১৯৭০, ১৯৮৬ এবং ২০২৬-তিনটি ভিন্ন দশকে বিশ্বকাপ আয়োজনের গৌরব অর্জন করল।

প্রথম ম্যাচে জয় পাওয়ায় স্বাগতিকদের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে অনেকটাই। মাঠের ভেতরের ফুটবল উন্মাদনা এবং মাঠের বাইরের সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতা মিলিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের যাত্রা শুরু হলো এক ব্যতিক্রমী আবহে। আগামী এক মাস বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর নজর থাকবে এই মহাযজ্ঞের দিকে।

এম জি