২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপে অংশ নিতে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর পর ইরান জাতীয় ফুটবল দলকে ঘিরে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। মাঠের খেলার চেয়ে দলের চারপাশের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও সাম্প্রতিক পরিস্থিতিই যেন বেশি মনোযোগ কেড়েছে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে নিজেদের প্রথম ম্যাচের আগে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সেই চিত্রই স্পষ্টভাবে দেখা গেল।
বিশ্বকাপের প্রস্তুতি পর্বে ইরান নানা জটিলতার মুখোমুখি হয়েছে। দেশটির চলমান রাজনৈতিক উত্তেজনা, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন, ভিসা-সংক্রান্ত সমস্যা এবং দলের বেস ক্যাম্প পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলো ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ফলে দলের প্রথম আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনটি ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই সাংবাদিকদের আগ্রহ ছিল তুঙ্গে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত সাংবাদিকেরা একের পর এক প্রশ্ন ছুড়ে দেন রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং বিশ্বকাপ প্রস্তুতিতে এসব ঘটনার প্রভাব নিয়ে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, ফুটবল ম্যাচ, কৌশল কিংবা প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ডকে নিয়ে খুব একটা প্রশ্নই করা হয়নি।
ইরানের প্রধান কোচ আমির গালেনোই শুরু থেকেই রাজনৈতিক বিতর্কে জড়াতে অনাগ্রহ দেখান। তিনি পরিষ্কারভাবে জানান, দলের মূল লক্ষ্য ফুটবল খেলা এবং দেশের প্রতিনিধিত্ব করা। তাঁর ভাষায়, খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফ এখানে কোনো রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার জন্য আসেননি। তারা এসেছেন মাঠে নিজেদের সেরাটা উপহার দিতে এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা ইরানিদের গর্বিত করতে।
কোচ আরও বলেন, ইরানের ভেতরে কিংবা দেশের বাইরে অবস্থানরত সব নাগরিকই তাদের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। ফুটবল দলের দায়িত্ব হলো মানুষের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেওয়া এবং খেলাধুলার মাধ্যমে জাতিকে প্রতিনিধিত্ব করা। রাজনৈতিক বিতর্ক নিয়ে মন্তব্য করা তাদের কাজ নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে লস অ্যাঞ্জেলেসে ইরানের ম্যাচকে কেন্দ্র করে কিছু প্রবাসী ইরানি সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের পরিকল্পনা করছেন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এই প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে গালেনোই সংযত প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, একজন ইরানি হিসেবে তিনি প্রতিটি নাগরিককে সম্মান করেন এবং সকলের মতামত প্রকাশের অধিকার রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে ইরানের অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ড মেহেদি তারেমিও একই ধরনের বক্তব্য দেন। দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় দলের হয়ে খেলা এই তারকা ফুটবলার মনে করেন, ফুটবল এমন একটি মাধ্যম যা বিভাজনের পরিবর্তে মানুষকে কাছাকাছি আনতে পারে। তাঁর মতে, খেলাধুলার আসল সৌন্দর্যই হলো ভিন্ন মত ও ভিন্ন অবস্থানের মানুষকে এক মঞ্চে নিয়ে আসা।
তারেমি বলেন, ইরান বহু শতাব্দীর ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারক একটি জাতি। বিশ্বের যেখানেই ইরানিরা থাকুক না কেন, তাদের মধ্যে এক ধরনের সাংস্কৃতিক বন্ধন রয়েছে। বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে সেই ঐক্যের প্রতিফলন ঘটাতে চান তারা। তিনি আশা প্রকাশ করেন, মাঠে ভালো পারফরম্যান্সের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা ইরানিদের মুখে হাসি ফোটাতে পারবেন।
এ সময় তিনি আরও বলেন, প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব রাজনৈতিক বা সামাজিক মতামত থাকতে পারে এবং সেটিকে সম্মান করা উচিত। তবে জাতীয় দলের খেলোয়াড় হিসেবে তাদের মূল পরিচয় ফুটবলার। তাই তারা রাজনৈতিক বিতর্কে না গিয়ে খেলাধুলার মাধ্যমে ইতিবাচক বার্তা ছড়াতে চান।
সংবাদ সম্মেলনের শেষদিকে এসে তারেমি সাংবাদিকদের উদ্দেশে হালকা রসিকতার সুরে একটি মন্তব্য করেন, যা উপস্থিত অনেকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তিনি বলেন, পুরো সময়জুড়ে কেউ প্রায় ফুটবল নিয়ে প্রশ্নই করেননি। অথচ সামনে নিউজিল্যান্ডের মতো শক্তিশালী ও সংগঠিত দলের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ অপেক্ষা করছে।
ইরানি ফরোয়ার্ডের মতে, বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রতিটি ম্যাচই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তাই তিনি আশা করেছিলেন, সাংবাদিকেরা প্রতিপক্ষের শক্তি, ম্যাচ পরিকল্পনা কিংবা দলের প্রস্তুতি নিয়ে বেশি আগ্রহ দেখাবেন। যদিও বাস্তবে রাজনৈতিক প্রসঙ্গই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।
তারেমি শেষ পর্যন্ত বলেন, তিনি একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও উপভোগ্য ম্যাচের প্রত্যাশা করছেন। পাশাপাশি তিনি মজার ছলে মন্তব্য করেন, যারা রাজনৈতিক খবর সংগ্রহ করতে চান, তাদের হয়তো রাজনৈতিক সংবাদ সম্মেলনেই যাওয়া উচিত।
নিউজিল্যান্ড ম্যাচের আগে ইরানের সংবাদ সম্মেলন ফুটবল বিশ্লেষণের চেয়ে রাজনৈতিক প্রশ্নেই বেশি আলোচিত হয়েছে। তবে কোচ ও খেলোয়াড়দের বক্তব্যে একটি বিষয় পরিষ্কার- তারা বিতর্কের বাইরে থেকে মাঠের খেলায় মনোযোগ দিতে চান এবং বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজেদের ফুটবল দিয়েই পরিচিত হতে আগ্রহী।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন