যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের ডালাস শহরটি হলিউডের বহু টানটান উত্তেজনার থ্রিলার সিনেমার শুটিং স্পট হিসেবে খ্যাত। তবে এবার সেলুলয়েডের রূপালী পর্দা নয়, বরং ডালাস স্টেডিয়ামের সবুজ গালিচায় মঞ্চস্থ হলো এক চরম ফুটবলীয় রোমাঞ্চ। ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের এই হাইভোল্টেজ ম্যাচে ক্রোয়েশিয়াকে ৪-২ ব্যবধানে পরাজিত করে নিজেদের বিশ্বকাপ মিশন রাজকীয়ভাবে শুরু করেছে ইংল্যান্ড। আক্রমণ আর পাল্টা-আক্রমণে ঠাসা এই ম্যাচটি ইতিমধ্যেই ফুটবলপ্রেমীদের মনে প্রশ্ন জাগিয়েছে এটাই কি চলতি বিশ্বকাপের সেরা ম্যাচ? ম্যাচের নায়ক আর কেউ নন, ইংল্যান্ডের অভিজ্ঞ স্ট্রাইকার হ্যারি কেইন, যাঁর জোড়া গোল ক্রোয়াটদের স্বপ্ন চূর্ণ করে দিয়েছে।
নতুন কোচ টমাস টুখেলের অধীনে ইংল্যান্ড দল যেভাবে মাঠে নিজেদের মেলে ধরেছে, তাতে প্রথম ম্যাচ শেষেই ইংলিশ গ্যালারিতে চেনা সুর ধ্বনিত হতে শুরু করেছে—‘ইটস কামিং হোম!’ প্রথমার্ধে ক্রোয়াটদের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর দ্বিতীয়ার্ধে ব্রিটিশদের গতির কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করতে হয় জ্লাতকো দালিচের দলকে।
প্রথমার্ধের নাটকীয়তা: আক্রমণ বনাম পাল্টা আক্রমণ
ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দলই আক্রমণাত্মক ফুটবলের পসরা সাজিয়ে বসে। তবে ম্যাচের শুরুর দিকেই পেনাল্টি পেয়ে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ আসে ইংল্যান্ডের সামনে। এই পেনাল্টির উৎস ছিলেন ক্রোয়েশিয়ার ইতিহাসে অনন্য এক রেকর্ডের মালিক, ৪০ বছর বয়সী চিরসবুজ মিডফিল্ডার লুকা মদরিচ। নিজের ক্যারিয়ারের পঞ্চম বিশ্বকাপ খেলতে নেমে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল করে বসেন তিনি। নিজেদের ডি-বক্সের ভেতর বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে তিনি ইংলিশ ফরোয়ার্ড ননি মাদুয়েকের ঊরুতে লাথি মেরে বসেন। রেফারি কোনো দ্বিধা ছাড়াই পেনাল্টীর বাঁশি বাজান।
১২ মিনিটে পেনাল্টি কিক নিতে আসেন হ্যারি কেইন। প্রথম দফায় কেইনের শট দুর্দান্তভাবে রুখে দেন ক্রোয়াট গোলরক্ষক দমিনিক লিভাকোভিচ। তবে ইংলিশদের সেই উদযাপনের আনন্দ মাটি হয়ে যায় ভিএআর (VAR) প্রযুক্তির হস্তক্ষেপে। রিপ্লেতে দেখা যায়, কেইন শট নেওয়ার আগেই লিভাকোভিচ তাঁর গোললাইন ছেড়ে সামনে এগিয়ে এসেছিলেন। ফলে রেফারি পুনরায় পেনাল্টি নেওয়ার নির্দেশ দেন। দ্বিতীয় সুযোগে আর কোনো ভুল করেননি কেইন। ঠাণ্ডা মাথায় বল জালে জড়িয়ে দলকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে নেন তিনি।
তবে ক্রোয়াটরা দমে যাওয়ার পাত্র ছিল না। গোল হজম করার পর তারা মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করে। ২৪ মিনিট পর, অর্থাৎ ম্যাচের ৩৬ মিনিটে সমতায় ফেরে ক্রোয়েশিয়া। বক্সের বাইরে থেকে এক চোখধাঁধানো কোণাকুনি শটে ইংলিশ গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ডকে পরাস্ত করেন ক্রোয়াট মিডফিল্ডার মার্তিন বাতুরিনা। ১-১ সমতায় ম্যাচ তখন আরও জমজমাট।
বিরতিতে যাওয়ার ঠিক ৩ মিনিট আগে আবারও দৃশ্যপটে হ্যারি কেইন। ডেকলান রাইসের চমৎকার কর্নার কিক থেকে উড়ে আসা বলে দারুণ এক হেডে গোল করেন কেইন। ক্রোয়েশিয়ার রক্ষণভাগের ডিফেন্ডারদের চোখ ফাঁকি দিয়ে কেইনের মতো একজন বিশ্বমানের হেডার কীভাবে বক্সে সম্পূর্ণ অরক্ষিত (আনমার্কড) রয়ে গেলেন, তা নিয়ে ধারাভাষ্যকারদেরও বিস্ময়ের সীমা ছিল না। এই গোলের মাধ্যমে ইংল্যান্ড ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায়।
কিন্তু প্রথমার্ধের নাটকীয়তা সেখানেই শেষ হয়নি। বিরতির ঠিক আগ মুহূর্তে, প্রথমার্ধের ইনজুরি টাইমের (৪৫+৫ মিনিট) শেষ মুহূর্তে আবারও সমতায় ফেরে ক্রোয়েশিয়া। বক্সের ভেতর উড়ে আসা একটি বল হেডের মাধ্যমে সামনে বাড়িয়ে দেন ইভান পেরিসিচ। আর সেই চলন্ত বলেই দুর্দান্ত এক শটে বল জালে জড়ান ক্রোয়াট ফরোয়ার্ড পেতার মুসা। ফলে ২-২ গোলের সমতা নিয়ে বিরতিতে যায় দু-দল।
কেইনের রেকর্ড ও ইতিহাসের পাতায় নাম লেখানো
ডালাসের এই ম্যাচটি হ্যারি কেইনের জন্য ছিল রেকর্ড ভাঙা-গড়ার এক রাত। এই ম্যাচে টাইব্রেকার বাদে মূল সময়ের পেনাল্টি থেকে গোল করার মাধ্যমে কেইন বিশ্বকাপে পেনাল্টি থেকে সবচেয়ে বেশি গোলের নতুন বিশ্বরেকর্ড গড়েন। বিশ্বকাপে পেনাল্টি থেকে এটি ছিল তাঁর ৫ম গোল। এই কীর্তির মাধ্যমে তিনি ফুটবল ইতিহাসের চার মহানায়ক লিওনেল মেসি, ইউসেবিও, রব রেনসেনব্রিঙ্ক এবং গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতাকে ছাড়িয়ে যান, যাদের প্রত্যেকের বিশ্বকাপে পেনাল্টি গোল সংখ্যা ৪টি করে।
শুধু তাই নয়, প্রথমার্ধে নিজের দ্বিতীয় গোলটির মাধ্যমে কেইন ইংল্যান্ডের ফুটবল ইতিহাসের আরেক কিংবদন্তি গ্যারি লিনেকারের পাশে বসেন। বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের হয়ে সর্বোচ্চ গোলের তালিকায় এখন লিনেকার ও কেইন যৌথভাবে শীর্ষে। বিশ্বকাপে মাত্র ১২টি ম্যাচ খেলে দুজনেরই গোল সংখ্যা এখন ১০টি করে। বায়ার্ন মিউনিখের এই স্ট্রাইকার যে এখনও ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় ভরসার প্রতীক, তা তিনি আরও একবার প্রমাণ করলেন।
দ্বিতীয়ার্ধে বেলিংহামের ম্যাজিক ও থ্রি লায়ন্সের আধিপত্য
বিরতি থেকে ফিরে ম্যাচটি সম্পূর্ণ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয় ইংল্যান্ড। ক্রোয়াটদের ক্লান্তির সুযোগ নিয়ে গতি ও বল নিয়ন্ত্রণে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন জুড বেলিংহাম ও ননি মাদুয়েকেরা।
বিরতির পর খেলা শুরু হতে না হতেই (৪৭ মিনিটে) রিয়াল মাদ্রিদ তারকা জুড বেলিংহামের এক জাদুকরী মুহূর্ত প্রত্যক্ষ করে স্টেডিয়ামের দর্শকেরা। ডান প্রান্ত দিয়ে বল কেড়ে নিয়ে যেন বিলাসবহুল ‘অ্যাস্টন মার্টিন’ গাড়ির গতিতে ক্রোয়াট ডিফেন্ডারদের পরাস্ত করে বক্সে ঢোকেন বেলিংহাম। এরপর এক অসাধারণ কোণাকুনি শটে লিভাকোভিচকে পরাস্ত করে স্কোরলাইন ৩-২ করেন তিনি। বেলিংহামের এই গোলটি ম্যাচের ভাগ্য ইংল্যান্ডের দিকে ঝুঁকিয়ে দেয়।
জুড বেলিংহামের গতি ও ফুটবলীয় বুদ্ধিমত্তা দ্বিতীয়ার্ধে ক্রোয়েশিয়াকে ম্যাচ থেকে সম্পূর্ণ ছিটকে দেয়। ক্রোয়াটদের রক্ষণভাগ তাঁর গতি সামলাতে রীতিমতো হিমশিম খেয়েছে।
ম্যাচ শেষ হওয়ার ৫ মিনিট আগে, অর্থাৎ ৮৫ মিনিটে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে নামা ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড স্ট্রাইকার মার্কাস রাশফোর্ড ম্যাচের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠোকেন। বক্সে জটলার ভেতর থেকে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে স্কোরলাইন 4-2 করেন তিনি। এরপর আর ক্রোয়েশিয়ার পক্ষে ম্যাচে ফেরা সম্ভব হয়নি।
দুই গোলরক্ষকের বীরত্বগাথা
স্কোরলাইন ৪-২ হলেও ম্যাচে আরও গোলের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। দুই দলের গোলরক্ষক যদি প্রাচীর হয়ে না দাঁড়াতেন, তবে গোলের সংখ্যা আরও বাড়তে পারত। পুরো ম্যাচে ইংল্যান্ড মোট ২২টি শট নেয়, যার মধ্যে ১১টিই ছিল অন-টার্গেট। ক্রোয়েশিয়ার গোলরক্ষক দমিনিক লিভাকোভিচ পেনাল্টি ঠেকাতে না পারলেও ম্যাচে অবিশ্বাস্য ৭টি সেভ করেন।
অন্যদিকে, জর্ডান পিকফোর্ডও কম যাননি। তিনি ৩টি নিশ্চিত গোল বাঁচিয়ে দেন। বিশেষ করে ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে খুব কাছ থেকে নেওয়া ক্রোয়েশিয়ার একটি নিশ্চিত গোলের শট যেভাবে তিনি প্রতিহত করেন, তা ছিল দেখার মতো।
ম্যাচ শেষে অধিনায়ক কেইনের প্রতিক্রিয়া ও কোচের রণকৌশল
ম্যাচ জয়ের পর ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইন দলের পারফরম্যান্স এবং বিরতির সময় ড্রেসিংরুমের পরিবেশ নিয়ে কথা বলেন। কেইন স্বীকার করেন যে প্রথমার্ধে দুবার এগিয়ে গিয়েও গোল হজম করাটা দলের জন্য হতাশাজনক ছিল।
তিনি বলেন, ম্যাচটি আসলে দুই অর্ধে দুটি ভিন্ন রূপ নিয়েছিল। প্রথম অর্ধে আমরা ভালো খেললেও যেভাবে গোলগুলো খেয়েছি, তা আমাদের হতাশ করেছিল। মনে হচ্ছিল আমরা কিছুটা মনোযোগ হারিয়ে ফেলছি।
দ্বিতীয়ার্ধে দলের ঘুরে দাঁড়ানোর পুরো কৃতিত্ব কেইন দিয়েছেন নতুন কোচ টমাস টুখেলকে। কেইন প্রকাশ করেন, বিরতির সময় কোচ আমাদের ড্রেসিংরুমে এক দারুণ অনুপ্রেরণাদায়ী বক্তব্য দেন। তিনি আমাদের বলেছিলেন, যদি আমাদের এই ম্যাচ হারতেও হয়, তবে যেন নিজেদের চেনা স্বাভাবিক ও আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে হারি, কোনো জড়তা না রেখে। কোচের সেই কথাই আমাদের তাতিয়ে দিয়েছিল। দ্বিতীয়ার্ধে আমরা আমাদের পুরো শক্তি নিয়ে মাঠে নেমেছিলাম এবং আমাদের সেই তীব্র গতির সাথে ক্রোয়েশিয়া আর পেরে ওঠেনি।
তথ্যগত ধারাবাহিকতা বজায় রেখে মূল নিউজের পরিসংখ্যানের টেবিলটিকে হুবহু প্যারা আকারে নিচে তুলে ধরা হলো:
ডালাসের এই হাইভোল্টেজ লড়াইয়ে ইংল্যান্ড মোট শট নিয়েছিল ২২টি, যার বিপরীতে ক্রোয়েশিয়া শট নেয় ১০টি। এর মধ্যে ইংলিশদের অন-টার্গেট বা গোলপোস্টের লক্ষ্যে শট ছিল ১১টি, যেখানে ক্রোয়াটদের অন-টার্গেট শট ছিল ৫টি। আক্রমণাত্মক এই ম্যাচের স্কোরবোর্ডে ইংল্যান্ডের গোল সংখ্যা ছিল ৪টি এবং ক্রোয়েশিয়ার গোল সংখ্যা ছিল ২টি। অন্যদিকে, গোলরক্ষকদের সেভের ক্ষেত্রে ইংল্যান্ডের জর্ডান পিকফোর্ড ৩টি নিশ্চিত গোল প্রতিহত করেন এবং ক্রোয়েশিয়ার দমিনিক লিভাকোভিচ করেন ৭টি অবিশ্বাস্য সেভ।
ক্রোয়াটদের বিমর্ষ মুখ ও ইংল্যান্ডের উড্ডয়ন
লড়াই করেও শেষ পর্যন্ত হারের গ্লানি নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয় লুকা মদরিচ, ইভান পেরিসিচদের। ম্যাচ শেষে ক্রোয়াট শিবিরের বিমর্ষ মুখগুলোই বলে দিচ্ছিল, ইংল্যান্ডের গতির সামনে তাদের রণকৌশল কতটা ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে মাঝমাঠে বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে না পারা এবং ডিফেন্সের দুর্বলতার কারণেই বড় ব্যবধানে হারতে হলো গতবারের সেমিফাইনালিস্টদের।
অন্যদিকে, গতি, নিখুঁত পাসিং এবং আক্রমণভাগের দুর্দান্ত সমন্বয়ে ইংল্যান্ড বুঝিয়ে দিল, টমাস টুখেলের অধীনে তারা এবার বিশ্বজয়ের অন্যতম শক্ত দাবিদার। ডালাসের এই রোমাঞ্চকর জয় নিশ্চিতভাবেই পুরো টুর্নামেন্টে থ্রি লায়ন্সদের আত্মবিশ্বাস বহু গুণ বাড়িয়ে দেবে।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন