বিশ্বকাপ মাতানো আর্লিং হালান্ডের অজানা গল্প

স্পোর্টস ডেস্ক প্রকাশিত: জুলাই ৬, ২০২৬, ০৮:৫৮ পিএম
বিশ্বকাপ মাতানো আর্লিং হালান্ডের অজানা গল্প

বিশ্বজুড়ে এখন একটাই উন্মাদনা-ফুটবল বিশ্বকাপ। আপামর ফুটবলপ্রেমীদের মুখে মুখে যখন প্রিয় দল আর তারকাদের গল্প, ঠিক তখনই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন নরওয়েজিয়ান স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ড। বিশ্ব ফুটবলে হালান্ড ও তাঁর বাবা আলফইঞ্জের গল্পটি অন্যতম নাটকীয় এক অধ্যায়। এটি একই সাথে ক্যারিয়ার ধ্বংসের এক নির্মম ট্র্যাজেডি এবং মাঠের ভেতরে ফুটবলীয় শ্রেষ্ঠত্বের এক মধুর প্রতিশোধের মহাকাব্য।

এই গল্পের শুরু আর্লিং হালান্ডের বাবা আলফইঞ্জ হালান্ডকে দিয়ে, যিনি নিজেও ছিলেন একজন লড়াকু পেশাদার ফুটবলার। প্রিমিয়ার লিগে নটিংহ্যাম ফরেস্ট, লিডস ইউনাইটেড এবং ম্যানচেস্টার সিটির মতো নামী ক্লাবের রক্ষণভাগ ও মিডফিল্ডে খেলা আলফইঞ্জ নরওয়ে জাতীয় দলের হয়েও ৩৪টি ম্যাচ খেলেছিলেন।

তবে তাঁর এই সুন্দর ক্যারিয়ারে কালো মেঘ হয়ে দেখা দেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কিংবদন্তি অধিনায়ক রয় কিন। ১৯৯৭ সালের সেপ্টেম্বরে লিডস ইউনাইটেডের হয়ে খেলার সময় আলফইঞ্জের সঙ্গে রয় কিনের মাঠের এক সংঘর্ষ হয়। বল দখলের লড়াইয়ে রয় কিন আলফইঞ্জকে ফাউল করতে গিয়ে নিজেই হাঁটুতে মারাত্মক চোট পান। আলফইঞ্জ ভেবেছিলেন রয় কিন ফাউল থেকে বাঁচতে অভিনয় করছেন। তিনি কিনের ওপর ঝুঁকে চিৎকার করে বলেন, “ভণ্ডামি বন্ধ করো, ভং না ধরে উঠে দাঁড়াও!” 

সেই ইনজুরির কারণে রয় কিনকে প্রায় এক বছর মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছিল। আলফইঞ্জের সেই চিৎকারকে কিন ব্যক্তিগত অপমান হিসেবে নেন এবং প্রতিশোধের জন্য মনে মনে ফুঁসতে থাকেন।

ঠিক এর চার বছর পর, ২০০১ সালের এপ্রিলে আসে সেই ভয়াবহ দিন। আলফইঞ্জে ততদিনে ম্যানচেস্টার সিটির অধিনায়ক। ওল্ড ট্রাফোর্ডে ম্যানচেস্টার ডার্বি ম্যাচ চলাকালীন ম্যাচের ৮৬ মিনিটে রয় কিন তাঁর সেই সুযোগ পেয়ে যান। বলের দিকে কোনো নজর না দিয়ে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে আলফইঞ্জের ডান হাঁটুতে বুট দিয়ে সরাসরি একটি হিংস্র ট্যাকল করেন। আলফইঞ্জে বাতাসে উড়ে গিয়ে মাঠে আছড়ে পড়েন এবং রয় কিনকে সঙ্গে সঙ্গে লাল কার্ড দেখানো হয়।

মাঠ ছাড়ার আগে রয় কিন মাটিতে পড়ে থাকা আলফইঞ্জের দিকে ঝুঁকে ঠিক চার বছর আগের সেই কথার প্রতিশোধ নিয়ে কিছু একটা বলে যান। পরে কিন তাঁর আত্মজীবনীতে স্বীকারও করেছিলেন, তিনি ইচ্ছাকৃতভাবেই আলফইঞ্জকে আঘাত করতে চেয়েছিলেন। এই ফাউলের পর আলফইঞ্জে আর কখনোই আগের মতো করে ফুটবল খেলতে পারেননি। ফলশ্রুতিতে, মাত্র ৩০ বছর বয়সে ২০০৩ সালে আলফইঞ্জেকে ফুটবল থেকে চিরতরে অবসর নিতে হয়।

আলফইঞ্জের ফুটবল ক্যারিয়ার রয় কিনের কারণে অকালে শেষ হয়ে গেলেও, নিয়তি হয়তো পর্দার আড়ালে অন্য একটি চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিল। বাবার অবসরের সময় ছোট আর্লিংয়ের বয়স ছিল মাত্র ৩ বছর। মাঠ থেকে ছিটকে পড়া বাবা ঘরে বসেই গড়ে তোলেন এক ভবিষ্যৎ বিশ্বসেরা স্ট্রাইকারকে। তবে আর্লিং হালান্ডের প্রতিশোধের ধরনটি কোনো মারামারি বা হিংস্রতার ছিল না, সেটি ছিল নিখাদ ফুটবলীয় শ্রেষ্ঠত্বের।

২০২২ সালে আর্লিং হালান্ড তাঁর বাবার সাবেক ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দেন- যে ক্লাবের জার্সি গায়ে খেলার সময় তাঁর বাবার ক্যারিয়ার ধ্বংস করা হয়েছিল। এরপর বাবার শত্রু ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে মাঠে নেমে হালান্ড একের পর এক গোল উৎসব শুরু করেন। নিজের প্রথম ম্যানচেস্টার ডার্বিতেই তিনি দুর্দান্ত এক হ্যাটট্রিক করে সিটিকে ৬-৩ ব্যবধানে জেতান। ওল্ড ট্রাফোর্ডে গিয়েও ইউনাইটেডকে একাই ধসিয়ে দেন তিনি। এখানেই শেষ নয়, ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে নিজের প্রথম মৌসুমেই হালান্ড উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, প্রিমিয়ার লিগ এবং এফএ কাপ (ট্রেবল) জেতেন- যা একসময় রয় কিনের ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সবচেয়ে বড় অহংকার ছিল।

আজ আলফইঞ্জে হালান্ড গ্যালারিতে বসে তৃপ্তির হাসি নিয়ে দেখেন, কীভাবে তাঁর নিজের রক্ত সেই ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের রক্ষণভাগকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করছে। ফুটবল মাঠে রয় কিন আলফইঞ্জেকে শারীরিকভাবে আঘাত করে তাঁর ক্যারিয়ার শেষ করেছিলেন, আর আলফইঞ্জের ছেলে আর্লিং হালান্ড গোলবন্যা বইয়ে দিয়ে, ট্রফি জিতে এবং ফুটবল বিশ্বের রাজমুকুট মাথায় পরে সেই অন্যায়ের সবচেয়ে সুন্দর ও ঐতিহাসিক প্রতিশোধ নিয়েছেন।

জেএইচআর