চলমান ফুটবল বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের শুরুতেই জন্ম নিল এক মহাবিতর্কের। রাউন্ড অব সিক্সটিনের ম্যাচে শক্তিশালী আর্জেন্টিনার বিপক্ষে রেফারির বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে ফুটবল বিশ্বে এখন তোলপাড় চলছে। মাঠের লড়াইয়ে ২-০ গোলে এগিয়ে থাকা মিশর শেষ পর্যন্ত ৩-২ ব্যবধানে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিলেও, আলোচনা থেকে সরছে না ম্যাচটি। উল্টো রেফারিংয়ের কড়া সমালোচনা করে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা দিয়েছে মিশরীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (ইএফএ)।
এদিকে ক্রীড়াঙ্গনের এই বিতর্ক এবার রূপ নিয়েছে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনেও। মিশরের সঙ্গে অবিচার করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি। তিনি প্রকাশ্যেই দাবি করেছেন, মিশরকে এই ম্যাচে রীতিমতো ‘ডাকাতি’ করে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আটলান্টার সেই নাটকীয় রাত ও বিতর্কের সূত্রপাত
গত মঙ্গলবার (৭ জুলাই) রাতে যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টার স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা ও মিশর। নকআউট পর্বের এই ম্যাচে প্রথমার্ধ থেকেই দারুণ আধিপত্য বিস্তার করে খেলতে থাকে আফ্রিকান পরাশক্তি মিশর। ম্যাচের ৭৯ মিনিট পর্যন্ত আলবিসেলেস্তেদের চেপে ধরে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল তারা। কিন্তু ম্যাচের শেষভাগের নাটকীয়তায় পুরো দৃশ্যপট বদলে যায়। শেষ মুহূর্তের ঝড়ে ৩-২ ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে নিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট কাটে আর্জেন্টিনা।
আর্জেন্টিনা জয়ের উল্লাসে মাতলেও, ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার পরপরই শুরু হয় তীব্র সমালোচনা। মিশরের অভিযোগ, ম্যাচের প্রতিটি বাঁশি এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো গিয়েছে আর্জেন্টিনার পক্ষে, যা সরাসরি খেলার ফল নির্ধারণে প্রভাব ফেলেছে।
কাঠগড়ায় ভিএআর (VAR) ও ফরাসি রেফারি
ম্যাচে রেফারিংয়ের বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে ফুটবল বোদ্ধা ও ধারাভাষ্যকারদের মধ্যেও বিস্ময় তৈরি হয়েছে। ম্যাচের একটি পর্যায়ে মিশর যখন চালকের আসনে, তখন ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর)-এর একটি বিতর্কিত রিভিউয়ের কারণে মিশরের মোস্তফা জিকোর একটি নিশ্চিত গোল বাতিল করে দেওয়া হয়। গোলটি বৈধ হলে মিশর ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে যেতে পারত, যা ম্যাচের ভাগ্য ওখানেই নির্ধারণ করে দিত।
ভিএআরের এমন প্রশ্নবিদ্ধ ব্যবহার দেখে ফক্স স্পোর্টসের খ্যাতনামা ধারাভাষ্যকার ড্যারেন ফ্লেচার লাইভ সম্প্রচারেই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ভিএআর (VAR) এখন আমার জীবনের অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ম্যাচ শেষে ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন মিশরের প্রধান কোচ হোসাম হাসান। সংবাদ সম্মেলনে নিজের হতাশা ও রাগ লুকিয়ে রাখেননি তিনি।
হোসাম হাসান বলেন, এই ম্যাচে আমরা কোনো সম্মান বা ফেয়ার প্লে (Fair Play) দেখতে পাইনি। আমাদের একটি পেনাল্টি বাতিল করা হয়েছে। আরেকটি পরিষ্কার ফাউলের ঘটনায় আমাদের পেনাল্টি পাওয়া উচিত ছিল, কিন্তু রেফারিরা ভিএআরে সেটি দেখার প্রয়োজনই মনে করেননি। কোন যুক্তিতে আমাদের দ্বিতীয় গোলটি বাতিল করা হলো, তা এখনো রহস্য। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল, রেফারির ওপর আর্জেন্টিনার মতো বড় দলের একটা অদৃশ্য চাপ কাজ করছিল এবং সেই চাপের কারণেই আজ আমাদের বিদায় নিতে হলো।
ফিফার কাছে মিশরের কড়া নালিশ ও দাবি
ম্যাচের পর হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি মিশরীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (ইএফএ)। রেফারি ফ্রাসোয়া লেতেজিয়ের-এর পক্ষপাতমূলক আচরণের বিরুদ্ধে ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেছে তারা।
তাদের আপিলের মূল আপত্তিসমূহ হলো:
- গোল বাতিল: ভিএআর প্রযুক্তির ভুল ও অসঙ্গত ব্যবহারের মাধ্যমে মোস্তফা জিকোর বৈধ গোল বাতিল করা।
- পেনাল্টি প্রত্যাখ্যান: ম্যাচের অন্তিম মুহূর্তে ডি-বক্সের ভেতর মিশরের মহাতারকা মোহাম্মদ সালাহকে ফাউল করা হলেও পেনাল্টির আবেদন নাকচ করে দেওয়া।
- কার্ড প্রদর্শনে বৈষম্য: ম্যাচে মিশরের পাঁচজন খেলোয়াড়কে হলুদ কার্ড দেখানো হলেও, একই ধরনের ফাউল করে আর্জেন্টিনার কোনো খেলোয়াড় একটি কার্ডও পাননি।
ইএফএ কেবল তদন্তের দাবিই জানায়নি, বরং ফরাসি রেফারি ফ্রাসোয়া লেতেজিয়ের এবং তার পুরো অফিশিয়েটিং প্যানেলকে বিশ্বকাপের বাকি ম্যাচগুলো থেকে অবিলম্বে বহিষ্কার বা অব্যাহতি দেওয়ার জোরালো দাবি তুলেছে। তবে এই স্পর্শকাতর বিষয়ে ফিফা এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি দেয়নি।
রাজনৈতিক মঞ্চে বিশ্বকাপের আঁচ, নিউইয়র্ক মেয়রের মন্তব্য
ক্রীড়াঙ্গনের এই বিতর্ক এবার মাঠের বাইরে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন আলোচনায় স্থান করে নিয়েছে। গত বুধবার (৮ জুলাই) নিউইয়র্কে ‘নেক্সট স্টপ, বেটার বাসেস, ফাস্টার সার্ভিস’ নামক একটি গণপরিবহন উন্নয়ন কর্মসূচির ঘোষণা দিতে এসে এই প্রসঙ্গটি টেনে আনেন নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি।
জনগণের সময় বাঁচানোর গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে তিনি অত্যন্ত চতুর ও রসাত্মকভাবে ফুটবলের এই বিতর্ককে উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করেন।
মেয়র মামদানি বলেন, নতুন এবং দ্রুতগতির এই বাসসেবা চালুর ফলে আগামী ছয় মাসে আপনাদের অন্তত ২৪ ঘণ্টা সময় বাঁচবে। এই বেঁচে যাওয়া সময়ে আপনারা পরিবারের সঙ্গে সকালের নাশতা করতে পারবেন, সন্তানের খেলাধুলা দেখতে যেতে পারবেন। আর বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় বসে অন্তত এই বিষয়ে একমত হতে পারবেন যে- গতকাল রাতে মিশরকে আক্ষরিক অর্থেই ছিনতাই (ছিনতাই করে হারানো) করা হয়েছে। সবকিছুর ঊর্ধ্বে, এই প্রকল্প নিউইয়র্কবাসীকে তাদের মূল্যবান সময় ফিরিয়ে দেবে।
মেয়র মামদানির এই মন্তব্যের পর উপস্থিত সাধারণ জনতার মাঝে হাসির রোল পড়ে এবং অনেকেই করতালি দিয়ে তার এই বক্তব্যকে সমর্থন জানান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও মেয়রের এই বক্তব্য ভাইরাল হয়েছে। সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের একাংশের ধারণা, আর্জেন্টিনার অন্ধ সমর্থক ছাড়া বাকি ফুটবল বিশ্ব এখন মিশরের প্রতি হওয়া এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার।
ফিফা এখন এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে কী ব্যবস্থা নেয় এবং আগামী ম্যাচগুলোতে রেফারিংয়ের মান নিয়ে বিতর্কের অবসান ঘটে কিনা- সেটাই এখন দেখার বিষয়।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন