চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপে মাঠের ভেতরে ও বাইরে একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্তে টালমাটাল ফুটবল বিশ্ব। এর মধ্যেই ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনা। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সুপারিশে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগুনের লাল কার্ডের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর যখন ফুটবল বিশ্বে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে, তখনই সামনে এলো এক বিস্ফোরক তথ্য।
যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০২৭ সালের ফিফা নির্বাচনে ইনফান্তিনোকে গোপনে জেতানোর জন্য একটি সুদূরপ্রসারী ছক কষে রেখেছিল ইংল্যান্ডের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এফএ)।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বকাপে সততা ও নৈতিকতার এই সংকট তৈরি হওয়ার আগেই ইনফান্তিনোকে পুনরায় ফিফার সিংহাসনে টিকিয়ে রাখার পরিকল্পনা করেছিল এফএ। জানা গেছে, ২০২৭ সালের নির্বাচনে ইনফান্তিনোর প্রার্থিতাকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন জানাতে ফুটবল বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোকে বেশ গোপনে ও সতর্কতার সাথে অনুরোধ করেছিল ফিফা।
টেলিগ্রাফ সূত্রের বরাতে জানায়, ইংল্যান্ডের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ফিফার এই অনুরোধে সম্মতি জানায় এবং বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার পরপরই ইনফান্তিনোর পক্ষে একটি আনুষ্ঠানিক সমর্থনপত্র পাঠানোর সব প্রস্তুতিও সম্পন্ন করে রেখেছিল। তবে ফিফা প্রেসিডেন্ট ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যকার গোপন আঁতাত নিয়ে চলমান ব্যাপক বিতর্কের মাঝে, ওই সমর্থনপত্রটি আদৌ পাঠানো হয়েছে কি না তা টেলিগ্রাফ স্পোর্টের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হলে এফএ মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
ইনফান্তিনো ইস্যুতে জনসমক্ষে পুরোপুরি নীরবতা বজায় রাখায় চলতি সপ্তাহে বেশ অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়েছে এফএ। এফএ-র সাবেক চেয়ারম্যান ডেভিড বার্নস্টেইনসহ ব্রিটিশ সরকারের একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব সাফ জানিয়েছেন, ইনফান্তিনোর এখনই পদত্যাগ করা উচিত। তবে ইনফান্তিনোকে চটিয়ে হাতছাড়া করতে চাইছে না এফএ, কারণ এর পেছনে তাদের বড় স্বার্থ লুকিয়ে আছে। আগামী নভেম্বরেই ২০৩১ নারী বিশ্বকাপের আয়োজক হিসেবে ইংল্যান্ডের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর বাইরে ভবিষ্যতে পুরুষ বিশ্বকাপের আয়োজক হওয়ার লড়াইয়ে নামার একটা সম্ভাবনাও তাদের রয়েছে, যেখানে ইনফান্তিনোর সমর্থন পাওয়াটা এফএ-র জন্য অত্যন্ত জরুরি।
ইনফান্তিনো দীর্ঘ ১০ বছর ধরে ফিফার প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে আছেন এবং আগামী বছরের নির্বাচনে তাঁর পুনর্নির্বাচিত হওয়াটা দীর্ঘদিন ধরেই একরকম নিশ্চিত বলেই ধরে নেওয়া হচ্ছে। এর আগে ২০১৯ এবং ২০২৩ সালের নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হওয়া এই ফুটবল কর্তার বিরুদ্ধে ২০২৭ সালের নির্বাচনে কেউ আদৌ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে কি না, তা নিয়েই তীব্র সংশয় রয়েছে। এর মূল কারণ, তাঁর নেওয়া 'ফিফা ফরোয়ার্ড' কর্মসূচির আওতায় বিশ্বজুড়ে অসংখ্য ফুটবল প্রজেক্টে বিপুল তহবিল দেওয়া হয়েছে। ফলে তাঁর মেয়াদে সিংহভাগ জাতীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের-যারা মূলত তাঁর ভোটার-আয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
ফিফার অধীনে মোট ২১১টি সদস্য দেশ রয়েছে, যার প্রতিটি দেশেরই প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে একটি করে ভোট দেওয়ার অধিকার আছে। নির্বাচনে জয়ী হতে প্রয়োজন ১০৬টি ভোট। ইতিমধ্যেই গত এপ্রিলে দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবল কনফেডারেশন (কনমেবল) ঘোষণা দিয়েছে যে, তাদের ১০টি দেশ ইনফান্তিনোকেই সমর্থন করবে।
এছাড়া সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশন (ক্যাফ) তাদের ৫৪টি সদস্য দেশ এবং এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) তাদের ৪৭টি দেশের পক্ষ থেকে ইনফান্তিনোকে সর্বসম্মত সমর্থনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ইংল্যান্ডের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এফএ) সমর্থন ছাড়াই ইনফান্তিনোর ঝুলিতে ইতিমধ্যে ১১১টি ভোট রয়েছে। তা সত্ত্বেও, গত মঙ্গলবার ইউরোপীয় ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্তা সংস্থা ইউয়েফা নতুন এক যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি করেছে। মার্কিন স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগুনের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্তকে ‘নজিরবিহীন, অবিশ্বাস্য এবং সম্পূর্ণ অন্যায্য’ আখ্যা দিয়ে ইউয়েফা সাফ জানিয়েছে, ফিফা এবার ‘সব সীমানা বা রেড লাইন পার করে গেছে।’
এই বিতর্ক আরও উসকে যায় যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই বড়াই করে বলেন যে, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে ম্যাচে বালোগুনের লাল কার্ডের সিদ্ধান্তটি বাতিল করার জন্য তিনি ইনফান্তিনোকে ব্যক্তিগতভাবে সুপারিশ করেছিলেন। ইউয়েফা, জার্মানি এবং বেলজিয়াম এই পরিস্থিতির তীব্র নিন্দা জানালেও ইনফান্তিনো তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে এফএ-র সঙ্গে তাঁর আপাত মধুর সম্পর্ককে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন। শেষ ষোলোর ম্যাচে মেক্সিকোর বিপক্ষে ৩-২ গোলের জয়ের পর, তিনি এফএ চেয়ারপারসন ডেবি হিউইটের সাথে নিজের একটি ছবি পোস্ট করেন; যেখানে হিউইট তাঁকে পিঠে ‘Infantino 9’ লেখা একটি ইংল্যান্ডের জার্সি উপহার দিচ্ছিলেন।
অবশ্য শেষ পর্যন্ত বেলজিয়ামের কাছে হেরে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যাওয়ায় এক চরম দুঃস্বপ্ন থেকে বেঁচে গেছেন ইনফান্তিনো। তবে ট্রাম্পের হস্তক্ষেপে ফিফা কর্তৃক বালোগানের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের এই ঘটনা ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে ফুটবল বিশ্বে প্রথম বড় ধরনের বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন