স্বাধীনতার মূল্যবোধ ও চেতনা

জাতির পিতা আমাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন, কিন্তু অর্থনৈতিক মুক্তি দিয়ে যেতে পারেননি। কায়েমি স্বার্থবাদী ও স্বাধীনতার শত্রুরা, বেইমান মীরজাফররা তাকে হত্যা করেছে। জাতির পিতার রক্তের ঋণ শোধ করতে হবে। স্বাধীনতাকে অর্থবহ করতে হবে। যাতে আগামী প্রজন্ম মনের মাধুরী দিয়ে গাইতে পারে— ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।’

স্বাধীনতার পর জামায়াতসহ সব স্বাধীনতাবিরোধী দলই নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার পর ইতিহাসের চাকা পাল্টে দেয়া হয়। কায়েমি স্বার্থবাদী দেশ-বিদেশি চক্রান্তকারী ও স্বাধীনতার শত্রুরা স্বাধীনতার তিন বছরের মাথায় জাতির পিতাকে হত্যা করেছে অত্যন্ত নির্মম, নিষ্ঠুরভাবে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালোরাতে ফজরের আজানের আগে ঘাতকরা তাকে হত্যা করে। প্রকৃতি সেদিন অঝোর ধারায় কেঁদেছিল। আমরা স্তম্ভিত, বিহ্বল ছিলাম। মানবতার এহেন অবমাননা ইতিহাসে ইতোপূর্বে আর ঘটেনি। এই হত্যা কারবালার হত্যাকেও হার মানিয়েছে। সেই থেকেই এ দেশে রাজনীতি কলুষিতকরণ শুরু। এ ঘটনার মূলনায়ক ইতিহাসের দুই মীরজাফর খন্দকার মোশতাক ও জিয়াউর রহমান। তিন মাসের মধ্যেই আসল নায়ক জিয়াউর রহমান মোশতাককে নিক্ষিপ্ত করেন অন্ধকারে। পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সায়েমকে অস্ত্রের মুখে পদত্যাগ করিয়ে সেনাপ্রধান হিসেবে খলনায়ক জেনারেল জিয়াউর রহমান পাকিস্তানি কায়দায় ক্ষমতা গ্রহণ করেন। জাতির পিতাকে হত্যার পর জিয়াউর রহমান সব স্বাধীনতাবিরোধীদের ক্ষমা করে দেন। রাজনীতি করার সুযোগ করে দেন। স্বাধীনাতাবিরোধী সব শক্তি সগৌরবে ফিরে আসে। পাকিস্তানি দালাল শাহ্? আজিজকে প্রধানমন্ত্রী করা হয়। রাজাকার মাওলানা মান্নান, আলীম, রাজাকার চখা মিয়া এবং বহু দালাল রাজাকার পুনর্বাসিত হয় এবং মন্ত্রী করা হয়। এভাবেই স্বাধীনতার তিন বছরের মাথায় মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিগুলো পুনর্বাসিত হয়। কুখ্যাত দালাল পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটির সভাপতি গোলম আজমসহ অনেক দালাল পলাতক অবস্থা থেকে ফিরে আসে। তাদের নাগরিকত্ব দেয়া হয়। সব যুদ্ধাপরাধী, দালাল, রাজাকার মুক্ত হয়। দুই মীরজাফর মোশতাক ও জিয়া ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ থেকে মে ১৯৮১ পর্যন্ত দেশ শাসন ও শোষণ করে। ১৯৮১ সালের ৩১ মে জিয়াউর রহমান নিহত হন। বিচারপতি সাত্তার অতঃপর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। বছরখানেকের মধ্যেই বিচারপতি সাত্তার নিজ দলের নানাবিধ দুর্নীতি ও অপকর্মের অভিযোগে সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের হাতে ক্ষমতা তুলে দেন। এরশাদ নয় বছর দেশ শাসন ও শোষণ করেন। সামরিক শাসকরা যুগে যুগে দেশে দেশে এভাবেই এসেছেন আবার চলেও গেছেন। পাকিস্তান তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। সামরিক শাসক এরশাদ দেশ শাসনে কতিপয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। বিচার বিভাগ বিকেন্দ্রীকরণ ও উপজেলা পদ্ধতি গ্রহণ উল্লেখযোগ্য। উপজেলা পদ্ধতি এখন স্থায়ী রূপ লাভ করেছে। তিনিও ছলেবলে কলাকৌশলে দালাল, রাজাকার, ডান, বাম রাজনীতিবিদদের দিয়ে রাজনীতি কলুষিত করেছেন। জিয়া ও এরশাদ দুজনেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বাধীনতার মূল্যবোধকে ধ্বংস করার চেষ্টা করেছেন। জিয়া বলেছিলেন ও রিষষ সধশব ঢ়ড়ষরঃরপং ফরভভরপঁষঃ ভড়ৎ ঃযব ঢ়ড়ষরঃরপরধহং. গড়হবু রং হড় ঢ়ৎড়নষবস. মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান, চিন্তাচেতনা তিনি ভুলিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছেন। এভাবেই দুই সামরিক শাসক স্বাধীনতার শিশু বয়সেই মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে কলঙ্কিত করেছেন। ভুলিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছেন। এভাবেই অনেক রক্ত ও ত্যাগ তিতিক্ষার বিনিময়ে অর্জিত মহান স্বাধীনতার মূল্যবোধ ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়েছে। যুগে যুগে দেশে দেশে সামরিক শাসকরা এভাবেই দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্যকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করেছে। এরশাদের শাসনের শেষদিকে নব্বইয়ের তুমুল গণআন্দোলনে তিনি পদত্যাগে বাধ্য হন। পরবর্তী সময়ে জাতীয় নির্বাচনে জিয়ার বিধবা স্ত্রী খালেদা জিয়া বিএনপি নেত্রী অবিশ্বাস্যভাবে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। স্বশিক্ষিত খালেদার বিজয় ছিল এক বিস্ময়কর বিস্ময়। তিনি ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত দেশ শাসন করেছেন। তার দোসর হলেন একাত্তরের পরাজিত জামায়াত-শিবির মুসলিম লীগসহ সব স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি। তিন জোটের রূপ রেখাকে অমান্য করে মেয়াদ শেষে ১৯৯৬-র ফেব্রুয়ারিতে তিনি একটি একক নির্বাচন করে দুমাসও টিকতে পারেননি। পদত্যাগে বাধ্য হয়ে স্বশিক্ষিত খালেদা জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে বাধ্য হন। জুন ১৯৯৬ একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে বিজয়ী হয়ে দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। ১৯৭৫ থেকে জুন ১৯৯৬ পর্যন্ত দেশ চলেছে সম্পূর্ণ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী ধারায়। জিয়া-এরশাদ-খালেদা একই ধারায় দেশ শাসন করেছে। ২৩ জুন, ১৯৯৬ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে দেশরত্ন শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে পুনরায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারায় ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হলেন। শুরু হলো নতুন এক জয়যাত্রা। জনগণ স্বাধীনতার সুফল পেতে শুরু করলো। উন্নয়নের ধারা সূচিত হলো। কৃষিতে, শিক্ষায়, যোগাযোগে, খাদ্যে, বিদ্যুতে, তথ্যপ্রযুক্তিতে ও নানাবিধ উন্নয়নে বৈপ্লবিক উন্নয়ন সাধিত হতে লাগল। বিএনপি-জামায়াত আমলে যেখানে লোডশেডিংযে মানুষ ছিল বিপর্যস্ত, আওয়ামী লীগ সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে জনগণকে স্বস্থিরতা দিতে সমর্থ হলেন। বিএনপি আমলে বিদ্যুতের দাবির জন্য কানসাটে ১৮ জন মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হয়। কৃষকের সারের দাবির জন্যও প্রাণ দিতে হয়। ২০০১ সালে মেয়াদান্তে নতুন নির্বাচনের জন্য আওয়ামী লীগ যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন তখন বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিলো প্রায় ৫০০০ মেগাওয়াট। আমি তখন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ে যুগ্মসচিব হিসেবে কর্মরত ছিলাম। আর সচিব ছিলেন তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী। খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালে প্রধানমন্ত্রী হয়ে ভুলে গেলেন পিতৃঋণ। পরবর্তী সময়ে তিনি ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসে জাতির পিতার হত্যা দিবসকে নিজের ভুয়া জন্মদিন হিসেবে পালন করেন। কোনো অকৃতজ্ঞ, অসভ্য বর্বরের পক্ষেও এহেন কর্মকাণ্ড সম্ভব হবে কি না জানি না। দুর্নীতির জন্য, এতিমের টাকা আত্মসাতের জন্য উচ্চ আদালত তাকে ১২ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন। ইসলাম ধর্মের বিধানে একজন মুসলমানের এতিমের অর্থ আত্মসাৎ মহাপাপ। শেখ হাসিনার সরকার এহেন একজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে জেলে প্রাপ্যতার বাইরে সুযোগ-সুবিধা দিয়েছেন। উচ্চ আদালত তার কৃত অপরাধ, দুর্নীতির জন্য জামিন দিতে পারেননি। তার আইনজীবীরা শত চেষ্টা করেও আইনের কোনো ধারায়ই এই দুর্নীতিবাজকে মুক্ত করতে পারেননি। আইন তার নিজস্ব গতিতেই চলে, উহাই অমোঘ নিয়তি। সম্পূর্ণ মানবিক কারণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা সরকারের বিশেষ ক্ষমতায় নির্বাহী আদেশে খালেদা জিয়াকে জামিনে মুক্তি দিলেন। এ এক অভূতপূর্ব ঘটনা। অথচ এই খালেদা জিয়া তার ছেলে তারেক জিয়া বিএনপি জামায়াত সরকার তাকে হত্যার জন্য বিশবার প্রচেষ্টা চালায়।

বারবার তিনি অলৌকিভাবে বেঁচে যান। সর্বশেষ ২১ আগস্ট ২০০৪-এর ঘটনা নতুন করে বলার আর কিছু নেই। সেদিন তাদের বিশেষ করে হাওয়া ভবনের পরিকল্পনায় ছিলো আরেকটি ১৫ আগস্ট ১৯৭৫। বিধাতার অশেষ রহমতে হয়তো শেখ হাসিনা সেদিন বাঁচতে পেরেছিলেন। পবিত্র সংসদে দাঁড়িয়ে সেদিন খালেদা জিয়া বলেছিলেন, ‘উনাকে আবার কে মারত যাবে। ভ্যানিটি ব্যাগে করে তিনিই গ্রেনেড নিয়ে গিয়েছিলেন।’ আজ যখন সব সত্য প্রকাশিত হয়েছে, এখন তিনি কি বলবেন? সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে এ হত্যায় জড়িতের জন্য খালেদার স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাবরসহ ১৯ জনের ফাঁসি হয়েছে। তার কুলাঙ্গার সন্তান তারেক জিয়াসহ আরও ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। সেদিনের সন্ত্রাসবিরোধী জনসভায় গ্রেনেড হামলায় ২৪ জন নিহত হন এবং শতশত নেতাকর্মী গুরুতর আহত হন। অনেকের শরীরে এখনো স্প্লিন্টার রয়েছে, তারা ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর প্রহর গুণছেন। শরীরের স্প্লিন্টারের যন্ত্রণায় প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত, সাবেক সফল মেয়র মো. হানিফসহ কয়েকজন মৃত্যুবরণ করেছেন। খালেদা জিয়া এ অপরাধ কি অস্বীকার করতে পারবেন? সর্বোচ্চ আদালতের কাছে উহাই সবিনয় নিবেদন ২১ আগস্টের ঘটনায় যদি স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ফাসি হয়; তাহলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ফাঁসি হবে না কেন? মহামান্য আদালত দেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে সাধারণ নাগরিকের পক্ষে এই পশ্ন রেখে গেলাম। আশা করি, উচ্চ আদালত বিষয়টি রিভিউ করবেন এবং সব অপরাধীর জন্য উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করবেন সুশাসনের জন্য, আইনের শাসনের জন্য এবং আলোকিত প্রশাসনের জন্য। ১৯৭২ সালে খালেদা জিয়া নতুন জীবন পেয়েছিলেন জাতির পিতার মহানুভতায়; আবার ২০২০ সালে দুর্নীতির জন্য সাজাপ্রাপ্ত আসামি হয়েও জাতির পিতার কন্যা শেখ হাসিনার মহানুভবতায়ই সরকারের বিশেষ ক্ষতায় জামিন পেলেন।

সারা বিশ্ব আজ করোনা ভাইরাসের হিংস্র থাবায় ক্ষতবিক্ষত। বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, পানিদূষণ, পরিবেশদূষণসহ নানাবিধ দূষণে পৃথিবীর বিশুদ্ধতা নষ্ট করেছি। প্রকৃতিকে বিশুদ্ধ গতিতে চলতে দিতে হবে। নইলে প্রকৃতি প্রতিশোধ নেবেই। করোনা ভাইরাস প্রকৃতির নীরব প্রতিবাদ। করোনার ভয়াল ছোবলে পৃথিবী তছনছ হয়ে গেল। প্রতিদিনই মৃত্যুর মিছিল শেষ হচ্ছে না। আমরা যে যেখানেই থাকি না কেন, আসুন মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটাই, মানবতার সেবা করি। প্রকৃতির আর ক্ষতি না করি। এই পৃথিবীকে প্রকৃতির স্বাভাবিক গতিতে বাস উপযোগী করে গড়ে তুলি। সবার সম্মিলিত প্রয়াসে রক্ত দিয়ে কেনা আমাদের বাংলাদেশকে এই বিশ্বে একটি সুখী, সমৃদ্ধশালী ও উন্নত বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলি। জাতির পিতার আজীবন স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করি।

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সচিব

আমারসংবাদ/জেআই