Amar Sangbad
ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬,

বিচার প্রক্রিয়া শেষ না হতেই ফাঁসি কার্যকর!

শরিফ রুবেল ও নুর মোহাম্মদ মিঠু

নভেম্বর ৩, ২০২১, ০৬:১৫ পিএম


বিচার প্রক্রিয়া শেষ না হতেই ফাঁসি কার্যকর!
  • বিষয়টি আমার মন্ত্রণালয়ের নয়  তবুও খোঁজ নেবো: আনিসুল হক, আইনমন্ত্রী
  • এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড সংশ্লিষ্ট সবাই দোষী: শিশির মনির, আইনজীবী সুপ্রিম কোর্ট
  • জুডিশিয়াল মার্ডার নয় তবে হেফাজতে মৃত্যু  বলা যেতে পারে: শিহাব উদ্দিন খান, আইনজীবী সুপ্রিম কোর্ট
  • আপিলের নির্দিষ্ট সময় পার (ডিলে) হলে এমনটি হতে পারে: ইশরাত হাসান, আইনজীবী সুপ্রিম কোর্ট
  • চুয়াডাঙ্গায় ফাঁসির  মঞ্চ নেই ওটা যশোরে হয়েছে: নজরুল ইসলাম, তৎকালীন জেল সুপার

চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গার সাবেক ইউপি মেম্বার মো. মনোয়ার হোসেন হত্যামামলায় বিচারিক আদালতে আসামি মোকিম ও ঝড়ুর মৃত্যুদণ্ডের আদেশ হয়। রায়ের পর নিয়ম অনুসারে আসামিদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদনের জন্য মামলাটি হাইকোর্টে আসে। মামলার ডেথ রেফারেন্স নম্বর ৩৯/২০০৮।

২০১৩ সালের জুলাই মাসে শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট আসামি দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে রায় ঘোষণা করেন। পরে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হুমায়ুন কবিরের মাধ্যমে মোকিম আপিল দায়ের করেন। দীর্ঘ সময় পর সমপ্রতি মামলাটি শুনানির জন্য আপিল বিভাগের কার্যতালিকায়ও আসে। তবে বিপত্তি ঘটে ওখানেই। 

জানা যায়, আপিল নিষ্পত্তির আগেই ২০১৭ সালেই মোকিমের ফাঁসি কার্যকর করেছে কারা কর্তৃপক্ষ। এমনকি একই বছর অপর আসামি ঝড়ুর মৃত্যুদণ্ডও কার্যকর করা হয়। 

এমন অবস্থায় আইনজ্ঞরা বলছেন, হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল হলে তা নিষ্পত্তির জন্য কারা কর্তৃপক্ষকে অপেক্ষা করতে হবে। এটাই আইন। এর বাইরে গিয়ে ফাঁসি কার্যকরের কোনো সুযোগ নেই। শুধু আপিল নয়, আসামি রিভিউ (রায় পুনর্বিবেচনা) পর্যন্ত একজন আসামির ফাঁসি আইনগতভাবে কারা কর্তৃপক্ষ কার্যকর করতে পারে না। এমনকি রিভিউয়েও যদি ফাঁসির আদেশ বহাল থাকে তখন আসামি মহামান্য রাষ্ট্রপতির প্রাণভিক্ষার সুযোগ পাবেন। এখানে দেখা যাচ্ছে কয়েকধাপ উপেক্ষা করেই নিয়ম বহির্ভূতভাবে তাদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। যা দেশের ইতিহাসে প্রথমবার এবং নজিরবিহীন ঘটনা। বিষয়টি বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানান তারা।  

নিয়ম অনুসারে, হাইকোর্ট কোনো আসামির মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের পর আপিল দায়ের করা হলে আপিল বিভাগ থেকে কারা কর্তৃপক্ষের কাছে এবং সংশ্লিষ্ট ডিসির কাছে এ বিষয়ে নির্দেশনা যায়। ফলে দণ্ড কার্যকর ওই সময়ের জন্য বন্ধ রাখা হয়। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা একে অপরের ওপর দায় চাপিয়েছেন। এ বিষয়ে কেউই দায় নেয়নি। 

মোকিমের পক্ষে আপিল মামলাটি তদারকির দায়িত্ব পাওয়া সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আট বছর পর মামলাটি শুনানির জন্য তালিকায় ওঠার পর দরিদ্র মোকিমের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে জানা গেছে, আপিল নিষ্পত্তির আগেই ২০১৭ সালে মোকিমের ফাঁসি কার্যকর করেছে কারা কর্তৃপক্ষ। মূলত মোকিম ও ঝড়ুর পরিবার খুবই দরিদ্র। তাই তাদের পক্ষে পরিবারের সদস্যরা সেভাবে মামলার বিস্তারিত খোঁজ নিতে পারেননি।’ সে সামর্থ্যও তাদের ছিলো না বলে জানিয়েছেন ওই আইনজীবী।

জানা গেছে, আসামি মোকিম ও ঝড়ুর বাড়ি চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায়। ১৯৯৪ সালের ২৮ জুন একই এলাকার সাবেক ইউপি মেম্বার মো. মনোয়ার হোসেন খুন হন। ওই ঘটনায় তার চাচাতো ভাই মো. অহিমউদ্দিন বাদী হয়ে ২৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলার এজাহারে মোকিম ও ঝড়ুর নাম আসে। পরে ২০০৮ সালের ১৭ এপ্রিল এ মামলার বিচারে তিনজনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ, দুই জনকে যাবজ্জীবন ও অপর আসামিদের খালাস দেন চুয়াডাঙ্গার অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত-২। 

মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্তরা হলেন— একই ইউনিয়নের তৎকালীন ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ, মোকিম ও ঝড়ু। বিচারপ্রার্থী মোকিম কনডেম প্রিজনার ছিলেন। কনডেম প্রিজনার থাকা অবস্থায়ই তাদের দুজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। 

এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মনির আমার সংবাদকে বলেন, ‘একজন হত্যামামলার আসামির মামলা চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাকে অপরাধীই বলা যাবে না। সেখানে বিচারিক আদালতের আদেশের পরই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা— এটি আরেকটি হত্যাকাণ্ড ছাড়া কিছু নয়। এতে বোঝা যাচ্ছে, ওই দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি ছিলো পূর্বপরিকল্পিত। কোনো পক্ষকে খুশি করার জন্য বা চাপে পড়ে ওই ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। এখন আইনগতভাবে ওই দুই আসামির ফাঁসি কার্যকরের সাথে যারা সম্পৃক্ত ছিলেন তাদের সবার বিরুদ্ধে হত্যামামলা হওয়া উচিত। উল্টো তাদেরকে আইনের আওতায় এনে ফাঁসি দেয়া উচিত। এমন একটি ঘটনা ঘটানো হয়েছে যা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন।’

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আরেক আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান আমার সংবাদকে বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে মনে হচ্ছে আসামি (ডিলে) দেরি করে ফেলেছে। বিচারিক আদালতের আদেশের পর একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আপিল করতে হয়। তবে সেই সময় পার হয়ে গেলে  আপিলের কোনো প্রকার যোগাযোগ বা সময় না চাইলে সেটি কার্যকর হতেই পারে।’

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান আমার সংবাদকে, ‘বিচার প্রক্রিয়া শেষ করার আগেই কারো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা দুঃখজনক। বিষয়টি জুডিশিয়াল মার্ডার বলা যাবে না, কারণ এখানে আদালতের কোনো দোষ দেখছি না। তবে এটি হেফাজতে মৃত্যুর মতো একটি বিষয়। কারণ প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে— এ ঘটনায় কারা কর্তৃপক্ষের দায় রয়েছে। এ ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত হওয়া উচিত। যাদের অবহেলায় নজিরবিহীন এই ঘটনা ঘটেছে, তাদের আইনের আওতায় আনা উচিত। তাহলে এমন ঘটনা আর ঘটবে না।’

জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক আমার সংবাদকে বলেন, ‘বিষয়টি আমিও শুনেছি। আগামীকাল অফিসে গিয়ে খোঁজ নেবো। তা ছাড়া বিষয়টি আমার মন্ত্রণালয়ের নয়, তবুও খোঁজ নেবো।’  

জানতে চেয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে একাধিকবার ফোন দেয়া হলেও তিনি ফোন ধরেননি। 

তৎকালীন চুয়াডাঙ্গার (বর্তমান গাইবান্ধার) জেল সুপার নজরুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি আমার সংবাদকে বলেন, ‘এখন তো এগুলোর কিছুই আমরা বলতে পারবো না।’ 

তিনি বলেন, ‘আমার কাছে আসামি ছিলো না। আসামি না থাকলে আমরা কিছুই জানতে পারি না।’ ফাঁসির ওই রায় তাহলে কোথায় কার্যকর হয়েছিল এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘ফাঁসিটা যদি আমার আমলে হতো, তাহলে জানতাম। তা ছাড়া চুয়াডাঙ্গায় তো ফাঁসির মঞ্চই নেই। তারা খুব সম্ভবত যশোরে ছিলো। কারণ ফাঁসির আসামি আমরা রাখি না। ফাঁসির অর্ডার যে সময়ে হয়েছিল, সে সময় যারা ছিলো তারাই বলতে পারবে। আমি আসামি পাইও নি, দেখিও নি, এমনকি শুনিও নি। তবে যশোরেই হওয়ার কথা, কারণ চুয়াডাঙ্গার সেন্ট্রাল ওখানেই।’ 

এদিকে এ বিষয়ে জানেনই না তৎকালীন জেলা প্রশাসক বর্তমান বিমান বাংলাদেশের পরিচালক (প্রশাসন) জিয়াউদ্দিন আহমেদ। বিষয়টি ঠিক তার জানা নেই। 

তৎকালীন সময়ে দায়িত্বে থেকেও আপনি জানেন না— এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আসলেই আমার মনে পড়ছে না। ওই আদেশটা জজকোর্ট থেকে হয়, এটা ঠিক— আমাদের কোর্ট থেকে নয়। যদি আমার এখানে হতো, তাহলে আমার সংশ্লিষ্টতাও থাকতো।’