রক্তক্ষরণ বন্ধ হচ্ছে না খালেদা জিয়ার

সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার পরিপাকতন্ত্রে ‘রক্তক্ষরণ’ বন্ধ হচ্ছে না।
খালেদা জিয়া-ফাইল ছবি
  • রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে চিকিৎসকরা চেষ্টা করেও এগোতে পারছেন না: ফখরুল
  • মুক্তির আবেদনটি এখনো বাতিল হয়নি, সরকার বলছে বিবেচনাধীন: নজরুল 
  • আপস করতে কিংবা মাথানতের জন্য খালেদা জিয়ার জন্ম হয়নি:গয়েশ্বর

সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার পরিপাকতন্ত্রে ‘রক্তক্ষরণ’ বন্ধ হচ্ছে না। চিকিৎসকরা ঠিক কারণ বের করতে পারছেন না। অবনতির দিকেই যাচ্ছেন। খালেদা জিয়ার অঘটন হলে দেশ অচলের হুমকিও দেয়া হয়। 

গতকাল একটি অনুষ্ঠানে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, তাকে বিদেশে নেয়া এখন ‘অতি জরুরি’। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপি চেয়ারপারসনকে বিদেশ নিতে সরকারের সায় না পাওয়ার মধ্যে গতকাল দলীয় প্রধানের শারীরিক অবস্থা তুলে ধরে একথা বলেন তিনি। 

ফখরুল বলেন, ‘এখানে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার যে অসুখ, সেই অসুখটা হচ্ছে প্রধানত তার পরিপাকতন্ত্রে। তার (খালেদা জিয়া) অনেক অসুখ। এখন যেটা তার জীবনকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে, সেটা হচ্ছে তার পরিপাকতন্ত্র থেকে যে রক্তক্ষরণ হচ্ছে সেই রক্তক্ষরণ বন্ধ করা। এখন ঠিক কোন জায়গায় তার রক্তপাত হচ্ছে, এটাকে বের করার জন্যে আমাদের ডাক্তাররা বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ ডাক্তার তারা, গত কয়েকদিন ধরে তারা বিভিন্ন রকম কাজ করছেন। চিকিৎসার যে পদ্ধতি আছে, সেই পদ্ধতিতে তারা করছেন। কিন্তু একটা জায়গায় এসে তারা এগোতে পারছেন না। কারণ সেই ধরনের কোনো টেকনোলজি বাংলাদেশে নেই। যে কারণে ডাক্তাররা বারবার বলছেন যে, তাকে (খালেদা জিয়া) একটা অ্যাডভান্সড সেন্টারে নেয়া দরকার।’

খালেদা জিয়া গত ১৩ নভেম্বর থেকে ঢাকার এভার কেয়ার হাসপাতালের সিসিইউতে চিকিৎসাধীন। তার চিকিৎসার জন্য হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক শাহাবুদ্দিন তালুকদারের নেতৃত্বে একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। বসুন্ধরার এভারকেয়ার হাসপাতালে ২৬ দিন চিকিৎসা শেষে গত ৭ নভেম্বর গুলশানের বাসায় ফিরেছিলেন খালেদা জিয়া। 

পরে আবার তাকে হাসপাতালে নিতে হয়। দুর্নীতির দুই মামলায় দণ্ড নিয়ে কারাগারে যাওয়া খালেদা জিয়া সরকারি আদেশে মুক্ত থাকার মধ্যে এখন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে রয়েছেন। তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশ নিতে চায় বিএনপি। কিন্তু সরকারের সায় এখনো পায়নি। আইনমন্ত্রী বিএনপিকে বলছেন, বিদেশ থেকে চিকিৎসক নিয়ে আসতে।

সরকারের মন্ত্রীদের নানা বক্তব্যের সমালোচনা করে ফখরুল বলেন, ‘তাদের ন্যূনতম রাজনৈতিক শিষ্টাচার তো নেই, মানবিক বোধও নেই। তাদের এত বেশি দাম্ভিকতা যে তারা যেকোনো ব্যক্তি সম্পর্কে বিশেষ করে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সম্পর্কে কটুক্তি করতে এতটুকু দ্বিধা করেন না। তারা একবারও মনে করেন না যে, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া হচ্ছেন সেই মহিয়সী নারী, যিনি ১৯৭১ সালে তার স্বামী যখন স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন, তখন তার শিশুপুত্রকে হাতে ধরে পালিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন এবং সেখানে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়ে ক্যান্টনমেন্টের কারাগারে ছিলেন।’ 

পরবর্তীকালে গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলনে খালেদা জিয়ার ত্যাগ স্বীকার তুলে ধরে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘সব কিছু ভুলে যায় তারা। ওয়ান-ইলেভেনে যখন শেখ হাসিনা গ্রেপ্তার হলেন, তখন এই দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া তার মুক্তির জন্যে বিবৃতি দিয়েছিলেন। আজকে তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। কেন দিচ্ছেন সবাই আমরা বুঝি, কেন দিচ্ছেন সবাই জানে।’

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির আলোচনা সভায় বক্তব্যে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে বিদেশে চিকিৎসার জন্য পাঠাতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। ৯০-এর ডাকসু ও সর্বদলীয় ছাত্রঐক্যের উদ্যোগে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে শহীদ ডা. শামসুল আলম মিলনের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে এই আলোচনা সভা হয়। 

সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘আওয়ামী লীগের অনেকে খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠানোর পক্ষে। অনেক মন্ত্রীর সাথে আলাপ করেন, দেখবেন তারা বলবেন, তাকে যেতে দেয়া হোক। বিপক্ষে শুধু একজন।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘ক্ষমতাসীনরা বলেন গণতন্ত্রের মাতা বেগম খালেদা জিয়াকে ক্ষমা চাইতে হবে। কার কাছে? ক্ষমা চাওয়ার লোকটা কে? বর্তমানে জীবিতদের মধ্যে এ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ও জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তনে খালেদা জিয়ার চেয়ে বেশি ত্যাগ স্বীকার কে করেছেন? রাস্তায় দাঁড়িয়ে বলুন।’ 

তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়া লড়তে জানেন, ভাঙতে পারেন কিন্তু দেশ, জনগণ ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে আপস করতে জানেন না। মাথা নত করার জন্য খালেদা জিয়ার জন্ম হয়নি।’

ডাকসুর সাবেক ভিপি আমানউল্লাহ আমান বলেন, ‘দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠানো না হলে এর পরিণতি ভয়াবহ হবে, ঢাকা থেকে বাংলাদেশকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হবে। প্রয়োজনে আমরা নব্বইয়ের ছাত্রনেতারা রাজপথে শহীদ হবো।’ 

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ‘ছাত্র আন্দোলন আর শ্রমিক আন্দোলন যদি গড়ে তোলা না হয় তাহলে আমরা মুক্তি পাবো না।’ 

দুদু বলেন, ‘আজ দেশনেত্রী (খালেদা জিয়া) সংকটাপন্ন অবস্থায় আছে। খুব কষ্ট লাগে, যার সাথে এত বছর ধরে রাজনীতি করছি তার জীবন সংকটাপন্ন অথচ আমরা কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারছি না।’ 

তিনি বলেন, ১৯৬২ থেকে ১৯৮৯ যতগুলো আন্দোলন সব ছাত্ররা করেছে এবং সমাপ্তির দিকে নিয়ে গেছে। আর প্রবীণরা পেছনে থেকেছে। যারা ছাত্রনেতা আছে তাদের সমালোচনা করার জন্য নয়, এখন কেন জানি মনে হয়, সেই সময়ের আন্দোলনের নায়করা ঢেকে যাচ্ছে। আজকের এই অনুষ্ঠান বর্তমান ছাত্র নেতারা আয়োজন করে আমাদেরকে ডাকবে। আমরাও ছাত্র অবস্থায় আমাদের সিনিয়রদের ডেকে নিয়ে অনুষ্ঠান করে শিখেছি, তারপর আমরা ছাত্র আন্দোলন করেছি।

বিএনপির এই নেতা আরও বলেন, আমরা একে অপরের অনেক সমালোচনা করতে পারি। তবে ছাত্র আন্দোলন আর শ্রমিক আন্দোলন যদি গড়ে তোলা না হয় তাহলে আমরা মুক্তি পাবো না। আমানের সভাপতিত্বে ও ফজলুল হক মিলনের পরিচালনায় আলোচনা সভায় সাবেক ছাত্র নেতা হাবিবুর রহমান হাবিব, খায়রুল কবির খোকন, নাজিম উদ্দিন আলম, জহির উদ্দিন স্বপন, মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, খন্দকার লুতফুর রহমান, সাইফুদ্দিন মনি, আসাদুর রহমান খান আসাদ, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, কামরুজ্জামান রতন, শিরিন সুলতানা, আজিজুল বারী হেলাল, সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, আমিরুল ইসলাম আলিম, শহিদুল ইসলাম বাবুল, আবদুল কাদির ভুঁইয়া জুয়েল, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব)  নেতা অধ্যাপক হারুন আল রশিদ বক্তব্য রাখেন।

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসার জন্য অবিলম্বে বিদেশ পাঠানোর দাবি জানিয়েছেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। গতকাল বাদ আসর রাজধানীর মতিঝিলে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) একাংশের চেয়ারম্যানের অস্থায়ী কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত কুরআন খতম ও দোয়া মাহফিলে তিনি এই দাবি জানান। 

দোয়া মাহফিলে প্রধান অতিথির বক্তব্যে নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া অত্যন্ত অসুস্থ। চিকিৎসকরা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য কিংবা জার্মানির অ্যাডভ্যান্স সেন্টারে তার উন্নত চিকিৎসা জরুরি। 

আইনজীবীরা বলছেন, আইনে তার বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণে কোনো বাধা নেই। কিন্তু সরকার শুধু রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে তাকে বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি দিচ্ছে না, যা অত্যন্ত অমানবিক। আমরা অবিলম্বে তার মুক্তি ও বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জোর দাবি জানাচ্ছি।’ 

তিনি বলেন, বিদেশে উন্নত চিকিৎসার দাবিতে দেশনেত্রীর পরিবারের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে কিছুদিন আগে আবেদন করা হয়েছিল। সেই আবেদনটি এখনো বাতিল হয়নি। সরকার বলছে, এটি বিবেচনাধীন।