দেশে ‘ওমিক্রন’ আতঙ্ক

করোনা থেকে মুক্তির পথে দেশ। সম্প্রতি মৃত্যুশূন্য দিনও অতিবাহিত হয়েছে। স্থবিরতা কাটিয়ে ছন্দে ফিরতে শুরু করেছে প্রতিটি ক্ষেত্র। এমন পরিস্থিতিতে ভারতীয় ধরন ডেল্টার চেয়েও ভয়ঙ্কর ‘ওমিক্রন’ চোখ রাঙাচ্ছে। নয়া ধরনে অস্বাভাবিকভাবে ভাইরাসটি রূপান্তরিত হচ্ছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় শনাক্ত হওয়া ওমিক্রন অল্প দিনে বেলজিয়াম, বতসোয়ানা, ইসরায়েল ও হংকংসহ আরও বেশ কয়েকটি দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিইউএইচও) ঝুঁকি মোকাবিলায় এসব দেশ ও অঞ্চলে জরুরি সতর্কতা জারি করেছে। দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ক্ষিপ্রগতির কারণে এক বিজ্ঞানী করোনার নতুন এই ভ্যারিয়েন্টকে ভয়ঙ্কর বলে আখ্যা দিয়েছেন। 

ইতোমধ্যে ডব্লিউএইচও এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, করোনা ভাইরাসের নতুন এই ধরনটি মূল ভাইরাস ও তার অন্যান্য রূপান্তরিত ধরনগুলোর চেয়ে অনেক দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়তে বা মানুষকে আক্রান্ত করতে সক্ষম। প্রাথমিক যেসব তথ্য পাওয়া গেছে সেসব পর্যালোচনা করে বোঝা যাচ্ছে, করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর সুস্থ হয়ে ওঠা ব্যক্তিরাও ওমিক্রনে আক্রান্ত হতে পারেন।

আরেক বিজ্ঞানী বলেছেন, এতটা ভয়ঙ্কর ভ্যারিয়েন্ট তারা দেখেননি। ঝুঁকি এড়াতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, মধ্যপ্রাচ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ 
দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে যোগাযোগ স্থগিত করেছে। বাংলাদেশও যোগাযোগ স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে। এসব পদক্ষেপ নয়া ভ্যারিয়েন্ট মোকাবিলায় কতটা কার্যকর হবে সে বিষয়েও সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। এমনকি ওমিক্রন টিকার কার্যকারিতাও শেষ করতে পারে কি-না সেসব বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে। 

জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, করোনা মোকাবিলায় গৃহীত বৈশ্বিক প্রতিটি পদক্ষেপে শুরু থেকেই সমতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অথচ আমরা জানি, বিশ্বের একটি দেশও করোনা মোকাবিলায় ব্যর্থ হলে অন্যরা ঝুঁকিমুক্ত থাকতে পারবে না।। 

তবুও একদিকে ইউরোপ-আমেরিকায় বুস্টার তৃতীয় ডোজ টিকাদান কর্মসূচি চলছে। অন্যদিকে স্বল্পোন্নত দেশের ৭ শতাংশ নাগরিকের প্রথম ডোজ টিকা নিশ্চিত করাও সম্ভব হয়নি। ডেল্টার চেয়েও ভয়ঙ্কর হলেও আতঙ্কিত না হয়ে করোনা মোকাবিলায় সমতা প্রতিষ্ঠায় জোর দিচ্ছেন তারা। 

সরকারের রোগতত্ত্ব রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত বিশ্বের প্রতিটি দেশে করোনা নিয়ন্ত্রণে না আসবে ততদিন পর্যন্ত নতুন নতুন ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ কমবে না; বরং বাড়বে। আর বিশ্বজুড়ে টিকায় সমতা না আনলে করোনা পরিস্থিতির বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণ আসবে না। এ জন্য ধনী-গরিব সব দেশের নাগরিকদের টিকায় সমতা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ মনে রাখতে হবে, নতুন ভ্যারিয়েন্ট যত ট্রান্সমিটেড হবে তত বেশি ভয়ঙ্কর হয়ে ছড়িয়ে পড়বে। 

তিনি বলেন, আমরা যতটা জেনেছি ওমিক্রন ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টে থেকেও বেশি ক্ষিপ্রগতিতে ছড়ায়। এ জন্য আতঙ্ক কিছুটা থাকলেও ভয় নয়— সতর্কতার বিকল্প নেই। দেশের বিমানবন্দরে তৎপরতা বাড়াতে হবে। ওমিক্রন শনাক্ত হওয়া দেশের যাত্রীদের কোয়ারেন্টাইন রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত করতে হবে। 

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, বৈশ্বিক মহামারি থেকে নিরাপদ থাকা সবসময় কঠিন। তবে করোনা মোকাবিলায় অর্জিত দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নতুন ভ্যারিয়েন্ট মোকাবিলায় প্রস্তুত। সেই সাথে ভাইরাসটি প্রতিরোধে নির্দেশনা জারি করা হচ্ছে। একই সাথে দক্ষিণ আফ্রিকাসহ যেসব দেশে ভাইরাসটি শনাক্ত হয়েছে সেসব দেশের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করা হচ্ছে। 

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, ‘দক্ষিণ আফ্রিকান নতুন ভ্যারিয়েন্ট বিষয়ে আমরা অবহিত হয়েছি। এই ভাইরাসটি খুবই এগ্রেসিভ বলে জেনেছি। তাই আফ্রিকার সাথে আমাদের যোগাযোগ এখন স্থগিত করা হচ্ছে। সব এয়ারপোর্ট, ল্যান্ডপোর্টে বা দেশের সকল প্রবেশপথে স্ক্রিনিং আরও জোরদার করার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। একই সাথে সারা দেশেই স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মেনে চলতে ও মুখে মাস্ক পরতে উদ্বুদ্ধ করতে জেলা প্রশাসনকে নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। 

তিনি বলেন, বিশ্বের আক্রান্ত অন্যান্য জায়গা থেকেও যারা আসবে তাদের বিষয়েও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কোনোভাবেই স্ক্রিনিং ছাড়া যেনো আক্রান্ত দেশের কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারে সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট শাখাগুলোকেও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ২৫ নভেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথম শনাক্ত হয় বি.১.১৫২৯ নামের এই রূপান্তরিত ধরনটি, পরে গ্রিক বর্ণমালা অনুসারে যার নাম দেয়া হয় ‘ওমিক্রন’। 

যখন দক্ষিণ আফ্রিকার জীবাণুবিদরা প্রথম ওমিক্রনকে শনাক্ত করলেন, সে সময় দেশটিতে এ ধরনটিতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা মাত্র ২২ জন। ইতোমধ্যে এই ধরনটি দক্ষিণ আফ্রিকার বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে। এই ভ্যারিয়েন্ট প্রসঙ্গে আফ্রিকার সেন্টার ফর এপিডেমিক রেসপন্স অ্যান্ড ইনোভেশনের পরিচালক টুলিও ডি অলিভেরিয়া বলেন, অস্বাভাবিকভাবে এটি রূপান্তরিত হয়েছে এবং অন্য যেকোনো ভ্যারিয়েন্ট থেকে এটি আলাদা। 

তিনি বলেন, এই ভ্যারিয়েন্টটি আমাদের হতবাক করেছে। সব মিলে ৫০ বারের মতো জিন বিন্যাস পরিবর্তিত হয়ে নতুন ওমিক্রন ধরন রূপ পেয়েছে। আর এর স্পাইক প্রোটিনের বৈশিষ্ট্য বদলেছে ৩০ বারের বেশি। 

এদিকে নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, নতুন ভ্যারিয়েন্টের স্পাইক প্রোটিনের যে রূপান্তর, সেটি উদ্বেগের। কারণ, এর বিরুদ্ধে শরীরে রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা বা টিকা নেয়ার কারণে যে রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, তা কাজ করবে কি-না। 

তবে ইতালির শীর্ষ ভাইরোলজিস্ট রবার্তো বুরিওনি বলেন, জনসাধারণের উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত হবে না। টুইট বার্তায় তিনি লিখেছেন, এই ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে এখনো কিছু জানা যায়নি।