বাসে ছাত্রদের হাফ ভাড়ার আন্দোলন জবি শিক্ষার্থীদের একাত্মতা

  • আন্দোলন থাকলেও পদক্ষেপ নেই বাকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর
  • শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রশাসনের নীরবতায় ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা
  • শিক্ষার্থীদের বাসে হাফ পাস ন্যায্য দাবি : ব্যারিস্টার জাহিদ রহমান 
  • শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারিনি : গবি প্রক্টর
  • অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এগিয়ে আসা উচিত : জবি প্রক্টর

শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সারা দেশে বিআরটিসি বাসের ভাড়া শতকরা ৫০ ভাগ কমানোর সিদ্ধান্ত নিলেও রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রায় সকল জায়গাতেই বেসরকারি বাসগুলোর অবাধ রাজত্ব চলে। তাছাড়া শুধুমাত্র সকাল ৭টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত এ সুবিধা এবং বন্ধের দিনে সুবিধা না থাকায় শিক্ষার্থীরা বিআরটিসি বাসে চলাচলের ক্ষেত্রে এ কনসেশন (সুবিধা) নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়ার আন্দোলনটা দীর্ঘদিনের। ১৯৬৯ সালের জানুয়ারিতে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের হাত ধরে যে দাবি ছিলো সেখানেও ১১ দফা দাবির একটি ছিলো শিক্ষার্থীদের জন্য অর্ধেক ভাড়া রাখা। 

২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনেও গুরুত্বের সাথে তুলে ধরা হয় এ দাবিটিকেই। হাফ ভাড়া বা অর্ধেক ভাড়ার আইনগত ভিত্তি না থাকলেও পাকিস্তানি শাসনামল থেকেই সময়ের সাথে সাথে শিক্ষার্থীদের অধিকারে পরিণত হয়েছে বিষয়টি। বারবার আন্দোলন হলেও হাফ ভাড়া নিয়ে আসেনি ইতিবাচক সুরাহার ইঙ্গিত। ফলে সর্বশেষ বাসে হাফ ভাড়া নেয়ার দাবিতে কয়েকদিন ধরেই সাধারণ শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছেন। 

রাজধানীর নীলক্ষেত, সায়েন্সল্যাব, বকশীবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে রাস্তায় নামেন আন্দোলনকারীরা। আন্দোলনে হামলারও অভিযোগ ওঠে। হাফ ভাড়া কার্যকরের দাবিতে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটামও দিয়েছিলেন শিক্ষার্থীরা। সংশ্লিষ্টরা শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়া আন্দোলনকে যৌক্তিক বললেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে নেয়া হয়নি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। তবে এ দৌড় প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রয়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। 

জানা যায়, গত মঙ্গলবার বিকাল চারটায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিসে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, ছাত্র প্রতিনিধি, পুলিশ প্রশাসন ও পরিবহন মালিক সমিতির সঙ্গে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে সদরঘাটে আসা ছয়টি গণপরিবহনের পরিচালকদের (এমডি) সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এ আলোচনায় শিক্ষার্থীদের সপ্তাহের সাত দিনই বাস ভাড়া অর্ধেক নেয়ার সিদ্ধান্ত (হাফ পাস) গৃহীত হয়। 

অপরদিকে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকেও বাস মালিক সমিতির নেতাদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং  যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এমন সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানালেও দেশের অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনের নীরবতায় ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। 

এদিকে হাফ ভাড়াসহ শিক্ষার্থীদের গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রক্টোরিয়াল বডি থেকে সরাসরি সহযোগিতা এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রক্টর অথবা নির্বাহীদের এসবে মাথা ব্যথা নেই বলেও অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।

হাফ ভাড়ার যৌক্তিকতা নিয়ে ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী নাহিদ হাসান সাব্বির জানান, ‘হাফ ভাড়া দেয়া শিক্ষার্থীদের অধিকার। অনেক সময় দেখা যায় কিছু বাস শিক্ষার্থীদের থেকে হাফ ভাড়া নিলেও সব বাস হাফ ভাড়া নেয় না। বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ প্রশাসনের উচিত বাস মালিক পক্ষের সাথে আলোচনা করে শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা। এভাবে একটা সম্মিলিত সিদ্ধান্ত এলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আর অসন্তোষ থাকবে না।’

তেজগাঁও কলেজ সাংবাদিক সমিতির আহ্বায়ক ইমরানুল আজিম চৌধুরী (ইমু) বলেন, ‘হাফ ভাড়ার দাবিতে সারা দেশে শিক্ষার্থীদের যে আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে তা যৌক্তিক। আমরা অতীতেও দেখেছি পরিবহন নৈরাজ্য, যা দীর্ঘদিনের চর্চা। হাফ ভাড়ার দাবি নতুন কিছু নয়, এটা অতীত থেকেই চলে আসছে। এক্ষেত্রে পরিবহন মালিকদেরও সহনশীল হওয়া উচিত। তেজগাঁও কলেজের শিক্ষার্থী হিসেবে আমি ছাত্রদের এই আন্দোলনের সাথে একাত্মতা পোষণ করছি। আমদের নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা না থাকায় গণপরিবহনই আমাদের ভরসা। আমরা আশা করছি তেজগাঁও কলেজ প্রশাসন আমাদের যৌক্তিক এ দাবির গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত একটি নিষ্পত্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’

সাভারের গণবিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের শিক্ষার্থী মো. রাকিবুল হাসান জানান, ‘হাফ পাসের দাবির বিষয়টি নতুন কোনো বিষয় নয়। ইতিহাস বলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভেরও আগে, পাকিস্তান আমলে এ দেশে শিক্ষার্থীরা যানবাহনে হাফ ভাড়া দেয়ার অধিকার পেয়ে এসেছে। কিন্তু বিগত কয়েক বছর ধরে বিষয়টি নিয়ে গণপরিবহন; বিশেষত ঢাকা শহরের কোনো কোনো পরিবহন কোম্পানির তথাকথিত সিটিং সার্ভিসগুলোতে হাফ ভাড়া না রাখার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। হাফ পাস শিক্ষার্থীদের আবদার নয় অধিকার। আশা করছি, বাস মালিক সমিতির সাথে সমঝোতায় এসে দ্রুত শিক্ষার্থী-বান্ধব পদক্ষেপ নেবে গবি প্রশাসন।’

এ প্রসঙ্গে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মশিউর রহমান আকাশ জানান, ‘আমি মনে করি, অবশ্যই শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়া নিশ্চিত করা দরকার। কারণ ঢাকা শহরে প্রায় অর্ধেক ছাত্র-ছাত্রীরা মফস্বল থেকে আসে। এদের মাঝেই অনেকে নিম্নবিত্ত কৃষক পরিবার থেকে উঠে আসা। ফলে শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়া নিশ্চিত করতে ডিআইইউ প্রসাশনকে এগিয়া আসার আহ্বান জানাচ্ছি।’ 

এ প্রসঙ্গে আইনজীবী ব্যারিস্টার জাহিদ রহমান বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের বাসে হাফ পাশ ন্যায্য দাবি। সরকারি বাসগুলো যদি শিক্ষার্থীদের সকল রুটে ফুল পাস দেয়, শুধু সে ক্ষেত্রে বেসরকারি বাসগুলো সকল রুটে শিক্ষার্থীদের হাফ পাশ দিতে বাধ্য থাকবে। এখন সরকারি বাসগুলো যদি হাফ পাশ দেয় সে ক্ষেত্রে বেসরকারি বাস হাফ পাশ দিতে চাইবে না। তাই যেহেতু আমাদের দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকারি বাসগুলো শিক্ষার্থীদের ফুল পাশ দিচ্ছে না, সেহেতু সরকারি বাসগুলো সকল রুটে শিক্ষার্থীদের হাফ পাশ দিক। আর বেসরকারি বাস ক্যাম্পাসগামী নির্দিষ্ট রুটে শিক্ষার্থীদের আইডি কার্ড দেখানোর শর্ত অনুযায়ী হাফ পাশ দিতে পারে। সেক্ষেত্রে অবশ্যই প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই বিষয়টি নিয়ে বাস মালিক সমিতির সাথে শিক্ষার্থীদের পক্ষে সমঝোতামূলক আলোচনায় বসতে হবে। 

শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়া আন্দোলনে প্রক্টোরিয়াল বডি অথবা বোর্ড অব ট্রাস্টিজ থেকে পরিবহন মালিক নেতাদের সাথে কোনো সমঝোতা চুক্তি করতে পেরেছে কি-না এমন প্রশ্নের উত্তরে গণবিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ক্যাপ্টেন ড. মো. জয়নুল আহসান আমার সংবাদকে জানান, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য এমন কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। বোর্ড অব ট্রাস্টিজ থেকেও আসেনি নির্দেশনা।’ পিপলস ইউনিভার্সিটির প্রক্টর মো. হাবিবুর রহমানসহ একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরই জানিয়েছেন পদক্ষেপ না নেয়ার কথা।  

শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. এ কে এম গোলাম রব্বানী জানান, ‘শিক্ষার্থীদের সাথে অথবা বাস মালিক সমিতির সাথে এ বিষয়ে আমাদের আলোচনা হয়নি। পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নিলে আমরা জানাবো।’ 

এ সম্পর্কে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) প্রক্টর মোস্তফা কামাল জানান, ‘আমাদের শিক্ষার্থীদের সুবিধার কথা চিন্তা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে সাংবাদিক সংগঠন, ছাত্র নেতা এবং বাস মালিক সমিতির নেতাদের সাথে সমঝোতায় এসেছি এবং শিক্ষার্থীদের বাস ভাড়ার জন্য একটি নির্ধারিত তালিকাও প্রণয়ন করেছি। আমি মনে করি, দেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এগিয়ে এলে শিক্ষার্থীদের জন্য ভালো কিছু উপহার দেয়া সম্ভব।’