খেলাপিদের ঢাল উচ্চ আদালত

  • আইনের ফাঁকে আটকে আছে সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা
  • আদালতের সংখ্যা কম, নেই পর্যাপ্ত বিচারক
  • ইচ্ছাকৃত খেলাপিরা মামলা নিষ্পত্তিতে বাধা সৃষ্টি করেন
  • টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যায় তাই এত গড়িমসি-বিশেষজ্ঞদের মত

অর্থঋণ আদালত। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শেষ ভরসা। খেলাপিদের কাছ থেকে বিতরণকৃত অর্থ আদায় করতে না পেরে প্রতিষ্ঠানগুলো দ্বারস্থ হয় আদালতের। কিন্তু এ আদালত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রয়োজনীয় সেবা দিতে পারছে না। মাললা জট ও উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশে অর্থঋণ আদালতে আটকে আছে হাজার হাজার কোটি টাকা।

এ ক্ষেত্রে খেলাপিরা ব্যবহার করছেন উচ্চ আদালতকে। আইনকে তারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। এছাড়া প্রয়োজনের তুলনায় দেশে অর্থঋণ আদালতের সংখ্যা কম থাকা, আদালতগুলোতে যথেষ্ট বিচারক না থাকাসহ বিভিন্ন কারণে অর্থঋণ আদালতে মামলাজট তৈরি হচ্ছে। 

এর ফলে একদিকে যেমন আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর টাকা আটকে থাকছে বছরের পর বছর, একই সাথে মামলাজটে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ গ্রাহকরাও। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে পাওয়া যায় চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য। 

এতে দেখা যায়, চলতি বছরের জুনের শেষ দিকে অর্থঋণ আদালতে ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ১৭ হাজার ৪৩২টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এসব মামলার বিপরীতে আটকে আছে ১০ হাজার ৬৩২ কোটি টাকা। আদালতে আটকে থাকা অর্থের পরিমাণ এখন পর্যন্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণের চেয়ে বেশি বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

খেলাপি ঋণ সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ৬৭ হাজার ১১৪ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে। এর মধ্যে খেলাপি হয়েছে ১০ হাজার ৩২৮ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত ঋণের ১৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ। এসব খেলাপি ঋণ আদায়ে প্রতিষ্ঠানগুলো দ্বারস্থ হচ্ছে আদালতের। কিন্তু অর্থঋণ আদালতের অনেক মামলা হাইকোর্টের আদেশে স্থগিত রয়েছে। বছরের পর বছর ঝুলে থাকছে এসব মামলা। 
কোনো সুরাহা না হওয়ায় মামলা করেও টাকা ফেরত পাচ্ছে না আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খেলাপিদের অধিকাংশই ইচ্ছাকৃত খেলাপি। তাই তারা আইনের বিভিন্ন সুবিধা নিয়ে সময় ক্ষেপণ করতে উচ্চ আদালতের মাধ্যমে নিম্ন আদালতের মামলা স্থগিত করে রাখছেন। দফায় দফায় এই স্থগিতাদেশ বাড়িয়ে নিচ্ছেন। আইনের মারপ্যাচে বছরের পর বছর খেলাপি থাকছেন তারা। বিষয়টি যেহেতু আইনানুগভাবেই হচ্ছে তাই প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো কিছুই করতে পারছে না। 

বিশ্লেষকদের মতে, এসব খেলাপি মূলত অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন। তাই তারা অর্থ ফেরত দেয়ার পর্যায়ে নেই। বিদেশে ব্যাংকে টাকা রেখে সেখান থেকে পাওয়া মুনাফা দিয়ে দেশে মামলা লড়ছেন— তাই এর একটা সুরাহা হওয়া দরকার। এর মাধ্যমে প্রত্যক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হলেও যেহেতু বেশির ভাগ টাকা বিদেশে পাচার হয়ে গেছে তাই পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশ।  

ফারইস্ট ইসলামি লাইফ ইন্স্যুরেন্সের কনসালটেন্ট (প্রতিষ্ঠানটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক) একরামুল আমিন (এফসিএ) বলেন, দেশের লিগ্যাল সিস্টেমের দুর্বলতার কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এত ধীর গতি হলে টাকা আদায় করা সম্ভব নয়। লিগ্যাল সিস্টেমে পরিবর্তন আনতে হবে। কিভাবে দ্রুততার সাথে নিষ্পত্তি করা যায় সে ব্যবস্থা নিতে হবে। আসলে প্রক্রিয়াটি এত ধীর যে, যখন ব্যবস্থা নেয়া হয় তখন আর টাকা দেশে থাকে না, বিদেশে পাচার হয়ে যায়। তাই অর্থঋণ আদালতে আরো বিচারক নিয়োগ দিতে হবে। আদালতের সংখ্যা বাড়াতে হবে। 

এক কথায়, মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পতির জন্য সরকারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি। 

ইচ্ছাকৃত খেলাপিরা মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে জানিয়ে বাংলাদেশ লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিএলএফসিএ) চেয়ারম্যান ও আইপিডিসি ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মমিনুল ইসলাম বলেন, ‘ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিরা আদালত থেকে বারবার স্টে অর্ডার বা স্থগিতাদেশ নিয়ে মামলা নিষ্পত্তি করতে দেন না। ফলে শুধু বছর নয়, যুগের পর যুগ ঝুলে থাকে এসব মামলা।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত আদালতে দায়ের করা মামলার সংখ্যা ২৮ হাজার ২০৭টি। এসব মামলার বিপরীতে অর্থের পরিমাণ ১২ হাজার ৮৯০ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ১০ হাজার ৭৭৫টি মামলা, যেখানে অর্থের পরিমাণ ছিলো দুই হাজার ২৫৭ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। 

এমন অবস্থার মধ্যে ঘুরে ফিরে খেলাপিরাই সুবিধা পাচ্ছেন। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের জন্য পুনঃতফসিল পুনর্গঠন, এককালীন পরিশোধসহ গত এক দশকে ঋণখেলাপিদের জন্য একাধিক বিশেষ সুবিধা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব সুবিধা পেয়েও ঋণ পরিশোধ করছে না খেলাপিরা। ক্রমাগত বেড়েছে খেলাপি ঋণ। অন্যদিকে দু-একটি ছোটখাটো ঘটনা ছাড়া ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার উদাহরণ তেমন চোখে পড়ে না। এমন পরিস্থিতিতে মামলাজট কমাতে বিশেষ আদালত চালু করার পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকে খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার দাবি ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের।

এ বিষয়ে কোম্পানি আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার তানজীব-উল-আলম বলেন, ‘হাইকোর্টের আদেশের মাধ্যমে অর্থঋণ আদালতের মামলা বছরের পর বছর আটকে আছে। এ ছাড়া চলমান মামলার বিচারকাজ অযৌক্তিকভাবে মুলতবি রাখা হয়। এ ক্ষেত্রে হাইকোর্টের আদেশে যে মামলাগুলো স্থগিত রয়েছে, সেগুলো বাতিলের ব্যবস্থা করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংককে এ জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। 

স্থগিত মামলাগুলোর একটি তালিকা তৈরি করে আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রধান বিচারপতির কাছে দিতে হবে। আইন মন্ত্রণালয় প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আলাপ করে এসব স্থগিতোদেশের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে।’ এছাড়া অর্থঋণের আদালত ও বিচারক বৃদ্ধি এবং দক্ষ বিচারক দিয়ে এসব মামলার বিচার পরিচালনার ব্যবস্থা করতে হবে বলে মন্তব্য তিন।

বিমা খাতে মামলার প্রবণতা কমছে জানিয়ে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) নির্বাহী পরিচালক (যুগ্ম সচিব) ও মুখপাত্র এস এম শাকিল আখতার বলেন, বর্তমানে বিমা খাতে মামলার প্রবণতা কম। গত এক বছরে কোনো মামলা হয়নি। এ ক্ষেত্রে আইডিআরএ অ্যামিক্যাবল সেটেলমেন্ট বা সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করে দিচ্ছে। ফলে বিমাকারী ও পলিসি গ্রাহক একটি সুষ্ঠু সমাধানে আসতে পারছে তারা কেউ আদালতে যাচ্ছে না। 

বিমা খাতে ৪০-৪২টি মামলা ঝুলে আছে (যেগুলো আগে থেকেই ছিলো) জানিয়ে তিনি বলেন, এসব ক্ষেত্রে মূলত কোনো দুর্ঘটনার পর সার্ভেয়ারদের অস্বাভাবিক ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদন সমস্যার সৃষ্টি করে। 

এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, সরকারি পর্যায়ে প্রয়োজনীয় পরিমাণ প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান না থাকায় সার্ভেয়াররা মূলত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে থাকে। তাই অনেক ক্ষেত্রে সঠিক প্রশিক্ষণ না থাকায় তারা ভুল প্রতিবেদন দেয়। এতে বিমাকারী ও গ্রাহকের মধ্যে সমস্যার সৃষ্টি হয় এবং তা আদালত পর্যন্ত গড়ায়।