মৃতপ্রায় প্রকৃতির অপার দান আশুরার বিল

উত্তপ্ত হচ্ছে পৃথিবী। বাড়ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। তীব্র হচ্ছে পানি সংকটের ভয়াবহতা, কঠিন হয়ে পড়ছে খাদ্য উৎপাদন। বাস্তুহারা হচ্ছে মানুষ। একদিকে জীবাশ্ম জ্বালানীর অতি ব্যবহারে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, অন্যদিকে বনভূমি উজাড় আর নদী-নালা-খাল-বিল দখল। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির লাগাম টেনে ধরতে ক’দিন আগে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলনে ধরিত্রী বাঁচানোর দাবিতে বনাঞ্চল-সমুদ্র-জলাশয় রক্ষার বিষয়টিও বেশ গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রীও বিভিন্ন জাতীয় অনুষ্ঠানে জলাশয়গুলোকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগের ওপর জোর দিয়েছেন। 

বাংলাদেশের মহান সংবিধানেও জলাশয় রক্ষার বিষয়টির উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, আমাদের আন্তর্জাতিক নদীগুলোর ক্ষেত্রে উজানের দেশগুলোর একতরফা পানি প্রত্যাহারের সাথে সাথে জাতীয় অবহেলার কারণে দেশের নদী-নালা, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়গুলো একে একে বিলীন হয়ে হয়ে যাচ্ছে, কোনো কোনোটি হারিয়ে ফেলছে তার স্বাভাবিক অবস্থা। 

তবে পরিবেশবাদীরা অব্যহতভাবে আন্দোলন করে যাচ্ছেন সেগুলো রক্ষায়। পরিবেশ সচেতন এই মানুষগুলো এখন শুধু তাকিয়ে থাকেন প্রধানমন্ত্রী আর উচ্চ আদালতের দিকে। জলাশয়গুলো রক্ষা করতে পারলে অধিকমাত্রায় মাছ উৎপাদনের মাধ্যমে কেবল জাতীয় আয়ের বৃদ্ধি নয়, পরিবেশের ব্যাপক উন্নয়ন আর জীববৈচিত্র্য রক্ষা আরও সহজ হয়ে ওঠে।

আবহমানকাল ধরে জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শতশত নদ-নদী, খাল, বিল আর জলাভূমি শ্যামল বাংলাদেশের জন্য ছিলো আশীর্বাদ হয়ে। যুগের পর যুগ মৎস্যজীবীদের টিকিয়ে রাখতে, সেচ কাজে কৃষকের মুখে হাসি ফোটাতে, মাঝিমাল্লার স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে, সর্বোপরি পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে প্রকৃতির অপার আশীর্বাদ হয়ে আপন ধারায় কাজ করে চলেছে জলজ এই উৎসগুলো। সময়ের পরম্পরায় এগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে নৌকেন্দ্রিক পর্যটন ব্যবস্থা, যা সংশ্লিষ্ট এলাকার আর্থসামাজিক উন্নয়নে বিশাল ভূমিকা পালন করে আসছে। দিনাজপুরের আশুরার বিলও প্রকৃতির তেমনই একটি অপার দান, সৌন্দর্যের লীলাভূমি। 

বিলটির মোট আয়তন ৮৫৭ একরেরও বেশি, যার প্রায় ৫৯০ একর পড়েছে নবাবগঞ্জ উপজেলার মধ্যে, বাকিটা বিরামপুর উপজেলায়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা আশুরার বিলকে নিয়ে রয়েছে নানান পৌরাণিক কাহিনী। কথিত কাহিনীগুলোর একটি হলো, অতি প্রাচীনকালে আধিপত্য বিস্তারে লড়াই শুরু হয় দেবতা এবং অসুরদের মধ্যে। সেই লড়াইয়ে পরাজিত হয় অসুরেরা। দেবতাদের খঞ্জরের আঘাতে অসুরদের শরীর থেকে ঝরা রক্তে ভরে গিয়েছিল তাদেরই পায়ে দেবে যাওয়া গর্ত। অসুরদের সেই কাহিনী থেকে লোকমুখের মাধ্যমে ধীরে ধীরে এটির নাম হয়ে ওঠে আশুরার বিল।

শালবনের কোল ঘেষে গড়ে ওঠায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর আশুরার বিল হয়ে উঠেছে আরও বেশি মোহময়। উদ্ভিদ, বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ এবং পর্যটন সুবিধাদির উন্নয়নের লক্ষ্যে সেই শালবনকে ২০১০ সালে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করেছে সরকার, যা স্থানীয়ভাবে শেখ রাসেল জাতীয় উদ্যান নামে পরিচিত। আগে এটি শুধু শালবন হিসেবে থাকলেও এখন সেখানে রয়েছে ২০-৩০ প্রজাতির গাছ। আর ৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সমগ্র উত্তরবঙ্গের বৃহত্তম বিল আশুরাতে রয়েছে দেশীয় প্রজাতির বিভিন্ন ধরনের মাছ। শাপলা আর পদ্মফুলের সমারোহে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির কলতানে মায়াবী আবেদনে হাতছানি দিয়ে ডেকে যায় আশুরার বিল। বিলের শান্ত পানি, মুক্ত বাতাস, চারপাশের সবুজ ঘন অরণ্য, ঝাঁকে ঝাঁকে বিচিত্র পাখির উড়াউড়ি প্রকৃতিপ্রেমীদের অন্তরে জাগিয়ে তোলে নান্দনিক শিহরণ। 

ঐতিহ্যবাহী বিলটি এক সময় উত্তরাঞ্চলের ভ্রমণপিপাসুদের কাছে হয়ে ওঠে অন্যতম দর্শনীয় স্থান। কিন্তু অবৈধ দখলদারদের কারণে অচিরেই বিলটি হারাতে বসে তার ঐতিহ্য। স্থানীয় প্রভাবশালী কিছু মানুষের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে অপার সম্ভাবনার এই জলাশয়। বাঁশের বেড়া আর মাচা দিয়ে শত ভাগে ভাগ করে ফেলে তারা। শীতে ধান চাষ করে তাতে কীটনাশক ব্যবহার করায় হারিয়ে যেতে থাকে দেশি প্রজাতির বহু মাছ। কচুরিপানা আর বিভিন্ন ধরনের আবর্জনায় জরাজীর্ণ রূপ নেয় আশুরা। সুষ্ঠু পরিকল্পনা আর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এক শ্রেণির দখলবাজ স্বার্থন্বেষী গোষ্ঠী বিলটিকে কৃষি জমি হিসেবে ব্যবহার শুরু করায় এর পানি কমতে থাকে আশঙ্কাজনকভাবে। বিলের অধিকাংশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় হারিয়ে যেতে থাকে এর সৌন্দর্য। অথচ আইনগতভাবে বিলের জমির শ্রেণি পরিবর্তনের সুযোগ নেই।

একটা সময় আর চুপ করে বসে না থেকে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ দখলে থাকা দর্শনীয় এই স্থান নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন আশুরা বিলের হারানো জৌলুস ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে কয়েকজন জনপ্রতিনিধির সহায়তায়। আগের সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনতে বিলের পূর্ব অংশে পানি ধরে রাখার জন্য বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের অর্থায়নে নির্মাণ করা হয় একটি ক্রস ড্যাম। ফলস্বরূপ বিলটিতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় পদ্ম আর শাপলা ফুঁটতে থাকে যেন প্রতিযোগিতা করে। বৃদ্ধি পেতে থাকে লাল খলশে, কাকিলা, ধেধলসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। দীর্ঘ দুই দশক পর শীতের ঠিকানা খুঁজে নিতে আবারও আশুরায় ছুটে আসতে থাকে বালিহাঁস, গিরিয়াহাঁস, শামুকখোল, হাট্টিটি, সাদা মানিকজোড়, রাঙ্গামুডিসহ অন্যান্য প্রজাতির হাজার হাজার পরিযায়ী পাখি। বিল আর বনের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের জন্য গড়ে তোলা হয় দেশের বৃহত্তম আঁকাবাঁকা কাঠের সেতু। বন আর বিলকে একই সুতোয় গেঁথে দেয়া ইংরেজি জেড আকৃতির এই সেতুর নামকরণ করা হয় ‘বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা কাঠের সেতু’। আশুরার বিল আর শেখ রাসেল জাতীয় উদ্যান অন্যতম গন্তব্যে পরিণত হয় ভ্রমণ পিপাসুদের কাছে। আশুরার বিলকে কেন্দ্র করে এলাকার আর্থসামাজিক এবং প্রাকৃতিক গুরুত্ব অনুধাবন করে স্থানীয় প্রশাসন হাতে নেয় উন্নয়নমূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ড।

পর্যটকদের চলাচল নির্বিঘ্ন করতে গড়ে তোলা হয় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, স্থানীয় মৎস্য অধিদপ্তরের সহায়তায় গড়ে তোলা হয়েছে মাছের অভয়াশ্রম। কিন্তু পরবর্তীতে আবারও সেই প্রভাবশালী মহল নিজেদের হীনস্বার্থে শুরু করে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র। সরকারি এই সম্পত্তি আবারও অবৈধ দখলের মাধ্যমে সেখানকার উন্নয়ন কাজ আটকে রাখতে বছরজুড়ে চালিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন অপতৎপরতা। কিছুদিনের মধ্যেই রাতের আঁধারে কেটে ফেলে ক্রসড্যাম। বিলটির পানি আবারও কমে যাওয়ায় হ্রাস পেয়েছে মাছের উৎপাদন, কমে গেছে অতিথি পাখির আনাগোনা।

এই অবস্থায় ঐতিহ্যবাহী বিশাল এই জলাশয়টিকে বাঁচাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে স্থানীয় প্রশাসনকে সহায়তা দিতে হবে সরকারের উচ্চমহল থেকে। আশুরার বিল ও জাতীয় উদ্যানকে কেন্দ্র করে সমন্বিতভাবে সমীক্ষা পরিচালনার মাধ্যমে তৈরি করা দরকার একটি মাস্টারপ্ল্যান। আর সে অনুযায়ী পর্যটনভিত্তিক কোনো প্রকল্প এখানে বাস্তবায়ন করা গেলে এ অঞ্চলের ব্যাপক আর্থসামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি টিকে থাকবে জীব বৈচিত্র্যের স্বাভাবিকতা। বৃহৎ একটি পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তুলে সরকার তার যেকোনো বিভাগের মাধ্যমে তা ইজারা দিয়ে যেমন প্রচুর রাজস্ব আদায় করতে পারবে, তেমনি বৃহৎ পরিসরে নৌ-ট্যুরিজমের অন্যতম একটি স্পট হিসেবে আকৃষ্ট হবে সারা দেশের মানুষের কাছে। উত্তর জনপদের দেশীয় প্রজাতির মাছ চাষের ব্যপক এক সম্ভাবনার স্থান এই বিল।

স্থানীয় মৎস্য বিভাগের হিসাব মতে, সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে আশুরার বিল হতে প্রতি বছর বিভিন্ন প্রজাতির মাছই পাওয়া যাবে প্রায় ২৭৫ মেট্রিকটন, যা দিয়ে দিনাজপুরসহ আশপাশের জেলার মৎস্য চাহিদা পূরণ করা সম্ভব সহজেই। পর্যটনভিত্তিক প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে একই সঙ্গে মূল্য বৃদ্ধি পাবে এ অঞ্চলের জমিসহ অন্যান্য স্থাবর সম্পত্তির, যাতে করে লাভবান হবে এ অঞ্চলের মানুষই। বাড়তি কর্মসংস্থানের সমূহ সম্ভাবনা থাকায় বৃদ্ধি পাবে এলাকার অর্থনৈতিক চাঞ্চল্য। 

অন্যদিকে পর্যটকদের আনাগোনা বৃদ্ধি পেলে সুরক্ষিত থাকবে শেখ রাসেল জাতীয় উদ্যানটিও। সর্বোপরি জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে ইমেজ বৃদ্ধি পাবে নবাবগঞ্জ-বিরামপুর তথা দিনাজপুরের। আলাদাভাবে একটি ব্র্যান্ড ভ্যালুও তৈরি হবে এ অঞ্চলের। আমাদের পবিত্র সংবিধানের ১৮-এর ‘ক’ অনুচ্ছেদ স্পষ্টভাবে বলছে, ‘রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করিবেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীব বৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্যপ্রাণীর সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করিবেন’। 

সাংবিধানিক এই বাধ্যবাধকতা থেকেই দিনাজপুরের প্রাণ আশুরার বিলে সারা বছর পানির প্রবাহ সচল রাখতে হবে। আর এজন্য মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি এলাকার শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেদেরও। নইলে বিপন্ন হবে ইতিহাস ও ঐতিহ্য সমৃদ্ধ দিনাজপুর অঞ্চলের জীব বৈচিত্র্য, ধ্বংস হবে লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা, অঙ্কুরেই মৃত্যু ঘটবে জাতির জনকের পরিবারের দুই সদস্যের নামে বোনা দুটি স্বপ্নের।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক