বিএসইসির আইন লঙ্ঘন করছে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক

বিএসইসির আইন লঙ্ঘন করছে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দোহাই দিয়ে একের পর এক ভাঙছে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের আইন। পাশাপাশি বিমা আইনের সংশ্লিষ্টতা থাকায় তাও লঙ্ঘন করছেন কয়েকজন পরিচালক। এরপরও বিএসইসির জবাবদিহিতা বা আইডিআরএর জরিমানার কবলে পড়তে হয়নি কোম্পানি ও সংশ্লিষ্ট পরিচালকদের। এমনকি যে ব্যাংক আইনের দোহাই দেয়া হচ্ছে খোদ সেই আইনই ভঙ্গ করেছে। 

এর মধ্যে রয়েছে একই পরিবারের দুই পরিচালকের ৫ শতাংশের অধিক শেয়ার ধারণ, সিজিসি অনুসারে স্বতন্ত্র পরিচালক ও এনআরসি কমিটি গঠন না করা এবং বিমা আইন লঙ্ঘন করে দুই পরিচালকের একইসাথে ব্যাংক ও বিমা কোম্পানিতে পরিচালক পদে থাকা। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক নিয়ে এমনই অভিযোগ সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীদের।

জানা গেছে, ২০১৮ সালের ১০ জুন গেজেট আকারে প্রকাশিত এসইসির প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন পরিপালন (সিজিসি) সম্পর্কিত বিধানের ১(২)(ধ) ধারা অনুসারে, তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের এক পঞ্চমাংশ স্বতন্ত্র পরিচালক রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। 

কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির সর্বশেষ ২০২০ সালে প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, মোট ১৭ জন পরিচালকের বিপরীতে স্বতন্ত্র পরিচালক আছেন তিনজন। অথচ নিয়মানুযায়ী এখানে পাঁচজন স্বতন্ত্র পরিচালক থাকার কথা।

আবার সিজিসির ৪ ধারা অনুসারে প্রতিটি তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে অডিট কমিটি এবং নমিনেশন অ্যান্ড রিমুনারেশন কমিটি গঠন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এক্ষেত্রে ব্যাংক কোম্পানিটি অডিট কমিটি গঠন করলেও এনআরসি কমিটি গঠন না করে পুনরায় এসইসির আইন লঙ্ঘন করেছে। 

এ বিষয়ে পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞরা জানান, যেহেতু সিজিসির নির্দেশনা সিকিরিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন অধ্যাদেশ, ১৯৬৯ এর ২ সিসির ক্ষমতাবলে জারিকৃত, তাই এই নির্দেশনার সাথে সাংঘর্ষিক অন্য নির্দেশনা থাকলে সেটাকে সুপারসিড (রহিত) করে। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটিতে পাঁচজন স্বতন্ত্র পরিচালক থাকলে মোট পরিচালক হবে ২২ জন। কিন্তু ব্যাংক ও বিএসইসির আইনের ২০ জনের অতিরিক্ত পরিচালক না রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। 

সেক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির একজন পরিচালককে পদ থেকে অব্যাহতি নিতে হবে। তখন ১৬ জন পরিচালকের বিপরীতে চারজন স্বতন্ত্র পরিচালক থাকলে উভয় আইনই পরিপালন হয়ে যাবে। এছাড়া এনআরসি কমিটি অবিলম্বে গঠন করতে হবে। অন্যথায় বিনিয়োগকারীদের স্বার্থরক্ষায় এসইসি থেকে প্রতিষ্ঠানটির ওপর কোনো জরিমানা আরোপ হলে তা বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

এদিকে এসইসির আইন লঙ্ঘনের পাশাপাশি ব্যাংকের দুই পরিচালকের বিমা কোম্পানির সংশ্লিষ্টতা থাকায় বিমা আইনও লঙ্ঘন করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিনিয়োগকারীদের পক্ষ থেকে জানা যায়, ব্যাংকের পরিচালক ডা. আনোয়ার হোসেন খান তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের বোর্ড অব ডাইরেক্টরসের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। 

এছাড়া অপর পরিচালক আব্দুল হালিম ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ-এর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু বিমা আইন, ২০১০ এর ৭৫ ধারায় বলা হয়েছে, অন্য কোনো আইনে যাই থাকুক না কেন, কোনো বিমাকারীর পরিচালক একই ধরনের অন্য বিমা কোম্পানির বা ব্যাংকের পরিচালক পদে বহাল থাকতে পারবেন না। কিন্তু এই আইনেরও কোনো তোয়াক্কা না করে এখনও দুই বিমা কোম্পানিতেই পরিচালক হিসেবে রয়েছেন এই দুই পরিচালক। 

এ বিষয়ে বিমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ যথাযথ পদক্ষেপ নেবে বলেও আশা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীরা। তবে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় সমালোচনা তৈরি হয়েছে খোদ ব্যাংক আইন লঙ্ঘন করায়। 

এ বিষয়ে জানা যায়, ব্যাংকের দুই পরিচালক ফকির আখতারুজ্জামান ও ফকির মাশরিকুজ্জামান সম্পর্কে বাবা ও ছেলে। ব্যাংক আইনের সংজ্ঞা অনুসারে তারা একই পরিবারভুক্ত। এক্ষেত্রে উভয় পরিচালক উল্লেখযোগ্য হারে শেয়ার ধারণ করলেও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কোনো পূর্ব অনুমোদন নেয়নি বলে জানা গেছে। 

অথচ ব্যাংক কোম্পানি আইনের ১৪(খ)(১) ধারা অনুসারে, বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন ব্যতীত, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে, একক বা অন্যের সাথে যৌথভাবে, কোনো ব্যাংক-কোম্পানির উল্লেখযোগ্য শেয়ার ধারক হইতে পারিবে না।’ এই ধারায় পরবর্তীতে উল্লেখযোগ্য শেয়ার বলতে ব্যাংক-কোম্পানির মালিকানা স্বত্বের শতকরা পাঁচ ভাগের অধিক শেয়ার ধারণকে বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে কোম্পানি সচিব আবুল বাশার কথা বলেন দৈনিক আমার সংবাদের সাথে। তিনি জানান, ‘ব্যাংক আইন অনুসারে স্বতন্ত্র পরিচালক সম্পর্কিত বিধান পরিপালন করা হয়েছে। তাছাড়া এনআরসি কমিটিও ব্যাংকের জন্য প্রযোজ্য নয়। তাই আমরা এটা পরিপালন করিনি।’ 

সিজিসি অনুসারে স্বতন্ত্র পরিচালক ও এনআরসি কমিটি সংক্রান্ত আইন পরিপালন বাধ্যতামূলক, এমনটা জানানো হলে বলেন, ‘এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আমাদেরকেসহ সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশনে চিঠি দিয়েছে। এসইসি এখনো এর কোনো জবাব দেয়নি।’ 

অপরদিকে বিমা আইন ভেঙে পরিচালক থাকার বিষয়ে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার তেমন জানা নেই, তাই এ নিয়ে বলতে পারবো না।’ এছাড়া একই পরিবারের দুই পরিচালকের ৫ শতাংশের অধিক শেয়ার ধারণ সম্পর্কে বলেন, ‘আমার জানামতে তাদের ৫ শতাংশ শেয়ার নেই, যদি থাকে তবে হয়তো বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন আছে, তবে আমার জানা নেই।’

ব্যাংকের ক্ষেত্রে সিজিসি ও স্বতন্ত্র পরিচালক সম্পর্কিত শর্ত থেকে অব্যাহতি দেয়া আছে কিনা, তা জানতে আমার সংবাদ থেকে যোগাযোগ করা হয় বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ রেজাউল করিমের সাথে।

তিনি বলেন, ‘যেহেতু সিজিসি একটি অধ্যাদেশ বলে জারিকৃত তাই এটাকে রহিত করার এখতিয়ার অন্য আইনের নেই। কিন্তু এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি আছে, তাই বিষয়টি সমাধানে আমরা অচিরেই বৈঠকে বসবো।’ 

এদিকে বিমা আইন লঙ্ঘন করে দুই পরিচালকের ব্যাংক কোম্পানিতে পরিচালক থাকার বিষয়ে কথা হয় আইডিআরএর নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র এস এম শাকিল আখতার সাথে।

তিনি বলেন, ‘সকল কোম্পানির প্রতিবেদনই আমাদের কাছে রয়েছে কিন্তু আমাদের লোকবল সংকট থাকায় অনেক সময় কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে পারি না। তবে সুনির্দিষ্ট তথ্যসহ অভিযোগ পেলে আমরা এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবো।’