নমনীয় সুরেও অস্বস্তির গন্ধ

নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে নিজের ব্যক্তিগত অবস্থান নিয়ে তৈরি হওয়া ধূম্রজাল নিয়ে মুখ খুলেছেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপি শামীম ওসমান। 

গতকাল আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদ সম্মেলন করে তিনি বলেন, অনেকে নৌকা নিয়ে অনেক কথা বলেন। কিন্তু নারায়ণগঞ্জ নৌকার ঘাঁটি, আওয়ামী লীগের ঘাঁটি, শেখ হাসিনার ঘাঁটি। এখানে অন্য কোনো খেলা খেলার চেষ্টা করবেন না। এখানে কে প্রার্থী, হু কেয়ারস। কলাগাছ, না আমগাছ— সেটা দেখার বিষয় না। এটা বঙ্গবন্ধুর নৌকা। নৌকার বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। 

সিটি নির্বাচনের মাঠে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে আওয়ামী লীগের নির্বাচনি সমন্বয়কারী টিমের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন শামীম ওসমান। এ সময় নৌকার বিজয় নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন তিনি। 

বিষয়টি নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, সিটি নির্বাচনকে সামনে রেখে শামীম ওসমানকে নিয়ে যে সংশয় ছিল, সেই সংশয় তিনি নিজ দায়িত্বে দূর করেছেন। নৌকার পক্ষে তিনি কাজ করবেন। তবে হঠাৎ শামীম ওসমানের নমনীয় সুরেও অস্বস্তির গন্ধ বলে মনে করছেন স্থানীয় নেতারা। 

সূত্রে জানা যায়, ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে শামীমকে হারিয়ে প্রথম মেয়র হন আইভী। এরপর প্রকাশ্যে আসে আইভী-শামীম দ্বন্দ্ব। আগামী ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে তাদের দীর্ঘদিনের সেই দ্বন্দ্ব ফের সামনে এসেছে। 

নৌকার বিরুদ্ধে কাজ করছেন শামীম ওসমান— এমন অভিযোগ করে সম্প্রতি গণমাধ্যমে কথা বলেন আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়রপ্রার্থী আইভী রহমান। শেষ পর্যন্ত দলীয় সাংসদ শামীম ওসমানের সমর্থন পাবেন কি-না তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন।  

তিনি বলেন, আমাকে উনি (শামীম) অপছন্দ করতেই পারেন। এটা কোনো ব্যাপার না। আগামী ১৬ জানুয়ারির ভোট সামনে রেখে পাল্টাপাল্টি কথার লড়াইয়ের মাঝেই গতকাল আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদ সম্মেলনে আসেন  নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপি শামীম ওসমান। নির্বাচনে নিজের অবস্থান নিয়ে গণমাধ্যমের সাথে খোলামেলা কথা বলেন তিনি।   

আ.লীগের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা যায়, আগামী ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের মাঠে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে আওয়ামী লীগের নির্বাচনি সমন্বয়কারী টিমের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপি শামীম ওসমান।

গতকাল নারায়ণগঞ্জ ক্লাব লিমিটেডে কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন তিনি। এ সময় উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সিটি নির্বাচনি টিমের প্রধান সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক, আব্দুর রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দীন নাছিম এবং সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম। 

বৈঠক সূত্রে জানা যায়, নিজ কর্মী-সমর্থক দিয়ে নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা থেকে শুরু করে নৌকার বিজয় নিশ্চিত করতে সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করবেন বলে কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে প্রতিশ্রুতি করেন শামীম ওসমান। 

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দীন নাছিম আমার সংবাদকে বলেন, ‘আমাদের সাথে তিনি (শামীম ওসমান) সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে আসছিলেন। তাকে (শামীম ওসমান) নিয়ে যে সংশয় ছিল, সেই সংশয় তিনি নিজ দায়িত্বে দূর করেছেন। নৌকার পক্ষে তিনি কাজ করবেন।’ 

বাহাউদ্দীন নাছিম বলেন, ‘নৌকার বিজয়ের লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি। আমরা চেষ্টা করছি, যার যে দায়িত্ব সে সেটা সঠিকভাবে পালন করবে এবং নৌকার বিজয় নিশ্চিত করবে।’ তবে কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে দেখা করার আগে আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদ সম্মেলন আসেন  নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপি শামীম ওসমান। তিনি বলেন, ‘এখানে আওয়ামী লীগের মূলধারার সবাই আছেন। আমি এতদিন নামি নাই, মানে- নামতে পারি নাই। আজকে থেকে নামলাম।’ 

একজন এমপি হয়ে সরাসরি নৌকায় ভোট চাওয়ার ক্ষেত্রে আইনি বাধার কথা তুলে ধরে শামীম বলেন, অনেকে নৌকা নিয়ে অনেক কথা বলেন। কিন্তু নারায়ণগঞ্জ নৌকার ঘাঁটি, আওয়ামী লীগের ঘাঁটি, শেখ হাসিনার ঘাঁটি। এখানে অন্য কোনো খেলা খেলার চেষ্টা করবেন না। এখানে কে প্রার্থী, হু কেয়ারস। কলাগাছ, না আমগাছ— সেটা দেখার বিষয় না। এটা বঙ্গবন্ধুর নৌকা। নৌকার বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। 

নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী এই আওয়ামী লীগ নেতা দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, এখন আমাদের জনগণের কাছে যাওয়া উচিত। মানুষের দ্বারে দ্বারে যেতে হবে। একে অপরকে দোষারোপ করে ভোট হয় না। ভোট করতে হয় ভালোবাসা দিয়ে। 

সংবাদ সম্মেলনে এসে শামীম ওসমান স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকারকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনি আপনার মতো কথা বলতে থাকেন। তাতে আমাদের কোনো আপত্তি নাই। কিন্তু হাতি দিয়া নৌকা ডুবাইবেন এই চিন্তা কইরেন না। এই নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের ঘাঁটি। আমার মনে হয় না, নারায়ণগঞ্জে বিএনপি-জামায়াতের ওই ক্ষমতা আছে যে নৌকাকে ডুবায়ে দেবে। হাতি সাইজে বড় হতে পারে; আমরা হাতি কাঁধে নিয়ে দৌড় দেব কিন্তু নৌকার উপর হাতিরে উঠতে দিয়েন না’— নেতাকর্মীদের উদ্দেশে এসব কথা বলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য। 

নারায়ণগঞ্জের নির্বাচনের পরিবেশ তুলে ধরে শামীম ওসমান প্রশ্ন তোলেন, নির্বাচন এলে তিনিই কেন বারবার ‘সাবজেক্ট’ হন? ঠাট্টা করে বলেন, আমি কেন সাবজেক্ট হই সবসময়। ব্যাপারটা গরিবের বউ, সবার ভাবীর মত। 

নির্বাচনের প্রচারের সময় নিজে চুপ থাকলেও তা নিয়ে কথা হয় মন্তব্য করে শামীম বলেন, আমি সত্য বলতে পছন্দ করি। তবে এখানে সব সত্য বলতে পারব না। এজন্য বিবেকের কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। এই কয়েকদিন আমি চুপ ছিলাম। আমি চুপ থাকার কারণে অনেক ইস্যু তৈরি হয়। ইস্যু তৈরি হলে এতে দল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কেউ উল্টোপথে হেঁটে দলের ক্ষতি করছেন। আবার কেউ দলের সঙ্গে হেঁটে দলের ক্ষতি করছেন। তিনি বলেন, আগামী ১৬ তারিখে খেলা হবে এবং সে খেলায় অবশ্যই আমরা জিতব। নারায়ণগঞ্জে শেখ হাসিনার প্রার্থীকে পাস করাতে হবে, পাস করাবো ইনশাআল্লাহ।  সমপ্রতি শামীম ওসমানকে নারায়ণগঞ্জের সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী ‘গডফাদার’ আখ্যা দেন। 

এ বিষয়ে শামীম ওসমান বলেন, কেউ যদি গডফাদার বলে শান্তি পায়, পাক না। আমি না হয় নীলকণ্ঠ হলাম। তবে ব্রাদার, ফাদার, গডফাদার বলেন, সমস্যা নাই। কিন্তু গডমাদার বলবেন না। আমি পুরুষ। আওয়ামী লীগ বড় পরিবার, এখানে রাগ থাকবে, অভিমান থাকবে। গালি, মামলা সব ভুলে যেখানে যাওয়ার দরকার গিয়েছি, দাওয়াত দিয়েছি। আমি মানুষ, রোবট না। আমারও খারাপ লাগে।

 আমার জীবনের সবচেয়ে কষ্টের প্রেস কনফারেন্স এটা উল্লেখ্য করে বলেন, আমি সত্য কথা বলতে পছন্দ করি। নানাভাবে আমাকে, আমার দল আওয়ামী লীগকে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমি সবসময় বঙ্গবন্ধুর দলে ছিলাম, আছি, থাকবো। কয়েক দিন আগে ফতুল্লায় ইউনিয়ন পরিষদ ভোট হলো, কেউ টেরও পেল না। আমিও গেলাম না। তখন কোনো কথা উঠেনি। কিন্তু নারায়ণগঞ্জের সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে কেন আমাকে বারবার সাবজেক্ট ম্যাটার করা হচ্ছে? আমি কাউকে ব্লেম করি নাই, আল্লাহ সাক্ষী। 

শামীম ওসমানের সংবাদ সম্মেলনের আগে নির্বাচনি প্রচারণায় গিয়ে নৌকার মনোনীত প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে শামীম ওসমানকে আক্রমণ করিনি। আমি চাইলে অনেক কিছু বলতে পারতাম। কিন্তু তা বলেনি। আমি ওনাকে সন্মান করি আর সন্মানের মধ্যে দিয়েই নির্বাচন চালিয়ে যাবো। 

এসময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইভী বলেন, তৈমূর আলমের কর্মকাণ্ডে স্পষ্ট যে শামীম ওসমান নৌকার না হাতির সমর্থক।  ২১নং ওয়ার্ডে নির্বাচনের প্রচারণাকালে তৈমূর প্রসঙ্গে আইভী বলেন, তৈমূর আলম আমাকে গডমাদার বলেছেন। তিনি তো গডফাদারের বাইরে না। তবে তিনি কাজটি খারাপ করেছেন। আমি তো তৈমূর আলমকে গডফাদার বলিনি। তৈমূর আলম গডফাদারদের আশ্রয় নিয়েছে আমি তা বলেছি। 

আইভী বলেন, যেহেতু আমি নৌকার প্রার্থী, শামীম ওসমানও নৌকার, তাই তাকে আমার দরকার আছে। দল যেহেতু আমাকে নৌকার নমিনেশন দিয়েছে সেহেতু আমাকে দলের লোকেরাই ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবেন। তবে সমর্থনের বিষয়ে ভোটারদের কাছে কোনো অপরিহার্য নয়। দল আমাকে নমিনেশন দিয়েছে এটাই মুখ্য বিষয়। তবে ভোটাররা তাদের ইচ্ছে স্বাধীন মতো তারা তাদের প্রার্থীকে ভোট দিবেন।

সেলিনা হায়াৎ আইভীর মন্তব্যের কারণে তার দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে ফাটল ধরেছে বলে মন্তব্য করে স্বতন্ত্র মেয়রপ্রার্থী অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার বলেন, আমি কারো কথায় কষ্ট পাই না। আমার দল ঐক্যবদ্ধ। তার (আইভী) মন্তব্যের কারণে তার দলে যে বিশাল ফাটল ধরেছে, এটা জনগণের কাছে পরিষ্কার। শহরে এখন তিনিই (আইভী) তো তাদের লোকদের সমর্থন পাচ্ছেন না। 

গতকাল সকালে ২৭নং ওয়ার্ডের মদনপুর এলাকায় গণসংযোগকালে তিনি এসব কথা বলেন। তৈমূর আলম খন্দকার বলেন, তৈমূর আলম খন্দকার সবাইকে নিয়ে মাঠে নেমেছে। আমার জয় হবে এটাই জনগণ বলছে।  প্রচারণাকালে স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকার তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী আইভীর বক্তব্যের জবাব দিয়ে বলেন, যদি মনে করেন শামীম ওসমাম আমাকে সমর্থন দেন, আপনাকে সমর্থন দেন না, এটা আপনাদের দলের দ্বন্দ্ব। 

আপনাদের (আইভী) দলের নেতার সম্পর্কে বিভিন্ন বিশ্লেষণ লাগিয়ে চরিত্র হনন করা হয়।  নারায়ণগঞ্জের জনগণ যে কারণে সিটি কর্পোরেশনের প্রয়োজন অনুভব করেছিল, সেই অনুযায়ী মানুষের সেবা বৃদ্ধি পায়নি বলে অভিযোগ করেন প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকার। তৈমূর আলম খন্দকার অভিযোগ করে বলেন, আমাদের নেতাকর্মীদের বাড়িতে বাড়িতে পুলিশ পাঠানো হচ্ছে। তাদের হয়রানি করা হচ্ছে।  

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক আওয়ামী লীগের নেতা বলেন, শামীম-আইভীর যে দ্বন্দ্ব, এই দ্বন্দ্ব কোনোভাবেই নিরসন হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু তিনি (শামীম ওসমান) নৌকার কথা বলেছেন। আমরাও তাই চাই, সবাই নৌকার পক্ষে কাজ করি। তবে শেষ পর্যন্ত কি হয় সেটার জন্য আমাদের সবাইকে শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।